মাশরাফির জন্য অপেক্ষা

বাংলাদেশ দল তখন জিম্বাবুয়ের পথে। গত রাতেই পৌঁছে যাওয়ার কথা তাদের হারারেতে। সবাই অপেক্ষা করছিলেন দলের পৌঁছানোর খবর পাওয়ার জন্য। একইসময় মাশরাফি বিন মুর্তজার জন্য মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে অপেক্ষা করছিলেন বিসিবির চিকিত্সক। পরীক্ষামূলকভাবে একটা ব্যথা কমানোর জন্য একটা ইনজেকশন দেয়া হয়েছে মাশরাফিকে। গতকাল দেখার কথা ছিল উন্নতি হয়েছে কি না। হরতাল বা অন্য কোনো কারণে শেষ পর্যন্ত মিরপুরে এলেন না তিনি। ফলে অপেক্ষাটা দীর্ঘায়িত হল। চিকিত্সক দেবাশীষ চৌধুরি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘যে কোনো কারণেই হোক ও আসতে পারেনি। আজই (গতকাল) ওর উন্নতিটা বোঝার দরকার ছিল। যাই হোক, আমরা অপেক্ষা করছি।’ মাশরাফির জন্য এই অপেক্ষা শুধু বিসিবির বা তাদের চিকিত্সকের নয়। এই অপেক্ষা পুরো দেশের। এই অপেক্ষা বাংলাদেশের টেস্ট জার্সিরও বটে। ইনজুরি, অস্ত্রপচার আর ব্যথাকে সঙ্গী বানিয়ে এই এক যুগ ধরে ক্রিকেট খেলে যাচ্ছেন। এই শারীরিক প্রতিকূলতার মধ্যে বিস্ময়করভাবে এখনও দেশের সেরা বোলার তিনি। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে শরীর আর টেস্ট ক্রিকেটে সায় দিচ্ছে না। ফলে টেস্ট ক্রিকেট থেকে এই চার বছর একরকম দূরেই সরে ছিলেন। অবশেষে দেশে পেসারদের চরম সংকট দেখে প্রধান নির্বাচকের জানানো আহবানে সাড়া দিয়েছেন মাশরাফি। সুস্থ হলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই খেলতে চেয়েছিলেন। দৃশ্যত সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও বিসিবি অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে এই বিশেষ স্টেরয়েড ইনজেকশন যদি কোনো ‘মিরাকল’ ঘটিয়ে ব্যথাটা দ্রুত কমিয়ে আনতে পারে, তাহলে হয়তো দ্বিতীয় টেস্টে হলেও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আবার সাদা জার্সি গায়ে দেখা সম্ভব মাশরাফিকে। অন্তত ওয়ানডে সিরিজে তো তাকে বাংলাদেশ চাচ্ছেই চাচ্ছে। সেটা পেতে হলেও মাশরাফির ব্যথ্যার অবস্থাটা বোঝা দরকার। গতকাল পর্যন্ত সেটা বোঝা না গেলেও আজ-কালই হয়তো জানা যাবে, কী হতে যাচ্ছে। নির্বাচকরা বা অধিনায়ক আশাবাদী যে, মাশরাফি অন্তত ওয়ানডেতে ফিরবেনই। কিন্তু বাংলাদেশ তো আসলে টেস্টের মাশরাফির অপেক্ষায় আছে। আর সেই অপেক্ষাটা এই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই শেষ হলে কী অসাধারণই না হত। সেই ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের সোনালী প্রজন্মের দলের বিপক্ষে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে অভিষেক হয়েছিল ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ নাম পেয়ে যাওয়া মাশরাফির। প্রথম ইনিংসেই চার উইকেট। দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১১ রানের লিড নিয়ে খেলতে নামা বাংলাদেশের হয়ে পরপর দু বলে ডিওন ইব্রাহিম ও স্টুয়ার্ট কার্লাইলকে ক্লাসিক দুই ডেলিভারিতে ফেরত পাঠানো; সব যেন স্বপ্নের মতো দৃশ্য। সেই অভিষেকের পর কালক্রমে মাশরাফি বাংলাদেশের কিংবদন্তী হয়ে উঠেছেন। বারবার অপারেশন টেবিলে শুয়েছেন, বারবার যন্ত্রণায় কাতর হয়েছেন; তার মাঝেও দেশকে এনে দিয়েছেন একটা পর একটা আনন্দের উপলক্ষ। কিন্তু এক যুগের এই ক্যারিয়ারে একটা বড় অপ্রাপ্তি আছে মাশরাফির—টেস্টে এখনও ইনিংসে ৫ উইকেটে নেয়া হয়নি। সেটা না করেই টেস্টকে ‘বিদায়’ বলা তো সম্ভব না! অতএব অপেক্ষাটা শুধু দর্শক-সমর্থক-কর্মকর্তাদের তরফে নয়; মাশরাফিও নিশ্চয়ই সাদা জার্সির অপেক্ষায় আছেন!