নারী সাংবাদিকের ওপর হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার দাবি

হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশস্থলে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নারী সাংবাদিকের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও অশালীন বক্তব্যের প্রতিবাদে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। তারা এই ঘটনার সাথে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতারসহ হেফাজতের ১৩ দফা দাবি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে বিএফইউজে ও ডিইউজে আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সকালে বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র, বিকালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, কর্মজীবী নারী, নারী সমাজসহ বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে। বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রঃ একুশে টেলিভিশনের সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনের ওপর হেফাজতে ইসলামের হামলার প্রতিবাদে সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বিএফইউজের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী সমাবেশের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা না পাই, তবে তাদের সংবাদ সংগ্রহ ও সংবাদ পরিবেশন বর্জন করবো আমরা। কারণ রাজনৈতিক সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা না পাই, তবে আমরা সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকবো।’ বিএফইউজের সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল হেফাজতে ইসলামকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তাদের আচরণে আজকে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আমাদের মা-বোনেরা মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকতে পারবেন কি-না। মানববন্ধনে আয়োজক সংগঠনের সভাপতি নাসিমুন আরা হকের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বিএফইউজের মহাসচিব আব্দুল জলিল ভুঁইয়া, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ, সাংবাদিক পুলক ঘটক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব মীর, সাংবাদিক সালিম সামাদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইরিন নিয়াজি মান্না, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা ঝুমা প্রমুখ। নারী সমাজঃ নারী সমাজের নেতৃবৃন্দ এক সমাবেশে বলেছেন, অনতিবিলম্বে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা বাতিল করতে হবে। তাদের এসব দাবি অবৈধ। কারণ এ সকল দাবি স্বাধীনতা, সংবিধান ও নারী অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একুশে টিভির নারী সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনের ওপর হেফাজতে ইসলামের হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত ঐ সমাবেশে এ কথা বলা হয়। রবিবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশের আয়োজন করে জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম, কর্মজীবী নারী, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক। সমাবেশে শেষে মিছিল নিয়ে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে গিয়ে তারা সংহতি প্রকাশ করেন। সমাবেশে জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কর্মজীবী নারীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিরিন আখতার বলেন, ১৩ দফা দাবি বাতিলসহ কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী, নারী নির্যাতনকারী একাত্তরের ঘাতক দালালদের চলমান বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সমাবেশে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংহতি জানিয়ে পুরো নারী সমাজকে অবমাননা করেছেন।’ বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আপনি হেফাজতে ইসলাম ত্যাগ করুন এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে সহযোগিতা করুন।’ তিনি হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহফুজা খানম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত ছিল হেফাজতের সমাবেশের ধিক্কার জানানো। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি হেফাজতে ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।’ নারী সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার দাবি করে মাহফুজা খানম বলেন, অন্যথায় নারী সমাজ লাখ লাখ নারীকে এক করে সমাবেশ করবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। অভিনয় শিল্পী রোকেয়া প্রাচী বলেন, ‘যারা গণমাধ্যম কর্মীর ওপর হামলা করেছে, ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের গ্রেফতার করতে হবে।’ গণজাগরণ মঞ্চের শ্লোগান কন্যা লাকী আক্তার বলেন, আজ নারীরা হিমালয় পর্বত জয় করছেন। আর হেফাজত চায়. নারীকে গৃহবন্দী করতে। দেশের উন্নয়ন নারীর হাত দিয়ে এসেছে। লাকী আরো বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম আজ জামায়াতে ইসলামে পরিণত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সকল নারী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ প্রতিবাদ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য হাজেরা সুলতানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাবেরী গায়েন, জোবেদা নাসরিন কণা, সুফিয়া আক্তার শেলী, আফরোজা হক রিনা, তাসলিমা আক্তার, গার্মেন্ট শ্রমিক নেত্রী নাসিমা আক্তার, শামীমা আক্তার শিরিন, লাভলী ইয়াসমিন প্রমুখ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদঃ সংবাদ সংগ্রহের সময় নারী সাংবাদিকের উপর হামলা সংবিধান পরিপন্থী উল্লেখ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, হেফাজতে ইসলামের সকল দাবি-দাওয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে কর্তব্যরত নারী সাংবাদিকের উপর হামলা, মারধর, কটূক্তি, অশালীন মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তারা। রবিবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত তারা সমাবেশ ও মিছিল করে। সমাবেশে বক্তারা ঘটনার সাথে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার এবং জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের দাবি জানান। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)ঃ রবিবার আসক’র নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনসহ সাংবাদিকদের মারধর ও নির্যাতনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একইসঙ্গে এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সর্বস্তরের জনসাধারণকে সতর্ক এবং ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানানো হয়। এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিত্সাধীন সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনকে দেখতে যান মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এ সময় তিনি তার চিকিত্সার খোঁজ-খবর নেন এবং যথাযথ চিকিত্সা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকদের নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি নাদিয়া শারমিনের উপর বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, একজন গণমাধ্যম প্রতিনিধির উপর হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা এই হামলায় বিস্মিত হয়েছি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার বিষয়ে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সচেতন থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।