[ রা জ নী তি ]
হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ, ১৩ দফা দাবি এবং অতঃপর
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩১
৬ মার্চ হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ এবং ঢাকায় মতিঝিলে ধর্মপ্রাণ লাখো মানুষের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। অনেক আশঙ্কা এবং উত্কণ্ঠা ছিল এই লংমার্চ ও জমায়েত নিয়ে। কিন্তু, বিচ্ছিন্ন কতিপয় সহিংস ঘটনা বাদ দিলে, এই লংমার্চ ও জমায়েত শান্তিপূর্ণ ভাবেই শেষ হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম নিজেকে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবি করলেও মূলত:এই সংগঠনের ভেতরে বি.এন.পি এবং জামায়াতপন্থিদের অংশগ্রহণ ছিলো তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। এমনকি মতিঝিলের এই মহাসমাবেশে, বি.এন.পি ও জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দ মঞ্চে উপবিষ্ট থেকে বক্তৃতা না করলেও, নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন। হেফাজতে ইসলামের ঘোষণা অনুযায়ী তাদের এই কর্মযজ্ঞের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ঈমান আকিদা পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা। তাদের ১৩ দফা দাবি অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায় তা হলো তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি করছে। যা একটি রাজনৈতিক দাবি ছাড়া আর কিছু নয়। এমতাবস্থায় হেফাজতে ইসলামের এই আন্দোলন অরাজনৈতিক না রাজনৈতিক তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিতর্ক ওঠাই স্বাভাবিক। হঠাত্ করে জাতীয় জীবনে ঠিক এই সময়েই কেন এই সংগঠনের উদয় হলো, তা নিয়েও অনেকের মনে কৌতূহল আছে। অনেকের মতো আমিও হেফাজতে ইসলামের নাম সম্পর্কেও গত ১ মাস আগেও পরিচিত ছিলাম না।
আমি মনে করি না শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বানচাল করার জন্যই হেফাজতে ইসলামের এই কর্মসূচি। তাদের ১৩ দফা দাবি বিশ্লেষণ থেকে বলা যায়, বহু আগে থেকেই বর্তমান সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ উদ্যোগগুলোর বিষয়ে তারা ক্ষুব্ধ। যেমন তারা জাতীয় নারী নীতির বিরোধিতা করেছে, তারা ক্ষুব্ধ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েও। তাদের এই সংক্ষুব্ধতার চূড়ান্ত পর্যায়টি হচ্ছে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের সাথে জড়িত কিছুসংখ্যক ব্লগারের আল্লাহ ও রাসূল (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি। যদিও আমরা এখনও Textটি পাইনি যে, আসলেই ব্লগাররা কি লিখেছে। ব্লগারদের এ ধরনের কর্মকান্ডের প্রেক্ষিতে হেফাজতে ইসলাম দাবি করছে, যারাই এ ধরনের কাজ করবে তাদের জন্য মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে আইন করতে। উপরের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে বিএনপি-জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও, ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে ইসলামী শরিয়া ভিত্তিক তাদের একটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান সুস্পষ্ট। এ কারণে আমি মনে করি, সাংগঠনিকভাবে নিজেদের মধ্যে বিভেদ থাকলেও হেফাজতে ইসলাম অরাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে টিকে থাকবে এবং তারা তাদের কর্মকান্ড অব্যাহত রাখবে।
