বাবা-মা বলেছেন, অতএব...
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ১৬:০১
রুখসানা বেগমের মা সাফিনা বেগম একজন প্যারামেডিক, তার স্বামী রাজনীতিবিদ। অনেক বিষয়-সম্পত্তির মালিক, কোটিপতি বলা যায় অনায়াসেই। তারা থাকেন ঢাকার বাইরের একটা জেলা শহরে। সাফিনা বেগমের অনেক ইচ্ছে, ছেলে রাহিনকে ডাক্তারী পড়াবন। সরকারি মেডিক্যালে চান্স পেল না, তাই মোটা অংকে ডোনেশন দিয়ে ঢাকার এক প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করানো হলো। মাসে মাসে বেতন ও অন্যান্য খরচ বাবদও বড় অংকের খরচ হতে লাগল। ছেলে দুই বছর পড়ল, তার পর আর পড়ালেখা শেষ করল না। কারণ তার ডাক্তারী পড়ার আগ্রহ শেষ, এত কষ্ট করতে ইচ্ছে করে না তার। মাথায় ঢুকল, ফ্যাশন ডিজাইন কিংবা ওই টাইপের কিছু পড়বে, সেটাও পড়া হলো না। এখন রুখসানা মাঝে মাঝে তার মাকে বকাঝকা করে, তার লাইফটা নষ্ট করে দেওয়ার জন্য। এই প্রতীকী ঘটনাটিতে অভিভাবকদের আশাভঙ্গ হয়েছে, আর্থিক অপচয় হয়েছে। যেসব অভিভাবক সন্তানদের ফোর্স করেন বিষয় নির্বাচনের জন্য, তাদেরকে অনুরোধ করব, আপনার নিজের পছন্দ-অপছন্দ সন্তানের উপর চাপিয়ে দিবেন না। তবে একটা সুপ্ত ইচ্ছে থাকে, সব বাবা-মায়ের মনে। আমার ছেলে এমন হবে, আমার মেয়ে এমন হবে... এই রকম। যদি ইচ্ছেই থাকে, তবে আপনার সন্তানকে কোন পেশায় দেখতে চান? কেন দেখতে চান? আপনার সন্তানকে পেশায় সত্ হিসেবে দেখতে চান নাকি ইনকামে সফল হিসেবে দেখতে চান? যেকোনো মানুষ, যত খারাপ পেশায় থাকুক না কেন, সে চায়, তার ছেলে একটু ভালো কাজ করুক। একজন চোরও কখনও চায় না, তার ছেলে চুরি করুক। সে চোর ঠিক আছে, কিন্তু তার সন্তান যেন পড়ালেখা করে পুলিশ কিংব উকিল হতে পারে, সেই কামনা করে চোরটি। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিতা-মাতা সন্তানের সামর্থ্য এবং পারদর্শিতা বিবেচনায় না নিয়ে তাদের স্বীয় আকাঙ্ক্ষা চাপিয়ে দেন সন্তানের উপর। যেহেতু ১৫-১৬ বছর বয়সী একজন ছেলে বা মেয়ের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্তটা নেওয়া বেশ কঠিন, এ ক্ষেত্রে পিতা-মাতার দায়িত্ব সন্তানের মেধা, শক্তি-সমার্থ্য এবং পারদর্শিতা বিবেচনায় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। অন্যথায় অনেক ক্ষেত্রেই মেধার অমূল্যায়ন হতে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ, যে ছেলের সামর্থ্য নেই বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার, তাকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে বাধ্য করলে ব্যাপারটা মোটেও সুখকর হয় না।
ব্যক্তিগত আবেগ কিংবা ঈর্ষাকে পরাজিত করা
পিতা-মাতা কিংবা অভিভাবকদের আবেগ অথবা ঈর্ষা অনেকক্ষেত্রে সন্তানের ক্যারিয়ার ধ্বংসের কারণ হয়। দুনিয়ার সব মা-বাবাই নিজ সন্তানকে উচ্চ আসনে দেখতে চান। অনেক মা-বাবা স্বীয় সন্তানকে সম্মানজনক পেশা যেমন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেখতে চান। শুধু মা-বাবার এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষাই সন্তানের ভবিষ্যত্ ক্যারিয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র উপকরণ হতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঈর্ষার বশবর্তী হয়েও সন্তানের ক্যারিয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অমুকের ছেলে ডাক্তারী পড়ে, তো আমার ছেলেকেও ডাক্তারী পড়াতে হবে—ইত্যাদি ঈর্ষান্বিত কার্যকলাপ একেবারেই ভালো ফলাফল বয়ে আনে না। সন্তানের সামর্থ্য থাকলে ডাক্তারী পড়বে না হলে অন্য কিছু পড়বে। সুতরাং আবেগ কিংবা ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে সন্তানের ভবিষ্যত্ ক্যারিয়ার নির্ধারণ করা একেবারেই অনুচিত।
আপনি কী চান?
