ভারতীয় হাইকমিশনারের নিরাপত্তা

শুক্রবার খুলনায় ভারতীয় হাইকমিশনার পংকজ শরণের গাড়ীর অদূরে দুষ্কৃতকারীদের ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় সকলেই যুগপত্ বিস্ময়াহত এবং উদ্বিগ্ন। হাইকমিশনার খুলনা চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকাকালে এই ঘটনাটি ঘটে এবং ইহাতে তাহাকে বহনকারী গাড়ীর চালকসহ দুই ব্যক্তি আহত হয়। এমতাবস্থায় আমরা সঙ্গত কারণেই জানিতে চাই যে, এমন একটি ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহের চোখ ফাঁকি দিয়া ঘটিতে পারিল কিরূপে? কোন রাষ্ট্রদূতকে কোথাও যাইতে হইলে সংশ্লিষ্ট দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাহা আগেভাগে অবহিত করা ঐ দূতাবাস কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। সেই মোতাবেক পংকজ শরণের খুলনা, বাগেরহাট বা অন্যত্র গমন বিষয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই ওয়াকিবহাল ছিলেন নিশ্চয়ই। উপরন্তু, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট অঞ্চল নানাবিধ কারণেই বেশ কিছুকাল ধরিয়া স্পর্শকাতর হিসাবেই বিবেচিত হইয়া আসিতেছে। বিশেষ করিয়া পরদিন খুলনায় বিরোধী দলের হরতাল কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও পংকজ শরণের সফর এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁহার অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্তও নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা রাখা যে জরুরি ছিল ইহা নিশ্চয়ই অস্বীকার করা যাইবে না। একজন রাষ্ট্রদূত এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের অন্যান্য কর্মকর্তার এই জাতীয় সফরকে নির্বিঘ্ন রাখিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহের যে সার্বক্ষণিক নজরদারী ও সবিশেষ ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল উহার ক্ষেত্রে সীমাহীন ঔদাসীন্যই প্রকাশ পাইয়াছে এই ঘটনায়। ইহাতে বাস্তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ এবং স্থানীয় প্রশাসনের গাছাড়া ভাবই যেন মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে। খুলনা চেম্বার অব কমার্স রাজনৈতিক পরিস্থিতির তাপ- উত্তাপের বিষয়টি আদৌ মাথায় রাখিয়াছিল কিনা আমাদের জানা নাই। তবে এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অতিথির সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাগ্রগণ্য রূপে তাহারা স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা আদৌ চাহিয়াছিলো কিনা উহাও জানা দরকার। কেননা, এমন ক্ষেত্রে কোন প্রকার গড়িমসি কিংবা হাল্কাভাব কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। ভারতের রাষ্ট্রদূত খুলনায় যাইতেছেন ইহা জানিবার পর তাহার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানে বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি ও পুলিশ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যে ধরনের উদ্যোগ আয়োজন ও তত্পরতা প্রয়োজন এক্ষেত্রে যে উহার যথেষ্ট গাফিলতি হইয়াছে তাহাতো বলাই বাহুল্য। নচেত এই ঘটনাটি ঘটিতে পারিল কিরূপে? দুষ্কৃতকারীরা যদি সত্যি সত্যিই হাইকমিশনারকে লক্ষ্য করিয়া বোমা ছুঁড়িতো বা তেমন কোন অঘটন ঘটিয়া যাইতো তাহা হইলে স্থানীয় প্রশাসন মায় সরকারই বা ইহার কি জবাব দিতেন? বিষয়টিকে তাই হাল্কাভাবে দেখারতো কোন সুযোগই নাই। মনে রাখা দরকার যে, ভারত আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিবেশী। এ ধরনের কোন অযাচিত, অনভিপ্রেত বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে কি মারাত্মক বা ভয়াবহ টানাপোড়েন সৃষ্টি করিতে পারে উহা কি আমরা ভাবিয়া দেখিয়াছি? যদি দেখিতাম তাহা হইলে নিশ্চয়ই পংকজ শরণের নিরাপত্তা বিষয়ে এমন ঔদাসীন্য প্রদর্শনের ঘটনা ঘটিত না। এই ককটেল নিক্ষেপের ঘটনাটিকে ভারত নিশ্চয়ই সাধারণ ঘটনা হিসাবে দেখিবে না, বরং এইজন্য তাহারা কৈফিয়ত্ তলব কিংবা কড়া প্রতিবাদও জানাইতে পারে। আর উহাইতো স্বাভাবিক। দেশ ও জাতিকে বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে নিক্ষিপ্ত করিতে এহেন একটি হামলার ঘটনাই যে যথেষ্ট হইতে পারে এই উপলব্ধি বোধ আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মধ্যে না থাকিলে সকলের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ থাকিয়া যাইবে বৈ কি! আরেকটি বিষয়ও বলা দরকার, আর উহা এই যে, সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতি জানা সত্ত্বেও হাইকমিশনারকে চেম্বারের একটি গাড়ীতে বহন করাটাও যে নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক হইয়াছে আশা করি চেম্বার নেতৃবৃন্দ উহা মানিবেন। সব বিষয়কেই হাল্কাভাবে নেওয়াটা আমাদের একপ্রকার স্বভাব হইয়া দাঁড়াইয়াছে যেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মহলের কোন প্রকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি বা খামখেয়ালীর ছিদ্রপথ দিয়া বিরাট সংকট জাতির সামনে উপস্থিত হইতে পারে এই সারসত্যকে যেন আমরা কোন প্রকারেই ভুলিয়া না যাই। পংকজ শরণের গাড়ীর অদূরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া গভীর উদ্বেগ প্রকাশ না করিয়া পারা যায় না। ভূ-রাজনীতি এবং অন্য সকল বিচারেই ভারত আমাদের জন্য অতীব গুরুত্ববহ। আশা করি যথাযথ কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সহিত আমলে লইয়া তাহাদের কর্তব্যকর্ম নিষ্ঠার সহিত পালন করিবেন। ইহার অন্যথা হইলে উহার জের বহন করিতে হইবে এই দেশের মানুষকে।