[ অ র্থ নী তি ]
হরতালের বড় বলি দেশের অর্থনীতি
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ২০:৪৮
বাংলাদেশে বর্তমানে চলমান রাজনীতির সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। মনে হচ্ছে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে প্রতিনিয়ত সহিংস হরতাল, অগ্নিসংযোগ, বোমাবাজি ও খুন আমাদের পথভ্রষ্ট রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছে। দেশের রাজনীতির অঙ্গন থেকে সুবচন ও সহিংসতা চিরতরে নির্বাসিত হয়ে পেশী শক্তি ও হিংস্র উন্মাদনা এর স্থান দখল করে নিয়েছে। রাজনীতির নামে যে অপঘাত ও অসহিষ্ণুতা চলছে তা শেষ পর্যন্ত আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, তা এই মুহূর্তে বলা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে অমিত সম্ভাবনাময় দেশ হিসাবে সামপ্রতিককালে বাংলাদেশ যে সুখ্যাতি অর্জন করেছিল মনে হচ্ছে এসব কারণে তা একেবারেই পাংশে হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিবিদদের কাছে সহিংস হরতাল ছাড়া যেন প্রতিবাদের আর কোন ভাষা নেই। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে হরতালের দিন ছাড়াও হরতালের পূর্বদিন জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে হরতাল সফল করতে পূর্বদিন বিকেল থেকেই ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, বোমাবাজি ইত্যাদি করা হচ্ছে; যাতে সাধারণ মানুষ পরের দিন ভয়ে ঘর থেকে বের হতে সাহস না পায়। হরতাল ডাকা বা হরতাল পালন করা নাগরিক অধিকার বটে। কিন্তু সহিংস হরতাল করে নাগরিক জীবন বিপন্ন ও জিম্মি করার অধিকার কারো নেই। পৃথিবীর সর্বত্র বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেখানে মরিয়া হয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার পথে চলছে, সেখানে আমরা নিজেদের মধ্যে আত্মহননে লিপ্ত থেকে ভবিষ্যত্ সম্ভাবনাকে ভূলণ্ঠিত করছি। আমরা অনুধাবন করতে পারছি না, এ ধরনের আত্মঘাতী ও সহিংস কার্যক্রম আমাদেরকে কোন সর্বনাশের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সামপ্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, হরতালে প্রতিদিনের ক্ষতি প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাত্ প্রতিদিন ক্ষতি ২০ কোটি ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা। এই হিসাবে এই অর্থবছরে অর্থাত্ আগামী জুন পর্যন্ত যদি ৪০ দিন হরতাল হয় তাহলে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৬০০–৪০=৬৪ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে অতি সহজেই আমরা তিনটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারি এবং দেশের প্রবৃদ্ধি অনায়াসে আরো দুই শতাংশ বাড়াতে পারি। এ অবস্থায় যদি আরো হরতাল ও অন্যান্য নাশকতামূলক সহিংসতা চলতে থাকে তা হলে দেশের অর্থনীতির বুনিয়াদ একেবারেই ভেঙে পড়ে দেশ অচল হয়ে পড়বে।
অনেকের মতে সরকারের একচোখা নীতির কারণে আজ এ অবস্থা। তাইতো বিরোধীদলীয় নেতার মুখ থেকে শুনতে হয় যে, সরকার তাদের দাবি না মানলে দেশ অচল করে দেয়া হবে। এক অর্থে এখন তাই হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশ অচল করে দেয়া হলে লাভবান কে হবে? অবশ্যই বলা যায় যারা বাংলাদেশের মঙ্গল চায় না, যারা চায় বাংলাদেশ একটি দুর্বল, অকার্যকর রাষ্ট্র হিসাবে অন্যদের আজ্ঞাবহ ও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকুক তাদের স্বার্থই বেশি সিদ্ধ হবে। বাংলাদেশ একটি অগ্রসরমান, উদীয়মান এশিয়ান টাইগার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করুক এটা অনেকের কাছে গাত্রদাহ। দেশের চলমান হরতাল এবং এর সাথে বিভিন্ন ধরনের নিত্যনতুন নাশকতা ও সহিংসতা কোন দেশপ্রেমিক মানুষের মন ও বিবেককে দংশন না করে থাকতে পারে না। এর ফলে শুধু দেশের অর্থনীতি নয় বরং প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রেও এক ধরনের ব্যাপক হতাশা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে যা কখনোই কাম্য হতে পারে না। প্রশ্ন জাগে, তাহলে কী স্বাধীনতার দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর পর আমরা আবার কিসিঞ্জারের সেই ‘বটমলেস বাসকেট’ এর কলঙ্কের কালিমার তিলক ললাটে লিখতে যাচ্ছি।
