বৈশাখী হাওয়ায়

পহেলা বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন উত্সব। এই দিনে হালখাতা, নতুন কাপড়—এসব এখন আর কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে নেই। নতুন দিনকে বরণ করার প্রেরণায় ভোরের আলো ফুটতেই লাল-সাদার বর্ণিল আভায় মানুষ ছুটবে গ্রামীণ মেলায় আর নাগরিক ঐতিহ্যে ছায়ানটের বর্ষবরণে কিংবা চারুকলার শোভাযাত্রায়। সবাইকে নিয়ে শুরু হবে নতুন বাংলা বছর ১৪২০ উদযাপন। বাতাসে ধুলোর সঙ্গে যতই মিশে থাকুক রিক্ততা, তবু যেন এই দিনটি আপনাকে দেবে এক লাল সূর্যের প্রতিশ্রুতি। বৈশাখ মানে লাল-সাদার মিশেল। বৈশাখ শুধু লালকে ধারণ করে না; বরং পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে প্রথম মাত্রা দেয়। তাই বহুকাল ধরেই লাল-সাদার ধারাবাহিকতায় এই বৈশাখেও আপনার দিনটি হোক লালের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল, লালের ঐশ্বর্যে সুখময় আর লালের দীপ্তিতে রঙিন। বৈশাখের প্রথম দিনে ঘরে বসে তো আর থাকা যায় না। ভোরের আলো ফুটতেই সাজসজ্জা শুরু করে তরুণীরা। বৈশাখে বাঙালি মেয়েরা শাড়ি পরেন। অনেক তরুণী এর জন্য পহেলা বৈশাখের অপেক্ষায় থাকেন। আর বৈশাখ এলেই গায়ে ওঠে পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি। সেই শাড়িতে লাল-সাদার সীমাবদ্ধতায় থাকতে রাজি নয় এখন কেউই। লাল ও সাদা তো থাকবেই, সঙ্গে থাকতে হবে অন্যান্য রঙ। কিংবা অন্য কোনো রঙের শাড়িতে সেজে কপালের টিপ আর হাতের চুড়িটা সবাই লাল পরবেন। অথবা শাড়িতে চাই কোনো বাঙালি মোটিভ। গরম, অনভ্যস্ততার কারণে শাড়িতে স্বস্তি বোধ করেন না অনেকেই। তারা অনায়াসে পরতে পারেন সালোয়ার-কামিজ বা কুর্তা-চুড়িদার। পোশাকের নকশা, কাটে ভিন্নতা আনা যেতেই পারে। আর সাজটাও তো হতে হবে মানানসই। লম্বা বেণি, টিপ আর চুড়িতে থাকবে বৈশাখী আমেজ। লম্বা কুর্তা, কামিজের সঙ্গে এই বৈশাখে চুড়িদার সালোয়ার বেশ চলছে। তরুণীদের পছন্দের তালিকায় বৈশাখের পোশাকের চিরায়ত রং লাল-সাদার পাশাপাশি সবুজ, নীল, কমলা ও ম্যাজেন্টার মতো উজ্জ্বল রং প্রাধান্য পেয়েছে। কামিজের কাট, নকশাতেও খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। একটু ঘেরওয়ালা ফ্রক-কাট কামিজ, লম্বা কুর্তা বা কামিজের হেমে ভি-কাট, পাশাপাশি আনারকলি কামিজ, অ্যালাইন কামিজের চল রয়েছে। হাতায়, গলায় ও হেমে পাইপিং, লেইস ব্যবহার করতে পারেন। হাতকাটা, খাটো হাতা, ঘটিহাতা, এমনকি ফুলহাতা কামিজ পরা যেতে পারে। সুতির পোশাকই গরমের জন্য আরামদায়ক হবে। তবে রাতে বের হলে অ্যান্ডি, সিল্ক কিংবা মসলিনের পোশাক পরতে পারেন। তবে যে পোশাকই পরুন না কেন, মাথায় রাখতে হবে—আপনি সেই পোশাকে কতটুকু স্বচ্ছন্দ। বৈশাখকে ঘিরে তরুণদের চাহিদার মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বৈশাখী শার্ট, গামছাসহ কিছু নতুন ও ব্যতিক্রমী প্রসাধনী সামগ্রী। ফতুয়ায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢোল, একতারার ডিজাইনগুলো এবার কিছুটা ব্যতিক্রম