লংমার্চে এইরূপ বাধা সৃষ্টি দুঃখজনক

গতকাল শনিবার ছিল হেফাজতে ইসলামের বহুল আলোচিত লংমার্চ। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী যে কেহ এই ধরনের কর্মসূচি দিতেই পারেন। কিন্তু আমরা দেখিলাম, এই কর্মসূচিকে ঘিরিয়া দেশে একটি চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হইল। ২৩টি সংগঠনের ২৪ ঘন্টার হরতাল ছিল শুক্রবার সন্ধ্যা হইতে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত । কিন্তু তাহার আগেই সকাল হইতে দূরপাল্লার সকল বাস চলাচল বন্ধ হইয়া যায়। কাহাদের নির্দেশে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় তাহা সহজেই অনুমেয়। অন্যদিকে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের রাজপথ-রেলপথ অবরোধের কারণেও দেশ অবরুদ্ধ হইয়া পড়ে। তাহার উপর সরকার তথাকথিত নাশকতার আশঙ্কায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে নিজ উদ্যোগেই ট্রেন চলাচল বন্ধ করিয়া দেয়। লঞ্চ ও ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। অনেক লঞ্চ নদীর মধ্যে নিয়া বাঁধিয়া রাখা হয়। ফলে সারাদেশ হইতে রাজধানী ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। ইহার কারণে নানা মাত্রায় জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। লংমার্চ সমর্থকরা যানবাহন ভাড়া করিলেও শেষপর্যন্ত ঐ সব যানবাহনের মালিকরা গাড়ি নামাইতে অস্বীকৃতি জানান। উপায়ান্তর না দেখিয়া তাহাদের অনেকেই পাঁয়ে হাঁটিয়া এবং বহু কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করিয়া শাপলা চত্বরের জমায়েতে হাজির হন। সবকিছু বন্ধ করিয়া দেওয়ার ফলে সাধারণ মানুষও চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেকে রোগী নিয়া হাসপাতালে ও লাশ নিয়া নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছাইতে পারেন নাই। লংমার্চের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করিয়া এই অস্বাভাবিক ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সত্যিই বিস্ময়কর ও দুঃখজনক। এই কর্মসূচিকে প্রতিহত করিতে যাহারা হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি দেন, তাহারা সরকার সমর্থক হিসাবেই বিবেচিত। তাহারা শুক্রবারও হরতাল দেওয়ায় দেশে একটি ইতিহাস সৃষ্টি হইয়াছে বৈকি। এই হরতাল-অবরোধের কারণে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্তব্ধ হইয়া পড়ে। ভবিষ্যতেও ইহা একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হিসাবেই বিবেচিত হইবে। ইহার আগে গত বত্সর প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ১২ মার্চের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করিয়া সরকার অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যাহা গণতন্ত্রকামী মানুষের নিকট ছিল অপ্রত্যাশিত। এবার আমরা দেখিলাম, প্রথমে সরকার হেফাজতে ইসলামের সহিত সমঝোতার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তাহা ব্যর্থ হইলে পরে উপরোক্ত কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু গণতন্ত্রকামী মানুষ ইহাও পছন্দ করেন নাই। লংমার্চ ঠেকানোর অপকৌশল গ্রহণ করিয়া জাতিকে আরও বিভক্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। হেফাজত নেতৃবৃন্দ তাহাদের এই কর্মসূচিকে অরাজনৈতিক বলিয়া দাবি করেন। তাহাদের কর্মসূচিতে ধর্মীয় উপাদানই মুখ্য। কিন্তু সরকার মুখে সহযোগিতা প্রদানের কথা বলিলেও তাহাদের কর্মসূচিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাধাদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিবদমান দুইটি ধারার মানুষকে আরও মুখোমুখি করিয়া দেওয়া হইল। ইহার পরিণাম কখনও শুভ হইতে পারে না। ইহা অনভিপ্রেত ও অদূরদর্শিতার পরিচায়ক।