সুধীপাঠক, মনে আছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পর মিল,ফ্যাক্টরি, পাটের গুদাম, খাদ্যের গুদাম ইত্যাদিতে জ্বালাও-পোড়াও, অগ্নিসংযোগের অহরহ ঘটনা। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেখানে-সেখানে মানুষ খুন, হত্যা ইত্যাদি করে সদ্য স্বাধীন দেশকে একটি অস্থিতিশীল ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার জঘন্য চক্রান্ত চালাচ্ছিল একটি চক্র। দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছরের অক্লান্ত ত্যাগ ও শ্রমের ফলে বাংলাদেশ যখন অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা লাভ করার পথে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে এবং ২০২১ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পথে অগ্রসরমান তখনই আবার দেশটির উপর নতুনভাবে আঘাত এসেছে। মনে হচ্ছে দেশ আরেকটি অপশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উদ্ধার, অসামপ্রদায়িক রাজনীতি, মুক্ত চিন্তার বিকাশ ও নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি যখন পৃথিবীর সর্বত্র প্রশংসিত হচ্ছে তখনই নতুনভাবে এসেছে এ আঘাত, দেশ ও জাতিকে পিছনের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য।
রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে যে ধ্বংসলীলা চলছে, যেভাবে নির্বিচারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর সদস্যকে পিটিয়ে ও যুদ্ধকালীন অবস্থার মতো অতর্কিত হামলা করে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে তার নজির পৃথিবীর খুব কম দেশে দেখা গেছে। ৭ মার্চ পর্যন্ত ৪ মাসে নিহত হয়েছেন ৭ পুলিশ, আহত হয়েছেন ৪৬৯ জন। হরতালের সবচেয়ে বড় টার্গেট হয়েছে রেলখাতসহ সকল ধরনের যানবাহন ও পরিবহন। খবরে প্রকাশ যে হরতালের ৬ মাসে ৪০০টি ট্রাক-বাসে আগুন দেয়া হয়েছে, ৩০০০টি ভাংচুর করা হয়েছে যার ক্ষতির পরিমাণ ২৫ কোটি টাকার উপর। হরতালের নামে রেলে অগ্নিসংযোগ করে রেলের বগি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, রেল স্টেশনে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। রেলের স্লিপার উপড়ে ফেলে দিয়ে জাতীয় সম্পদকে ধ্বংস করা হচ্ছে। রেলে নাশকতা ঘটেছে প্রায় ১০০টি, যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, সরকারি অফিস-আদালত, বাসস্থান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সরকারি কাজে নিয়োজিত প্রকৌশলীকে ছাদ থেকে ফেলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুত্ অফিসসহ পুরো স্থাপনা পুড়িয়ে ছাই করা হয়েছে। যার ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার উপর। তিল পরিমাণ দেশপ্রেম থাকলে কোন সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন লোক দেশীয় সম্পদ বিনষ্টে এ ধরনের উন্মাদনায় মেতে উঠতে পারে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তার দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে থাকা প্রায় ৩০ হাজার মূল্যবান গাছ কেটে ফেলে দিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। এদের আনুমানিক মূল্য ৩০ কোটি টাকার উপর। হরতালের নামে প্রকৃতির সাথে সহিংসতার এর চেয়ে নিকৃষ্ট নজির আর কী হতে পারে? এ যেন নিজ দেশের ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের অঘোষিত যুদ্ধ। সহিংস রাজনীতির আরেক বলি হয়েছে দেশের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়। নির্বিচারে তাদের বাড়ি-ঘর লুট করে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ২৪ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ২৪ দিনে ৩২০টি মন্দির, বাড়ি ও দোকানে হামলা হয়েছে। তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা হচ্ছে।
