উচ্চশিক্ষায় প্রতারণা শেষ কোথায়

উচ্চশিক্ষায় চলমান নানাবিধ প্রতারণা নিয়ে যেসব সংবাদ সামপ্রতিক সময়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নামসর্বস্ব ভুয়া বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ‘দূরশিক্ষণ’ পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, উচ্চশিক্ষা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রতারণা, অনুমোদনহীন ‘ভুয়া’ বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ খুলে শিক্ষার্থী ভর্তির পাঁয়তারা, মালিকানার দ্বন্দ্বে সৃষ্ট একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ক্যামপাস স্থাপন, আউটার ক্যামপাস বা শাখা ক্যামপাস খুলে প্রতারণা ইত্যাদি। উচ্চশিক্ষায় প্রতারণার বিষয়টি একেবারেই যে নতুন, তা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চশিক্ষায় এ ধরনের লাগামহীন প্রতারণা ও নির্লজ্জ বাণিজ্য চলে আসছে এবং চলছে। দেশে বিদ্যমান নানাবিধ প্রতারণার মিছিলে উচ্চশিক্ষাও যে শামিল হয়েছে বা শামিল হতে বাধ্য করা হয়েছে কিছু অসত্ মানুষ কর্তৃক সেটা এখন আর অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। প্রচলিত আইন কানুন বিদ্যমান এসব প্রতারণা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় এসব অরাজক পরিস্থিতির উন্নতিরও কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না । ফলে, দিনের পর দিন মানুষ প্রতারিত হয়েই চলছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা অবৈধ এবং চ্যান্সেলর হিসাবে মহামান্য রাষ্ট্রপতিই একমাত্র ভিসি নিয়োগ দেয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু আমাদের দেশের অনেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে নিজেকেই ভিসি হিসাবে প্রচার করছেন। এছাড়া, কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার নামেও প্রতারণা করা হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যাপারে আপস না করলেও বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আউটার ক্যাম্পাস, অননুমোদিত বা সরকার কর্তৃক বন্ধ ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয়ার পরিবর্তে অনবরত প্রতারণা করেই যাচ্ছে। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী আউটার ক্যাম্পাস ও দূরশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এসব অবৈধ শাখা থেকে মানুষ ডিগ্রি নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার করছে বা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ ধরনের প্রতারণা রোধে প্রয়োজনীয় তদারকির অভাব বরাবরের মত পরিলক্ষিত হওয়ায় কিছু অসত্ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছত্রচ্ছায়ায় এসব প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড বেড়েই চলছে। মানসম্মত শিক্ষা সমপ্রসারণের লক্ষ্যে বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং উহার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য প্রণীত ১৯৯২ সালের আইনটি সংশোধন করে প্রণয়ন করা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০। আইন অনুযায়ী, সরকারের অনুমতি ব্যতীত বাংলাদেশের কোন স্থানে কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বা পরিচালনা করা যাবে না, বা বাংলাদেশে কোন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালনা বা কোন ডিগ্রি, ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট প্রদান করা যাবে না। এমনকি, শিক্ষার্থী ভর্তি বা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার উদ্দেশে কোনরূপ প্রসপেক্টাস, বিজ্ঞাপন, লিফলেট ইত্যাদি প্রকাশ ও প্রচার নিষিদ্ধ। আইনে আরও বলা হয়েছে, কোন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের নামে ক্যাম্পাস স্থাপন অথবা কোন প্রোগ্রাম বা কোর্স অনুমোদন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় সরকার প্রণীত বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। কিন্তু আইনে যাই থাকুক না কেন, বাংলাদেশে অনুমোদনহীন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা যে নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সেটা আন্দাজ করতে খুব বেশি কষ্ট হয় না । এমতাবস্থায়, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে পরিচালিত হওয়া শাখা, স্টাডি, লার্নিং, রিক্রুটিং সেন্টারসহ এ সংক্রান্ত সব প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনা ও বাংলাদেশে বিদেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয়ার লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (বিমক) দায়িত্ব ও কর্মপরিধি আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়া ও বর্তমান ক্ষমতা, কর্তৃত্ব বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বিধায় বিমককে উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত সব আয়োজনের পরেও কি উচ্চশিক্ষায় প্রতারণা কমবে ? যেখানে বিদ্যমান আইনকে পাশ কাটিয়ে প্রতারণা বেড়েই চলছে। একথা সত্য যে, গত দুই দশকে দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সমপ্রসারিত হয়েছে কিন্তু প্রতারণামুক্ত ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা গেছে এমন দাবি যুক্তিসঙ্গত নয়। সেই সাথে প্রতারণার বিষয়টিও লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে যা অভিভাবক, শিক্ষার্থীসহ সচেতন মানুষদের আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নামসর্বস্ব নানা প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদেরকে প্রতারিত করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংকট, উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও বিদ্যমান বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে বিভিন্নভাবে প্রতারণা করে আসছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এভাবে চলতে পারে না। এসব বিষয় কঠোর হাতে দমন করা জরুরি। এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের প্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুমোদনের বিষয়ে যথাযথ তথ্যানুসন্ধান করে ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। অভিভাবকসহ নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতা ও সোচ্চার ভূমিকাই পারে এসব প্রতারণা রোধ করতে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, বিমক চেয়ারম্যান মানসম্মত শিক্ষার ব্যাপারে আপস করার যে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, আমি তাতে বিশ্বাস রাখতে চাই। আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আসলে আমরা কি চাই, মানসম্পন্ন শিক্ষা নাকি সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষা। যদি আগামীর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় জাতি হিসাবে টিকে থাকতে হয়, উচ্চশিক্ষায় এসব প্রতারণা রোধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই। প্রতারণামুক্ত মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা সমাজে ছড়িয়ে পড়ুক, এটাই প্রত্যাশা। লেখক : ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ashadullah.bd@gmail.com