ব্রিটিশবিরোধী বিপ্ল¬বীর পরলোকগমন

তাহাকে বলা হইতো সর্বশেষ বিপ্ল¬বী। অর্থাত্ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বেঁচে থাকা শেষ বিপ্লবী। তাহার নাম বিনোদবিহারী চৌধুরী। তিনি ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেনের অন্যতম সহযোগী, চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বীর যোদ্ধা। বুধবার ১০৪ বত্সর বয়সে তিনি কলকাতার একটি হাসপাতালে পরলোকগমন করিয়াছেন। সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাহার মতোই যুক্ত ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, কালীপদ চক্রবর্তী, অম্বিকা চক্রবর্তী, তারকেশ্বর দস্তিদার প্রমুখ। তাহার সহযোদ্ধাদের অনেকেই ব্রিটিশ রাজ প্রদত্ত শাস্তিতে শহীদ হইয়াছেন, কেহবা আত্মবিসর্জন দিয়াছেন। তিনিই একমাত্র ব্রিটিশশাসনমুক্ত ভারতবর্ষকে দেখিয়াছেন। চট্টগ্রামে তাহাদের আন্দোলন সর্বাঙ্গীন সাফল্যের মুখ না দেখিলেও, ইহা সর্বভারতীয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিশাল অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করিয়াছে। চট্টগ্রামের জালালাবাদ যুদ্ধে তিনি অংশ নেন এবং গুলিবিদ্ধ হন। ব্রিটিশ সরকার জীবিত বা মৃত বিনোদবিহারীর মাথার দাম তত্কালীন ৫০০ টাকা ঘোষণা করে। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বিনোদবিহারীরা তিন দিনের জন্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন করিয়া রাখিয়াছিলেন। তবে কেবল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেই নহে, বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরীর সারাটা জীবনই কাটিয়াছে আন্দোলন-প্রতিরোধের মধ্য দিয়া। বস্তুত গত শতকের তিরিশের দশকের আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন সদ্যতরুণ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সালাম-রফিক-বরকতদের হত্যা করা হইলে সংসদে তত্কালীন নুরুল আমীন সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ আমলের পাশাপাশি পাকিস্তান আমলেও বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেন তিনি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ হইবার পরে তাহার সমসাময়িক অনেকেই চিরতরে ভারত গমন করিলেও, তিনি প্রিয় জন্মভূমি চট্টগ্রামে থাকিয়া যান। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার নিয়া আন্দোলন করিয়াছেন। হিন্দু সমপ্রদায়ের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক শত্রু সম্পত্তি আইন কিংবা মাস্টারদা সূর্যসেনের বাড়ি রক্ষায় দীর্ঘসময় আন্দোলন করিয়াছেন বিনোদবিহারী। স্বাধীন দেশে যখনই সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের উপর নামিয়া আসিয়াছে নির্যাতনের খড়গ, তখনই তিনি সোচ্চার হইয়াছেন। চরম বার্ধক্যের মধ্যেও রাজপথের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়াছেন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত অপর্ণাচরণ স্কুল ভাঙ্গিয়া মার্কেট গড়িবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়িইয়াছেন তিনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। সূর্যসেন এবং চট্টগ্রামের আন্দোলনের উপরে সমপ্রতি হিন্দিভাষায় দুইটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করিয়াছে বলিউড। উভয় চলচ্চিত্রের ইউনিটের লোকজন প্রাথমিক গবেষণার কাজে একাধিকবার বিনোদবিহারী চৌধুরীর কাছে আসিয়াছেন। ইহা প্রমাণ করে যে, এইরূপ জীবন্ত কিংবদন্তীকে হারাইবার ক্ষতি কীরূপ। তিনি যেন বাংলাদেশের পুরা ইতিহাস একাই বহন করিয়া চলিতেছিলেন। তাহাকে পাঠ করিলেই যেন বাংলাদেশকে পাঠ করা হয়। বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরী স্বাধীনতাকামী মানুষের কাছে চিরকালীন প্রেরণা হিসাবে বাঁচিয়া থাকিবেন।