নীল পাহাড়ের দেশে বিতর্কের প্রারম্ভিকা
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ১৬:০৩
সূর্য তখন আকাশ থেকে ছুটি নিয়েছে। রাতের আঁধারে ছেয়ে গেছে চারপাশ। এই আঁধারের মাঝে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ভিড় করেছে একরাশ তারকা। শুভবুদ্ধি ও সুবিবেকবোধ সম্পন্ন এইসব তারকার প্রত্যেকেই যুক্তিতে জোরদার ও শানিত হওয়ার সূতিকাগার, দেশের কেন্দ্রীয় বিতর্ক সংগঠন ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)- এর সদস্য। তারা সবাই শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে মিলিত হয়েছেন ‘১ম এনডিএফ বিডি পার্বত্য জেলা বিতর্ক কর্মশালা ও লিডারশিপ ট্রেনিং প্রোগ্রাম ২০১৩’-তে অংশগ্রহণ করতে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন বলে। সঠিক সময়ে গাড়ি এসে হাজির। সবাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গাড়িতে উঠানোর পর গাড়ি যাত্রা শুরু করল বান্দরবানের উদ্দেশে।
আঁধারের বুক চিড়ে যুক্তির আলোকবর্তিকাদের বহন করে আমাদের গাড়ি তখন এগিয়ে চলছে বান্দরবানের পানে। আঁকাবাকা ও উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে আমরা যখন বান্দরবানে পৌঁছেছি তখন চারপাশ দিনের প্রথম আলোয় ঝলমল করছে। আদিবাসী ও বাঙালির পারস্পরিক সম্প্রীতির মেলবন্ধন ঘটেছে এই বান্দরবানে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্থাপিত বিশাল বিলবোর্ডগুলো সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছে বারবার। দিনের প্রথম রবিরশ্মির স্নিগ্ধ পরশ গায়ে মেখে একদল তাজাপ্রাণ বিতার্কিক পা রাখল বান্দরবানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের অনিন্দ্য সুন্দর অঙ্গনে। চারপাশের নিঃস্তব্ধ নীরবতা, নির্মল প্রকৃতি, সাজানো পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন আঙ্গিনা আর সুবিশাল পাহাড়ের আলিঙ্গনে বিমুগ্ধ সবাই।
গত ২৯ ও ৩০ মার্চ, এই দুইদিনব্যাপী এই আয়োজনে ছিল বান্দরবানের নানা দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন, লিডারশিপ ট্রেনিং, বিতর্ক কর্মশালা, প্রদর্শনী বিতর্ক, বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপিং, ফটোসেশনসহ নানা আয়োজন। আর এসব আয়োজনজুড়ে সাথে ছিল সারাদেশ থেকে আগত এনডিএফ বিডির বেশকিছু মেধাবী ও তুখোড় বিতার্কিক। সকালের নাস্তা শেষে ‘ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)-এর অভিযাত্রী দল প্রস্তুতি নিল বান্দরবানের চমত্কার সব দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য। প্রস্তুতি শেষে অবাক সবাই! দ্বারে দাঁড়িয়ে ‘চান্দের গাড়ি’। নীলগিরি পৌঁছে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম। সবশেষে যখন ফিরে আসার ক্ষণ ঘনিয়ে এল তখন একবুক তৃপ্তি আর একরাশ ভালোলাগা সাথে নিয়ে আবার চড়ে বসা চান্দের গাড়িতে। এরপর মেঘলা ও নীলাচলের সৌন্দর্য উপভোগ করে ক্লান্ত দেহ আর আনন্দিত মন নিয়ে ফিরে এলাম বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে। বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অডিটরিয়ামে রাতের খাবারের পর শুরু হলো লিডারশিপ ট্রেনিং প্রোগ্রাম। ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)-এর কো-চেয়ারম্যান উত্তম রয় অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাণবন্ত কথনের দ্বারা ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)-এর নানান বিষয় সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন। এরপর পরবর্তী দিনের কার্যক্রম ও সবার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে শেষ করা হলো প্রথম দিনের কর্মসূচি। সূর্যের আলো রাতের আঁধার দূর করে দেওয়ার সাথে সাথেই ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)-এর উচ্ছ্বল বিতার্কিক বন্ধুরা তৈরি হয়ে গেল দ্বিতীয় দিনের কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য। সকালে বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাত্যহিক সমাবেশ শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হলো র্যালি। এতে অংশ নেয় বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বান্দরবানের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিতর্ক অনুরাগী শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ। এরপর শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের আঙ্গিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাঈদ সিদ্দিকী,পিএসসি রিজিওনাল কমান্ডার, বান্দরবান রিজিওন ও সভাপতি, পরিচালনা পর্ষদ, বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ; অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লেফটেনেন্ট কর্ণেল আবু ছালেহ মো. রফিকুল ইসলাম, এইসি অধ্যক্ষ, বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ; অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেএম তারিকুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক, বান্দরবান পার্বত্য জেলা; কামরুল আহসান, পুলিশ সুপার, বান্দরবান পার্বত্য জেলা; একেএম শোয়েব, চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাঈদ সিদ্দিকী বলেন, ‘ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)-এর এই আয়োজন বান্দরবান পার্বত্য জেলায় বিতর্ক ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আমি আশা করি।’ অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)-এর চেয়ারম্যান একেএম শোয়েব বলেন, ‘পার্বত্য জেলাগুলোর পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের যুক্তির ছোঁয়া দিতে ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ ( এনডিএফ বিডি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ অনুষ্ঠানের পাশাপশি অডিটরিয়ামের সামনে বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের কিছু মেধাবী ও উদ্যমী বিতার্কিক বন্ধুদের পরিচালনায় চলে ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং কর্মসূচি। এতে বান্দরবানের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে তাদের রক্তের গ্রুপ জেনে নেয়। এই উদ্যোগের ফলে বিনা মূল্যে নিজের রক্তের গ্রুপ জেনে নেয় প্রায় দুই শতাধিক আদিবাসী ও বাঙালি শিক্ষার্থী। প্রাণবন্ত বিতর্কের পর মাহবুবুর রহমান শাকিলের পরিচালনায় শুরু হয় সংসদীয় মডেলের বিতর্ক কর্মশালা। অনুষ্ঠানে ব্লাড গ্রুপিংয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ক্যাম্পেইন করেন কুমুদিনী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সুকন্যা। এতে সহযোগিতা করে শ্যামলী পরিবহন। এরপর অংশগ্রহণকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝে ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)-এর শুভেচ্ছা উপহার বিতরণ করা হয়। এরপর গ্রুপ ফটোসেশন পর্ব। সবশেষে অনুষ্ঠানের সভাপতি সমাপনী বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের ইতি টানেন। বিতর্ক কর্মশালায় বান্দরবান পার্বত্য জেলার সহস্রাধিক আদিবাসী ও বাঙালি বিতর্ক অনুরাগী শিক্ষক-শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বান্দরবান সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বান্দরবান সরকারি কলেজ, বান্দরবান সরকারি মহিলা কলেজ, কালেক্টরেট স্কুল, আল-ফারুক ইনস্টিটিউট, সাঙ্গু উচ্চ বিদ্যালয়, রেইছা উচ্চ বিদ্যালয়, বিলকিছ বেগম উচ্চ বিদ্যালয়, সোয়ালক উচ্চ বিদ্যালয়, বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। আয়োজনটিকে সফলভাবে শেষ করতে বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ অধ্যক্ষ মহোদয়ের নেতৃত্বে শিক্ষক আশরাফ, ইয়াকুব, আতিকুর, সন্তোষ, কবির, শওকতসহ একদল চৌকুস ও কর্মঠ শিক্ষকমণ্ডলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীবৃন্দ পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। মধ্যাহ্ন ভোজের পর ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)-এর সদস্যরা চলে যায় স্বর্ণ মন্দিরে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র এই স্থানের নান্দনিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করে সবাইকে। এরপর বান্দরবান রিজিওনের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাঈদ সিদ্দিকী পিএসসি-এর আমন্ত্রণে সবাই বান্দরবান সেনানিবাস ঘুরে দেখেন।