বলতে দ্বিধা নেই যে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মন্দা সত্ত্বেও খুব একটা খারাপ যাচ্ছিল না। প্রবৃদ্ধির হার গত কয়েক বছর ধরে ৬ শতাংশের উপর অবস্থান করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৩৭ শতাংশে। দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যা হ্রাস পেয়ে তা বর্তমানে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে যা এক দশক আগেও ছিল ৪৯ শতাংশে। জুন ২০১২ সালে ছিল মাথা পিছু আয় ছিল মার্কিন ডলার ৮৪৮ যা জুন ২০১১ সালে ছিল মার্কিন ডলার ৮১৬; মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে মাথাপিছু আয় হতে হবে ১৩০০ ডলার। যার অর্থ হচ্ছে আমাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি লাগাতারভাবে কমপক্ষে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে অটুট রাখতে হবে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান থাকলে তা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
২০১২ সাল পর্যন্ত দেশের অকার্যকর রাজনৈতিক অবস্থা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বেসরকারিখাত অনেকে ভাল করেছে এবং সার্বিকভাবে বাংলাদেশ উন্নতি করছে বলে মন্তব্য করেছে বিশ্বনন্দিত অর্থনৈতিক সাময়িক ‘দি ইকোনমিস্ট’। নভেম্বর ২০১২ এর প্রথম ইস্যুতে সাময়িকীটির ভাষ্য অনুযায়ী ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে মানুষের গড় আয়ু ১০ বছরে ৫৯ থেকে বেড়ে ৬৯ এর দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে বেশি। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে চার বছর বেশি। যদিও ভারতীয়রা অর্থসম্পদে বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি। এছাড়াও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বাংলাদেশ বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে। এমনকি বিশ্বব্যাংক তাদের ‘বিশ্ব উন্নয়ন রিপোর্ট ২০১৩’তে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ভাল করেছে বলে মন্তব্য করেছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন একটি অমীমাংসিত বিস্ময়। তারা বলছে কিছু দেশ মানব উন্নয়নসূচকে ভাল করেছে। কিছু দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভাল করেছে। যে গুটিকয়েক দেশ দুটি সূচকেই ভাল করেছে তাদের একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে গোল্ডম্যান স্যাকসের নেক্সট-১১ এ স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। নেক্সট ইলেভেন দেশগুলো হচ্ছে-বাংলাদেশ, মিশর, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম। এছাড়াও সিটি গ্রুপ কর্তৃক প্রণীত ‘দ্য ওয়েলস রিপোর্ট-২০১২’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের নাম এসেছে বিশেষভাবে। সিটি গ্রুপের বিশ্লেষণে এশিয়ার অর্থনীতির অগ্রদূতের তালিকায় নাম রয়েছে বাংলাদেশের। তাদের বিশ্লেষণে দেশের অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করার ক্ষমতা ও অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ শক্তিকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
