উত্তর কোরিয়ার রণহুঙ্কার
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২৪
উত্তর কোরিয়ার রণহুঙ্কার এখনও অব্যাহত আছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী কমিউনিস্ট এই দেশটি সংঘাতের ঝুঁকির কারণে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস খালি করিয়া দিবার পরামর্শ দিয়াছে। পক্ষান্তরে দক্ষিণ কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্বলিত দুইটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করিয়াছে। ইহাছাড়া উত্তর কোরিয়া আগামী বুধবার নাগাদ নূতন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাইতে পারে। এই সম্ভাবনায় আগামীকাল মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি দীর্ঘ পরিকল্পিত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কথা থাকিলেও ভুল বুঝাবুঝি এড়াইতে তাহা বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছে। ইহার আগে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেটে পারমাণবিক হামলা চালাইতে সশস্ত্র বাহিনীকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় দেশটির তরুণ প্রেসিডেন্ট কিম জং উন। হোয়াইট হাউস যথারীতি এই হুমকি প্রদানকে উড়াইয়া দিলেও পেন্টাগন সতর্কতা স্বরূপ প্রশান্ত মহাসাগরীয় গুয়াম দ্বীপে সর্বাধুনিক ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের পাল্টা ঘোষণা দেয়। সেই অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের গুয়াম সামরিক ঘাঁটিতে ইন্টারসেপ্টর বিমান পাঠানো হয়। উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ‘যুদ্ধাবস্থা’ ঘোষণা করার ফলে ১৯৫০-৫৩ সালে সংঘটিত দুই কোরিয়ার যুদ্ধের পর যে অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়, তাহা অকার্যকর হইয়া পড়ে। ঐ যুদ্ধ কোন স্থায়ী শান্তি চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় বিধায় দুই কোরিয়ার মধ্যে প্রায়শ উত্তেজনা দেখা যায়। এখন পিয়ংইয়ংয়ের এইসব হুমকি কি কোন নিছক বাগাড়ম্বর নাকি সত্যিই কোন যুদ্ধবিগ্রহ বা পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা আছে ইহা লইয়াই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলিতেছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলিয়াছেন যে, কোরিয়া সংকট বিশ্বব্যাপী গুরুতর প্রভাব ফেলিবে। কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রো ও ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হগ গতকাল উত্তর কোরিয়া সংকটে শান্ত থাকার আহ্বান জানাইয়াছেন।
উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন পিতা ও পিতামহের ন্যায় যেন রহস্যময় পুরুষে পরিণত হইয়াছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে তিনি তাহাদের দীর্ঘ অর্ধ্বশতাব্দীর শাসনের বৈশিষ্ট্য ধরিয়া রাখিতে চান। এজন্য বারংবার ও প্রতিদিন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন। ইহাকে বলা হয় ‘হেডলাইন স্ট্রাটেজি’। শেষ পর্যন্ত দেখা যাইবে এইসব হুমকি হঠকারিতা ছাড়া আর কিছু নহে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক অ্যালেন কিমের মতে, এই বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার প্রশাসনের পুরাতন কর্মকর্তা ও এলিট অথচ কট্টরপন্থি সামরিক কর্মকর্তাদের শান্ত করিবার প্রচেষ্টা চলিতেছে । আবার কেহ কেহ মনে করেন, গত ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ কর্তৃক কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ, উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনের নিরাপত্তা পরিষদের ঐ প্রস্তাবে ভেটোর বদলে সমর্থন ও সর্বশেষ দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ায় পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম বি-২ স্টিলথ যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন ইত্যাদি কারণে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপিয়া যাইতে পারে। অন্যদিকে চীনা সামরিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য হইল, পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে ইদানিং বিভিন্ন দ্বীপকে নিয়া দ্বন্দ্বের নিরিখে উত্তর কোরিয়াকে দমনের অজুহাতে চীনকে চাপে রাখা ও এতদঞ্চলে সমরাস্ত্র আমদানি করাও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হইতে পারে। তবে যে যেভাবেই বিশ্লেষণ করুন না কেন, এইসব করিয়া শেষপর্যন্ত উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িতেছে। শীতল যুদ্ধের সময় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সব রকম বিবাদে উত্তর কোরিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নকে সব সময় পার্শ্বে পাইত। কিন্তু এখন একমেরুকরণের যুগে ( কার্যত বহুমেরুকরণের যুগ এখনও আসে নাই) সেই পরিস্থিতি আর বিদ্যমান নাই। এখন রাশিয়াও উত্তর কোরিয়াকে সতর্ক হইয়া ও মাথা ঠান্ডা রাখিয়া চলার পরামর্শ দিতেছে। এই প্রেক্ষিতে এবং বিভিন্ন রকম নিষেধাজ্ঞা ও ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে উত্তর কোরিয়া বড় রকমের কোন ঝুঁকি নিবে বলিয়া মনে হয় না। ঝুঁকি নিলে তাহা হইবে আত্মঘাতী স্বরূপ।
সামরিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের মাটি বা সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাইবার শক্তি নাই। কেননা তাহাদের পরমাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা অতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় নাই। তবে উত্তর কোরিয়া দেশটির কাছাকাছি থাকা মার্কিন মিত্র জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রভূত ক্ষতিসাধন করিতে পারে। এমতাবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল বলিয়াছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজ ভূখন্ড ও তাহার মিত্রদের রক্ষায় যাহা করা দরকার তাহাই করিবে। যাহা হউক, আমরা কোন হুমকি বা উসকানি নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী। কোরীয় উপদ্বীপসহ সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হউক, ইহাই কামনা করি।