ও নজরকাড়া। আর সেদিকেই ঝুঁকছেন অধিকাংশ ফ্যাশন সচেতন পুরুষ। পাঞ্জাবির চাহিদা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এ সময়টাতে থাকে একটু বেশি। বাঙালি বলে কথা। তাই পোশাকেও থাকতে হবে বাঙালির ঐতিহ্য। আর তাই হাতে হাল্কা লাল রঙের কাজ, গলা ও পিঠে সাদামাটা লালের ছটায় বর্ণিল পাঞ্জাবিগুলোর চাহিদা বেশি। সাজতে পছন্দ করে না এমন মেয়েদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। উত্সব এলে তো কথাই নেই। নতুন পোশাক থাকা চাই। তাতে থাকা চাই বিশেষ দিনের বিশেষ ডিজাইন। বৈশাখ এলে তো লাল-সাদার ছড়াছড়ি। তপ্ত রোদে সাদা রঙের পোশাক তাপ শোষণ করে। আর তাই সবার নজর থাকে সাদার দিকে। বাঙালির এই প্রাণের উত্সবে ভোর বেলা যেমন আপনি শামিল হতে পারেন, তেমনি দুপুরের রোদ খানিকটা কমে আসলে আপনি ছুটে যেতে পারেন উত্সবের কেন্দ্রগুলোতে এই আয়োজনের একজন হয়ে। শুধু এই দিনটিতে নয়; বরং প্রাণের টানে আর নিজের ঐতিহ্যের গর্বে নিজস্ব চেতনায় আপনি বাঙালিয়ানাকে ছড়িয়ে দিতে পারেন আপন ঐশ্বর্যে। রঙিন সাজ বৈশাখের প্রথম দিন তাই পোশাকের সঙ্গে সাজের একটি বিষয় রয়েছে। বছরের প্রথম দিনের বাঁধভাঙা উত্সবে সাজের ক্ষেত্রে নেই কোনো সীমাবদ্ধতা। কিন্তু এর পরও মাথায় রাখতে হবে নিজের আরামের বিষয়টি। শাড়ি পরলেই সাজতে হবে। আর সেই সাজে যদি ফাউন্ডেশন, ফেস পাউডার ব্যবহার না করা হয়, সেটা সবচেয়ে ভালো। তবে যদি কেউ মেকআপ করতেই চান, সে ক্ষেত্রে অয়েলফ্রি মেকআপ ব্যবহার করতে পারেন আর দিতে পারেন ম্যাট ফাউন্ডেশন। তবে হ্যাঁ, হাত ভর্তি লাল কাচের চুড়ি পরতে পারেন ইচ্ছেমতো। কপালে বড় করে লাল টিপ। কিংবা লাল, সাদা, সবুজ মিলিয়ে চলতে পারে কুমকুমের টিপও। অল্পবয়সী যারা, তারা তো একদমই কোনো ধরনের মেকআপ ব্যবহার করবে না। যত বেশি সাধারণ সাজে থাকা যাবে ততই ভালো। তবে হ্যাঁ, কাজল বা আই-লাইনার দিয়ে চোখ সাজাতে ভুলে গেলে কিন্তু চলবে না। সেই সঙ্গে খোঁপা ভর্তি বেলি ফুলের মালা থাকা চাই। অবশ্যই বাইরে যাওয়ার সময় সানস্ক্রিন লাগাতে হবে। এ ছাড়া সারা দিন অনেক বেশি পানি খেতে হবে। আর চুলের সাজে বেণি বা খোঁপা চলতে পারে। সেখানে ফুলের পাশাপাশি কড়ি বা পুঁতির টারসেল ব্যবহার করা যেতে পারে। সাজে অ্যাথনিক লুকটা এই দিনের সঙ্গে অনেক বেশি মানানসই। শাড়ি ও সাজ তো হলো। এবার গয়নাটা কী হবে? মাটি, মেটাল, পুঁতি, কড়ি—এগুলোই অনেক বেশি মানানসই পহেলা বৈশাখের জন্য। মাটি ও মেটালের গয়নায় লাল, মেরুন, কমলা রঙগুলো অনেক বেশি ব্যবহূত হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই রঙের পুঁতির গয়নাও কড়ি দিয়ে চলবে বেশ। তাঁতের শাড়ি, কাচের চুড়ি, কপালে লাল টিপ, খোঁপায় বেলি ফুলের মালা—সব মিলিয়ে পুরো বাঙালি সাজে প্রস্তুতির কথা বলা হলো। এবার জিনিসগুলো গুছিয়ে ফেলুন। তবে হ্যাঁ, মনে রাখবেন, পহেলা বৈশাখে সারা দিন ঘুরে বেড়ানোর জন্য পায়ে নিন সবচেয়ে আরামদায়ক জুতা। হতে পারে হালকা হিলের ফ্ল্যাট স্যান্ডেল বা একদমই চটি। যেটা আরামদায়ক সেটাই পরুন।