আয়রন লেডির জীবনাবসান
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫২
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আয়রন লেডি খ্যাত মার্গারেট থ্যাচার আর বাঁচিয়া নাই। গত সোমবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে জীবনাবসান ঘটে অশীতিপর এই ব্রিটিশ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রনায়কের। মৃত্যুকালে তাঁহার বয়স হইয়াছিল ৮৭ বত্সর। তাঁহার মৃত্যুর মধ্য দিয়া অবসান ঘটিল ব্রিটিশ রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক কালপর্বের। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের ভাষায়, ‘আমরা হারাইলাম এক মহান নেতা, একজন মহান প্রধানমন্ত্রী, সর্বোপরি এক মহান ব্রিটিশ নাগরিককে।’ তিনি এই মহান নেতার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াও ব্রিটিশ এই নেতার মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করিয়াছেন। বাস্তবিক পক্ষেই নীতির প্রশ্নে আপোষহীনতা এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা ও অবিচলতার জন্য বিশ্ব-ইতিহাসে মার্গারেট থ্যাচার আলাদা একটি জায়গা করিয়া লইয়াছেন, যাহা অমোচনীয়। সমাজ, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পূর্বাপর তিনি অনুশীলন ও প্রয়োগ করিয়া গিয়াছেন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নীতি-আদর্শের। মার্গারেট থ্যাচার তাঁহার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়া একটি পৃথক রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক চিন্তার উদ্বোধন ঘটাইতে সক্ষম হইয়াছিলেন, যাহা থ্যাচারিজম নামে পরিচিতি পাইয়াছিল। নিজের দেশে তিনি তাঁহার মতবাদের জন্য যেমন নন্দিত হইয়াছেন, তেমনই সময়ান্তরে হইয়াছেন সমালোচিত। এমনকি নিজের দলের মধ্যেও তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়িতে হইয়াছে তাঁহাকে। ১৯৯০ সালে তাহার নিজের দল কনজারভেটিভ পার্টির এমপিদের বিরোধিতার কারণেই এই আয়রন লেডিকে পদত্যাগ করিতে হয়।
মার্গারেট থ্যাচারের জন্ম ১৯২৫ সালে একটি ব্যবসায়ী পরিবারে। তবে, রাজনীতির সঙ্গেও সংশ্লিষ্টতা ছিল তাঁহার পিতার। যতদূর জানা যায়, শৈশবেই থ্যাচারের মধ্যে প্রকাশ ঘটে নেতৃত্বের গুণাবলীর। স্কুলে তিনি অন্তত একবার হেডগার্ল নির্বাচিত হইয়াছিলেন। ১৯৪৩ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় হইতে রসায়নে গ্রাজুয়েশান করেন। বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণ করিতে মার্গারেট থ্যাচার দ্বিধা করেন নাই। ১৯৫৯ সালে কনজারভেটিভ পার্টির টিকিটে পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। তারপরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পথে তিনি একের পর এক অর্জন করেন সাফল্য। ১৯৭০ সালে তিনি কনজারভেটিভ সরকারের শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক মন্ত্রী পদে বৃত হন। ১৯৭৫ সালে এডওয়ার্ড হীতকে পরাজিত করিয়া মার্গারেট থ্যাচার নির্বাচিত হন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা। দায়িত্ব গ্রহণ করেন পার্লামেন্টে বিরোধী দলীয় নেতার। ১৯৭৯ সালে তিনি নির্বাচিত হইলেন ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী।
রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইবার পর মার্গারেট থ্যাচার অচিরেই তাঁহার রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃঢ়তার প্রমাণ দিতে শুরু করেন। কেনেজিয়ান অর্থনীতি এবং লেবার পার্টির অনুসৃত ইতিপূর্বেকার তথাকথিত কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণার বিপরীতে তিনি গ্রহণ করেন অবাধ নীতি, যাহা ‘লেইসেফেয়ারে’র কাছাকাছি। সরকারি হস্তক্ষেপ কম, স্বল্প ট্যাক্স এবং ব্যবসায় ও ভোক্তার স্বাধীনতার নীতি গ্রহণ করেন তিনি। ট্রেড ইউনিয়নের রাশও টানিয়া ধরেন। এই মর্মে আইন করা হয় যে, ধর্মঘট ডাকিবার আগে সদস্যদের ম্যান্ডেট লইতে হইবে। তিনি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন প্রাইভেটাইজেশানের উপর। আমেরিকার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে থ্যাচারের গৃহীত নীতির মিল ছিল।
অন্যদিকে, ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ব্রিটিশ কলোনী ফকল্যান্ড দখল করিয়া নিলে অবিলম্বে সমরাভিযান চালাইয়া উহা পুনরুদ্ধারে থ্যাচার দ্বিধা করেন নাই। ব্রিটেনের নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং আভিজাত্যবোধের প্রশ্নেও তিনি ছিলেন নিরাপোষ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের তিনি বিরোধিতা করেন। থ্যাচার বিশ্বাস করিতেন যে, ইউরোপীয়ান কমিউনিটির কার্যক্রম স্বচ্ছ বাণিজ্য এবং অবাধ প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমিত থাকা উচিত। প্রধানত এই কারণেই মার্গারেট থ্যাচারকে নিজ দলের পার্লামেন্টারিয়ানদের বিদ্রোহের মুখে পড়িতে হইয়াছিল এবং ক্ষমতা হইতে সরিয়া দাঁড়াইতে হইয়াছিল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্গারেট থ্যাচার সমঝোতার নীতিও গ্রহণ করিয়াছেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে। চীনের কাছে হংকংকে ফিরাইয়া দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাঁহার শাসনামলে। স্নায়ুযুদ্ধাবসানের প্রেক্ষাপট নির্মাণে থ্যাচারের ভূমিকা স্মরণীয় হইয়া আছে। এই আয়রন লেডির মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। আমরা তাঁহাকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়।