হরতাল ও সহিংস রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত গার্মেন্টস শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রমাগত হরতালের কারণে অনেক বিদেশি ক্রেতা তাদের অর্ডার ভিন্ন দেশে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে তাদের জন্য ব্যবসা করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ ৩২ বছরে বেড়ে ওঠা এই শিল্প যা দেশের রপ্তানির প্রায় ৮৭ শতাংশ দখল করে রাখছে তা এখন মহাসংকটের সম্মুখীন। চীনের পরেই এই শিল্পে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প। সঠিক সাপোর্ট ও সহায়তা পেলে এই শিল্প অতি শ্রীঘ্রই চীনকে টপকিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে প্রথম স্থান দখল করে নিতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের রাজনীতিবিদদের এ নিয়ে কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। উল্লেখ্য যে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা থাকা সত্ত্বেও এই শিল্প ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের আট মাসে ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে। কিন্তু ২০১২ সালে বর্তমানে বিরাজমান সহিংস রাজনীতি দেশে ছিল না, যার জন্য দেশের প্রবৃদ্ধি ইতিপূর্বে ওই হারে অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। মনে রাখা দরকার যে বিশ্বব্যাংক, গোল্ডম্যান স্যাস ইত্যাদি সংস্থার মূল্যায়ন ২০১২ ও এর পূর্ববর্তী অবস্থার প্রেক্ষাপটে তৈরি করা হয়েছে। বিশ্বনন্দিত কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠান ম্যাকেনজির মতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বছরে রপ্তানি করার যোগ্যতা রাখে। এই সম্ভাবনাকে সর্ব শক্তি দিয়ে আমাদের অর্জন করতে হবে। অন্যথায় এই শিল্পের বিরাট অংশ দখল করে নিতে পারে ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া এবং সদ্য ইমার্জিং মায়ানমার।
হরতালের আরেক বড় বলি হয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। সকলেরই জানা আছে যে, ডিসেম্বর ২০১০ থেকে পুঁজিবাজারে যে ধস নেমে এসেছিল তা থেমে থেমে পুরো ২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সাধারণ সূচক ও লেনদেন দুইয়ে ব্যাপক পতন হয়েছে এই দুই বছর ধরে। উল্লেখ্য, যে ৫ ডিসেম্বর ২০১০ ডিএসই সাধারণ সূচক সর্বোচ্চ ৮৯০০ পয়েন্ট উঠে এবং লেনদেনও হয় সর্বোচ্চ ৩২৫০ কোটি টাকা। ১২ ডিসেম্বর ২০১০ ডিএসই সাধারণ সূচকে ২৯৪ পয়েন্ট পতন হয়। যা ছিল ওই সময়ে সর্বোচ্চ। এই পতনের পূর্ব পর্যন্ত বাজার মূলধন ৩ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছিল যা ছিল দেশের জিডিপি’র হার ৪৩.৫৭ শতাংশ। ১৯ ডিসেম্বর ২০১০ বাজারে সাধারণ সূচক আবার প্রায় ৫৫২ পয়েন্ট বা ৬.৭২ শতাংশ নেমে আসে। সেই থেকে সাধারণ সূচক ও লেনদেনের যে পতন শুরু হয় তা আর থেমে নেই। আশা করা গিয়েছিল যে বাজার ২০১১ বা ২০১২ তে ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু তাও হয়ে উঠেনি। শেষ ভরসা ছিল ২০১৩। অনেকেরই ধারণা ছিল যে ২০১৩ নির্বাচন পূর্ববর্তী বছর, সুতরাং বাজার ঘুরে দাঁড়াবে-কিন্তু এখানে বিধিবাম। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সহিংস রাজনৈতিক শুরু হওয়া থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ সূচক ও লেনদেন দুইয়ের পতন আরো ত্বরান্বিত হয়- যা সংক্ষিপ্ত চিত্র নিম্নে তুলে ধরা হলো।
মাস সাধারণ সূচক লেনদেন (কোটি টাকায়)
৩ মার্চ (প্রথম কার্য দিবস) ৩৮৪৮ ২৬২
১৪ মার্চ ৩৯৩৫ ১৭২
২১ মার্চ ৩৮৬০ ১৭০
৩১ মার্চ ৩৭২২ ১৬৭
১ এপ্রিল ৩৬১০ ১৩৮
৭ এপ্রিল ৩৬৫০ ১১৪
