[ নি র্বা চ ন ]
নিজের গড়া চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি শেখ হাসিনা
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩২
“কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার। এক. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি হবেন না। দুই. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কমিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার প্রশ্নই ওঠে না। তিন. রাষ্ট্রপতি হবেন রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দিবে আওয়ামী লীগ।”
বাংলাদেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি কে হবেন তা হয়তো পরিষ্কার হয়ে যাবে ২২ এপ্রিলের মধ্যেই। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী ২১ এপ্রিল মনোনয়নপত্র জমার পর ২২ এপ্রিল হবে যাচাই বাছাই। ভোট গ্রহণ ২৯ এপ্রিল। তবে একটি মাত্র মনোনয়ন জমা হলে (যার সম্ভাবনাই বেশি) ২২ এপ্রিলই চূড়ান্ত হয়ে যাবে কে হবেন দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি। সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কিন্তু দেশের বর্তমান সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এ এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর কারণ হচ্ছে তিনি নিজেই দুজন এমন ব্যক্তিকে দেশের রাষ্ট্রপতি করেছিলেন যে, সেরকম না হলে তাঁর নতুন সিদ্ধান্ত তাঁর আগের সিদ্ধান্তের তুলনায় কম গ্রহণযোগ্য হবে।
দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করেছিলেন যিনি ১৯৯১ সালেই দেশের সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। শুধু একজন প্রধান বিচারপতি হিসেবেই নন, একজন সত্, নিষ্ঠাবান এবং সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেও বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ নিজেকে অনন্য করেছিলেন দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে। উপরাষ্ট্রপতি পদে শপথ নিয়ে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় নির্বাচন উপহার দিয়েছিলেন। ফিরে গিয়েছিলেন নিজের কর্মস্থল সুপ্রিমকোর্টে এবং তাঁর অনমনীয় দৃঢ়তার কারণেই দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল নতুন করে। সংসদে কঠিন বক্তব্য দিয়ে তিনি তখনকার সরকারি দল বিএনপিকে বাধ্য করেছিলেন দ্বাদশ সংশোধনী পাস করাতে। ফলে একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আওয়ামী লীগের সদস্য নন এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করে সব মহলের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন প্রথমবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এবার শেখ হাসিনা দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রী। যিনি নির্দিষ্ট সময়ের মেয়াদ পূরণ করে ২০০১ সালে সুষ্ঠুভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু নিজেদের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি থাকার পরও নির্বাচনে হেরে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করেছেন। হয়তো ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা এবার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করেছিল দলের একজন সাবেক সাধারণ সম্পাদক, প্রেসিডিয়াম সদস্যকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য। কিন্তু দলের নেতা হলেও শেখ হাসিনা জিল্লুর রহমানের মত এমন একজন অভিজ্ঞ এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিককে বেছে নিয়েছিলেন যিনি আপনগুণে সব মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। এটা তাঁর মৃত্যুর পরের ঘটনা দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রপতি হিসেবে আওয়ামী লীগের চিরবৈরী দল বিএনপিকে বঙ্গভবনে সংলাপে নেয়ার কৃতিত্বই প্রমাণ করেছিলো তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল একটু ভিন্ন মাপের।
নিজের দু’দফার সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতায় বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ এবং জিল্লুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে শেখ হাসিনা নিজেই নিজের জন্য এক ব্যতিক্রমী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন। আর এখন জিল্লুর রহমানের শূন্য পদে একজন রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দিতে তাঁকে সেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কারণ এবারও বঙ্গবন্ধু কন্যাকে এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিতে হবে যিনি দেশের সকল মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন। আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হলে সেই নির্বাচন দেশ-বিদেশে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তার আগেই প্রধানমন্ত্রীকে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপতি করার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। অবশ্যই এই রাষ্ট্রপতিকে আগামী নির্বাচনের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ নিকট অতীতে নির্বাচনের সময় বিতর্কিত আচরণ করার কারণে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মদের করুণ প্রতিচ্ছবি এখন বিস্মৃত হয়ে যায়নি।
গত মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের একটি বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দলের নেতাদের আলোচনা হয়েছে। দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত জননেতা আব্দুল জলিলের মৃত্যুতে শূন্য হ্ওয়া সংসদের নওগাঁ-৫ আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েও কথা হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই বৈঠকের খবর জানতেই দলের একজন প্রভাবশালী নেতার সাথে কথা বলেছি। জানতে চেয়েছিলাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে কারো নাম ধরে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা। ঝানু রাজনীতিবিদ ঝেড়ে কাশলেন না। শুধু বললেন অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আওয়ামী লীগ প্রধানকে। আর বললেন ওপরের কথাগুলো, যা দিয়ে এই লেখার সূচনা করেছি। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন আছে স্পিকার এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এডভোকেটেরই রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, ডা. এস এ মালেক, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান কিংবা সাবেক দুই প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও তাফাজ্জল ইসলামের নাম শুরুতে আলোচনায় এলেও এখন তা অনেকটাই থিতিয়ে গেছে। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী এখনকার রাষ্ট্রপতি ৫ বছরের মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন। সে কারণে যদি আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হতে না পারে তাহলে এই রাষ্ট্রপতিকে অন্য দলের সরকারের সংগে বসবাস করতে হবে। আর যদি সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সংসদ আরো একটি বারের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে সম্মত হয় তাহলে নতুন রাষ্ট্রপতিরও প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সুযোগ থাকবে। সেক্ষেত্রে হাজারো সমীকরণ কষেই শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দিতে হবে। আর অতিক্রম করতে হবে নিজের তৈরি চ্যালেঞ্জগুলোকে। বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করে দেশকে নির্বাচনমুখী করার বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। আছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে গড়ে ওঠা জনমতের প্রতি সম্মান দেখানোর নির্বাচনী ইশতেহার ভিত্তিক অঙ্গীকার। প্রতিপক্ষ বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনবার (১৯৯৬ সালের বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটে জয়ী হওয়াসহ) শপথ নিয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে তিনিও তিনবার শপথ নিবেন সরকার প্রধান হিসেবে। একই দলের পরপর দুটি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার রেকর্ড গড়তে পারবেন আওয়ামী লীগ প্রধান। সেটাও একটি চ্যালেঞ্জ বৈকি ?
লেখক : এডিটর (আউটপুট), এটিএন নিউজ
pranab67@gmail.com