সবার আগে আপনি কী চান সেটা ঠিক করুন। ক্যারিয়ার মানে, যেটা আমাদের স্বাবলম্বী করে জীবনে এগিয়ে নিয়ে যায়। লক্ষ্য রাখতে হবে ক্যারিয়ার যেন আপনার বোঝা না হয়ে যায়। বরং ক্যারিয়ার থেকে যেন আপনি আপনার জীবনের খোরাক পান, সেটা মাথায় রাখবেন। কারণ, আজ আপনি যে ক্যারিয়ার বাছাই করবেন, বাকি জীবনটা সেই কিন্তু আপনার বেশিরভাগ সময়ের সঙ্গী, আপনার পরিচিতি, সাপোর্ট সবটাই। সেটা কোনো চাকরি হতে পারে, ব্যবসা হতে পারে আবার সেল্ফ এমপ্লয়মেন্ট হতে পারে। চাকরি মানে সরকারি বা বেসরকারি চাকরি। দু’রকম চাকরিতে দু’রকম প্রস্তুতি। ব্যবসা করলে আগে কীসের ব্যবসা করবেন, সেটা ঠিক করুন। তারপর সেই ব্যবসা শুরু করতে কত টাকা লাগবে, বা কতটা ঝুঁকি নিতে হবে সেটা দেখুন। যদি দেখেন সবটা পারছেন, তবেই সেদিকে পা বাড়ান। আর একটা অপশন হলো সেল্ফ এমপ্লয়মেন্ট। এ ক্ষেত্রে কারও আন্ডারে চাকরি বা ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করার মাথাব্যথা নেই।
টিকে থাকার লড়াইয়ে
টেস্ট ম্যাচের গোড়ায় ওপেনারদের আসল পরীক্ষা! মাথায়-পাঁজরে বলের বাড়ি খেয়েও ক্রিজে টিকে থাকার মধ্যেই আসল পরীক্ষা। র্যাংকিংয়ের শীর্ষে টিকে থাকা সেখানে পৌঁছানোর চেয়েও কঠিন। ক্যারিয়ারের সাফল্য অর্জন করা পার্কে মর্নিংওয়াকের মতো সহজ ব্যাপার নয়। আপনার পছন্দসই ক্যারিয়ারের দোরগোড়ায় পৌঁছতে পারেন বটে, কিন্তু সেখানে টিকে থেকে উপরে ওঠার ব্যাপারটা ভাগ্যের হাতে ছাড়লে হবে না। হিসেব করতে হবে, মেপে মেপে স্টেপ ভাঙতে হবে। আর প্রথম স্টেপে পেশাদার জগতে আপনি কেউ না, যখন সবচেয়ে নিচের ধাপে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আপনি। কলেজ বা স্কুলে আপনার যে হোল্ড ছিল, সেটা এখানে থাকবে না। কিছুদিনের জন্য আপনাকে মানিয়ে নিতে হবেই, অল্পসল্প কম্প্রোমাইজ করাটাও আশ্চর্য নয়। নতুন জায়গায় গিয়ে বাসা বাঁধলে গোড়ায় একটু অস্বস্তি বোধ হয়। সেটা মানিয়ে নিতে পারলেই কোনো অসুবিধা থাকবে না। দ্বিতীয় স্টেপে জীবনে সাফল্য লুকিয়ে রয়েছে ইমেজ ম্যানেজমেন্টে। কোনো চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর লোকে বলে ক’দিন চুপচাপ থাকতে। কারণ, ওই ক’দিনেই আপনার ইমেজ অন্য লোকের মনে একটা নির্দিষ্ট শেপ নেয় ও গোড়ার দিকে তৈরি হওয়া ইমেজটা থেকেই যায়। ভালো কাজ, নম্র ব্যবহারের প্রলেপে সেটার উপর যতই পালিশ আনেন না কেন, ছোপটা যায় না। যেখানে ইমেজেরই সাড়ে বারোটা বেজে রয়েছে, সেখানে বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। তৃতীয় স্টেপে টিকে না হয় রইলেন। তবে নট নড়চড় করলে লোকে আবার কুয়োর ব্যাঙ বলবে। তা ছাড়া, যে কাজে হাত দিয়েছেন তাতে চমক না আনতে পারলে তো পেশাদারের অপমান। তাই উর্ধ্বগতি ষোলোআনা নিশ্চিত করতে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করুন। লোকে জানুক, আপনার ব্র্যান্ডের বৈশিষ্ট কী এবং কাজে ঠিক কোন ফ্যাক্টরগুলো নিয়ে আসেন আপনি। শেষ স্টেপে মন্ত্রগুপ্তি জানতে হবে। হাতের তাস হাতেই রাখার মতো। কর্মক্ষেত্রে বন্ধু হয় না, এ কথা কেউ বুক ঠুকে বলতে পারবে না। কিন্তু সে চান্স কম। তাই হাতের তাস হাতে রাখতে হবে। মনে রাখবেন, আপনি কিন্তু কারও ক্ষতি করছেন না। কেউই পিছিয়ে থাকতে চায় না, সবাই নিজের গতি এগিয়ে যায় ক্যারিয়ারের উঁচু-নিচু নানা পথ বেয়ে।