বি.এন.পি-জামায়াতের হেফাজতে সংশ্লিষ্টতার কারণে বি.এন.পি চাইবে প্রাক-নির্বাচনকালীন তাদের রাজনীতির এই সংকটময় মুহূর্তে হেফাজতে ইসলামীর কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে। এই প্রচেষ্টা তারা সামনেও অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে এরশাদ তার প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে সকল ঘটনাকে তার নির্বাচনী সুবিধার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে জামায়াত হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালে সফল হবে, এটা মনে করি না। কারণ হেফাজতে ইসলামের অভ্যন্তরের কোন সংগঠনই যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে বিরোধিতা করছে না। আর এর বিরোধিতা করবে বলেও মনে হয় না। সুতরাং হেফাজতে ইসলামের কর্মকান্ড থেকে জামায়াত কোন সুবিধা পাবে বলে মনে হয় না। আর এই মুহূর্তে যুদ্ধাপরাধের বিরোধিতায় নামলে, হেফাজতে ইসলামের নিজের পরিচয় জামায়াতের পরিচয়ে ঢেকে যাবার সম্ভাবনাই বেশি।
অনেকেই মনে করেন, সরকার হেফাজতে ইসলামকে সমাবেশের অনুমতি দিয়ে ভুল করেছে। আমি মনে করি, তা-নয়। বরং সরকার তার বিরোধী হিসেবে নতুন Front খুলতে চায়নি। অন্যদিকে বি.এন.পি-জামায়াত এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে যেনো কোন নতুন সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা সরকারের জন্য প্রয়োজন ছিলো।
হেফাজতে ইসলামের দাবির প্রতি সরকারের নমনীয়তার জন্য সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদির কোপানলে পড়েছে। আমার মতে এই নমনীয়তা সরকারের একটি কৌশলমাত্র, যার কারণ আমি আগেই উল্লেখ করেছি।
হেফাজতে ইসলামের ১৩-দফা দাবি আবারও ইসলাম ও আধুনিকতার বিতর্ককে রাজনৈতিক জনক্ষেত্রে (Public Sphere) যেভাবে নারী এবং অমুসলিমদের বিষয়টিকে দেখা হয়েছে, তা উদারনৈতিক বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সমাজের চেতনার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এদিকে ৩জন ব্লগারকে গ্রেফতার করা হয়েছে আল্লাহ ও রাসূল (দঃ) এর বিরুদ্ধে কটূক্তি করার জন্য। এখানেও স্পষ্ট, ব্লগাররা যদি কিছু বলে উদারনৈতিক গণতন্ত্রে এটা তার বাকস্বাধীনতা, কিন্তু ইসলামিক বিশ্বাস অনুসারী আল্লাহ ও তার রসূল (দঃ)কে সকল কটূক্তির জায়গা থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব মুসলিমদের উপর দিয়েছে। একজনের কটূক্তির অধিকার যদি বাকস্বাধীনতা হয় আরেকজনের কর্তব্য হচ্ছে তার প্রতিবাদ করা। তাই যে কোন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করা কারোরই কাম্য নয়।
উল্লেখ্য যে, হেফাজতে ইসলাম যতগুলো দাবি সরকারের কাছে করেছে, তার প্রত্যেকটিই ধর্মীয়। হেফাজতে ইসলাম বলেছে, ঈমান আকিদা রক্ষার জন্যেই এসব দাবি তোলা হয়েছে। কিন্তু, ঈমান আকিদার বিষয়গুলোর পাশাপাশি সুশাসনের বিষয় যেমন : দুর্নীতি, সহিংসতা, নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি অবিচার এসব ইস্যুতে হেফাজতে ইসলামের বক্তব্য থাকা উচিত বলে অনেকে মনে করেন। আমার ধারণা সাধারণ মানুষের ভাবনা হচ্ছে ঘুষ-দুর্নীতি এবং দ্রব্যমূল্য, যা তাদের জীবনকে করছে দুর্বিষহ, আমি কারও মুখে শুনিনি, ঢাকা শহরে কয়টা মূর্তি হল এটা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা আছে।
যা হোক, ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক ইসলামের প্রসঙ্গটি সাধারণের আলোচনার মধ্যে প্রবেশ করেছে। ৬ মার্চের পর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আর ইসলাম টি.ভি টকশোর আলোচনায় এসেছে। এই আলোচনার মধ্যেই পরস্পরকে বোঝার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এটি বন্ধ হওয়া উচিত নয়। এই আলোচনা যত বেশি হবে, তাতে লাভবান হবে আমাদের গণতন্ত্র।
লেখক :সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
E-mail : ahmed.sabbir24@yahoo.com