পৃথিবীর অন্য কোন দেশে পুঁজিবাজারে এ রকম দুর্বিষহ অবস্থা বিরাজ করছে বলে আমাদের জানা নেই। সুতরাং আমরা মনে করি এই মুহূর্তে বাজার উদ্ধার করার জন্য সরকারের একটি বলিষ্ঠ ‘বেইল আউট প্যাকেজ’ ঘোষণা করা জরুরি। ৫ ডিসেম্বর ২০১০ এর লেনদেন ৩২৫০ কোটি টাকার হিসাবে ৭ এপ্রিল ২০১৩ এর লেনদেন ১১৪ কোটি টাকা যা শতাংশের হিসাবে দাঁড়ায় ৩.৫ শতাংশ। এই হিসাবে দেখা যাবে যে প্রায় সকল বিনিয়োগকারীই পুঁজি খুইয়ে পথে বসে গেছেন। সহিংস রাজনীতি চলতে থাকলে বাজার আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে হরতালের কারণে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে দেশের ভাবমূর্তি। অর্থনীতির ক্ষেত্রে অযুত সম্ভাবনাময় দেশ হিসাবে বাংলাদেশ যে সুখ্যাতি অর্জন করেছে তা ইতিমধ্যেই পাংশে হয়ে যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ তো দূরের কথা দেশি বিনিয়োগও এ অবস্থায় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সুদূরপরাহত হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, দেশে এ ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান থাকলে হাজার হাজার শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাদের বর্তমান লোকবল ও তাদের বেতন-ভাতা ইত্যাদির খরচ কতোদিন যোগান দিতে পারবে তা রীতিমত দুঃশ্চিন্তার বিষয়। এ ক্ষেত্রে নতুনভাবে কর্মচারী ছাঁটাই-বাছাই শুরু হলে, মিল-ফ্যাক্টরি লে-অফ হলে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে বৈকি? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এ নিয়ে তেমন কোন মাথাব্যথা নেই।
সামপ্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতায় বিনিয়োগ প্রস্তাব কমে গেছে। বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে দেশীয় ১২১টি বিনিয়োগ প্রকল্পের নিবন্ধন হয়েছে। বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে মাত্র ২১টি প্রকল্পে। এক মাস আগে জানুয়ারি মাসেও দেড় শতাধিক প্রস্তাব এসেছিল দেশে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু দেশি বিনিয়োগকারীরা ১৬৫৫টি শিল্প নিবন্ধন করেছেন। এ বছর বিনিয়োগ প্রকল্প নিবন্ধনের হার কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসাবে দেশে চলমান রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও হরতাল ইত্যাদি বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবজনিত কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এফবিসিসিআই এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও দেশের ভাবমূর্তির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এমনিতেই অপ্রতুল অবকাঠামো, গ্যাস ও বিদ্যুত্সহ নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে সন্তোষজনক বিনিয়োগ আসছে না। তার উপর আবার এ ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা বিনিয়োগকে আরো বাধাগ্রস্ত করবে। এ অবস্থায় স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা যেমন নিরুত্সাহিত হবেন, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও তাদের বিনিয়োগ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাবেন যা হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিনিয়োগ। বন্ধ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দুয়ার। বাড়বে বেকারত্ব।
এমতাবস্থায় আমরা মনে করি ‘সবার উপরে দেশ’ এই দর্শনকে সামনে রেখে সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক ভিত্তিক আলোচনা শুরু হওয়া দরকার। বিশ্বায়নের এ যুগে আলোচনা ও সমঝোতা যেখানে সমস্যা সমাধানের একমাত্র নিয়ামক বলে বিবেচিত হচ্ছে সেখানে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো চরম মনান্তর ও প্রতিহিংসায় আলোচনার দুয়ার রুদ্ধ করে রেখেছেন যা কখনো কাম্য হতে পারে না। চরম শত্রুরাও যুদ্ধের মধ্যে আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি নজির পাওয়া যায়। আমরা মনে করি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কালবিলম্ব না করে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যার সমাধান করা উচিত।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail:aquadirchoudhury@gmail.com