[ রা জ নী তি ]
হরতালে আক্রান্ত দেশ
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ২২:২৬
ক্ষমতাশালী রাজনীতি বরাবর সিংহাসনমুখী। এখন সিংহাসন প্রত্যাশীদের রাজনীতির থাবায় বিপন্ন দেশবাসী ও প্রিয় দেশ। বুর্জোয়া রাজনীতির চেহারাটাই এমন। এ ধারার রাজনীতি কখনো জনগণের রাজনীতি হয়ে উঠতে পারে না। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়াটাই হচ্ছে এমন রাজনীতির লক্ষ্য। ক্ষমতার রাজনীতির কুশীলবরা সুযোগ পেলে অর্থ, প্রযুক্তি আর পেশীশক্তি প্রয়োগে হলেও মসনদে পৌঁছাতে চায়। তবে বর্তমানে নির্বাচন পদ্ধতি, গণসচেতনতা, আন্তর্জাতিক নজরদারি এবং মিডিয়ার সচেতন দৃষ্টির কারণে নির্বাচন অনেকটাই গণতান্ত্রিক ধারায় হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে নির্বাচন ছাড়া আর কোথাও গণতন্ত্র নেই। ক্ষমতা প্রেমিক রাজনীতিকদের কাছে কোনো মূল্য নেই জনকল্যাণ বা জনগণের সুখ-দুঃখের। এ কারণে যে দল বা জোট-মহাজোট নির্বাচনে জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে তাদের পরাজয় মানতে কষ্ট হয়। সিংহাসনবিহীন দশায় নিজেদের অসহায় ভাবতে থাকে। তাই শুরু থেকেই গণতান্ত্রিক আচরণ নির্বাসন দেয়। দেশ-বিদেশের কোটি মানুষ, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা এবং মিডিয়া নির্বাচন নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও ‘বিজয়ী দল ষড়যন্ত্র করে নির্বাচন গড়াপেটা করেছে’ অভিযোগ এনে হারু পার্টি বিরোধী দলীয় অগণতান্ত্রিক বিরোধিতা শুরু করে। পাঁচ বছর সিংহাসনবিহীন থাকা অসহ্য। জনমত তৈরির গণতান্ত্রিক রাজনীতির শক্তিতে মাঠে নেমে নিজেদের পরবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করে না। একটি নির্বাচিত সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য নানা অপকৌশল নিয়ে মাঠে নামে। বিরোধী দল অল্প আসনের কমজোরে সংসদে সিদ্ধান্ত গ্রহণে খুব একটা সাফল্য পাবে না আশঙ্কায় নানা উছিলা তৈরি করে প্রায় স্থায়ীভাবে সংসদ বর্জন করতে থাকে। এসব অপকর্মে শেষ পর্যন্ত সরকার পতন বা মধ্যবর্তী নির্বাচন ইত্যাদি আদায় সম্ভব হয় না। তাই নির্বাচনী বছরে সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণের জন্য ভয়ঙ্কর অপতত্পরতা শুরু করে বিরোধী দল। অপরদিকে অভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ থাকায় ক্ষমতা অনন্তকাল স্থায়ী করার জন্য ‘সরকারি শক্তি’ সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে সরকারি দলও বিশেষ ভূমিকা রাখে। এদেশের ক্ষমতাভোগী আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয়ের ক্ষেত্রে উপরের বক্তব্যগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য।
এবার বিরোধী দলের আচরণ যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়ঙ্কর, অমানবিক ও গণবিরোধী। সরকার পক্ষও অনেক বেশি মরিয়া এবং আচরণে একটু বেশি অগণতান্ত্রিক। বিএনপির রাজনৈতিক (?) কর্মসূচি সঙ্গদোষের কারণে অমানবিক, হিংসুটে এবং গণবিরোধী। জামায়াত-শিবির সান্নিধ্যে এখন বেশ উগ্র। সরকারকে দুর্বল করা আর ক্ষমতায় পৌঁছার পথ প্রশস্ত করার জন্য জনগণকে জিম্মি করে ফেলেছে বিরোধী দল। দেশ ও জাতি জাহান্নামে যাক তা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই বিএনপি-জামায়াতের। ডাকাতের অস্ত্রের মুখে যেমন অসহায় ও কম্পমান গৃহস্থ তেমন অবস্থায় এখন অসহায় দেশবাসী। বিএনপি-জামায়াতের বন্দুক তাক করা জনগণের দিকে। জনগণের টুঁটি চেপে ধরে সরকারকে দুর্বল করার পথ বেছে নিয়েছে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে ভাববার কোনো অবকাশ নেই বিরোধী দলের। মানুষকে চরম অসহায় আর বিপন্ন দশায় ফেলে সহিংস হরতালের মহোত্সব বসিয়েছে বিএনপি, জামায়াত, শিবির এই বন্ধুত্রয়। ত্রয়ী শক্তিতে নিশ্চিন্ত হতে না পেরে ধর্মীয় আবেগ উস্কে দিয়ে সরল ধার্মিক মানুষকে ভুল বুঝিয়ে ইসলাম হেফাজতকারী নামাবরণে নতুন বন্ধুদের মাঠে নামিয়েছে। এদের যৌথ সাঁড়াশি আক্রমণে এখন সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। হরতালকারী এসব ‘জননেতা’ ‘জননেত্রী’রা নিজেদের ক্ষমতায় পৌঁছার পথ মসৃণ করতে দেশের অর্থনীতির কলজে খামছে ধরছে। প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ার দশায়। হরতালের কারণে উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। সময়মত শিপমেন্ট না করতে পেরে ক্রেতাদের আস্থা হরাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এদেশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে পথে বসার উপক্রম। সেদিন বেইলি রোডে বুটিক ও ফ্যাশন হাউসগুলোর মালিক-কর্মচারীরা মানববন্ধন করলো। পয়লা বৈশাখকে ঘিরে তারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে তাদের পণ্য তৈরি করেছিলেন। বিক্রির প্রধান সময়গুলোতে বিরোধী দলীয় নীতি-নির্ধারকগণ দানবের মত হরতাল দিয়ে ব্যবসা অনিশ্চিত করে দিয়েছে। এই বুটিক হাউসগুলোর সাথে নানা ধাপের পেশাজীবীরা জড়িত। সকলকে পথে বসানোর আয়োজন করেছে মুড়ি-মুড়কির মত হরতাল ডাকা রাজনীতি। দিনমজুর আর সকল দরিদ্র শ্রমজীবীদের পেটে পাথর বাঁধার জোগাড়। আর হরতালের আগেরদিন থেকে গাড়ি পোড়ানো, ভাঙচুর, ইটের আঘাতে ট্রাক ড্রাইভারকে হত্যা, অসহায় মানুষকে আহত করা তো এখন পিকেটাররা নিজেদের অধিকার হিসেবে গণ্য করছে। পত্রিকার খবরে জানা যায়, এ ধরনের অনাচারের গুরুত্ব অনুযায়ী পিকেটাররা নাকি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পারিতোষিক পেয়ে থাকে। দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা এসএসসি হয়ে গেল হরতালের সাথে লুকোচুরি করতে করতে। কোমলমতি লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর স্বাভাবিক পরীক্ষা দেয়ার অধিকারকে খর্ব করে। আমাদের সন্তানদের প্রতি একই নিবর্তন করা হচ্ছে চলমান এইচএসসি পরীক্ষায়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালে রোগী নেয়া যাচ্ছে না। এখন এ্যাম্বুলেন্সও আক্রান্ত হচ্ছে। বিয়েসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলা হচ্ছে। রাজনীতি এতটা গণবিরোধী বোধকরি আর কোনো দেশে হয় না। হরতাল-অবরোধের রাজনীতি এভাবে সংশ্লি¬ষ্ট রাজনীতিকদের উন্মাদ হায়নায় পরিণত করেছে। আমাদের রাজনীতি গণতন্ত্র বিচ্ছিন্ন বলেই কোটি কোটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভোটের কোনো তোয়াক্কা করে না রাজনৈতিক দলগুলো। ক্ষমতায় পৌঁছার জন্য বিরোধী দল এখন নির্দ্বিধায় সকল অনাচার চালিয়ে যাচ্ছে। জটিলতা তৈরি করে একটি মোক্ষে পৌঁছার সরল পথ খুঁজছে।
এতটাই বেপরোয়া যে, নিজেদের উদ্দেশ্যকে এখন আর রাখঢাক করছেন না বিরোধী দলীয় নেতা-নেত্রীরা। এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ উপস্থাপন করা যেতে পারে। গত ৪ এপ্রিল সাতক্ষীরার জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে সত্য উন্মোচন করলেন বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এক পর্যায়ে সরকারের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমরা বলেছি ক্ষমতা ছাড়েন, হরতাল-টরতাল কিছু হবে না (কালেরকণ্ঠ ৫-৪-২০১৩)’। একই ভাষণে বিএনপি নেত্রী সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘হরতাল দিয়েছি আরো হরতাল দেব। হরতাল দেখতে না চাইলে পদত্যাগ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন (যুগান্তর ৫-৪-২০১৩)’।
অর্থাত্ তারা হরতাল দেন এক পক্ষকে সিংহাসন থেকে নামতে বাধ্য করতে। আর নিজেদের সিংহাসনে যাওয়ার পথ মসৃণ করতে। এরা নিজ লোভী উদ্দেশ্য সফল করতে অবলীলায় জনগণের কাঁধে পা রেখে তাদের পিষ্ট করে এগিয়ে যান কোনো ধরনের লাজলজ্জা ছাড়াই।
আমরা মনে করি না এদেশের মানুষ সর্বংসহা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরে দাঁড়ানোর ঐতিহ্য রয়েছে বাঙালির। মানুষ তার জীবন ও সম্পদ রক্ষার্থে এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ক্রমে সাধারণ মানুষের তীব্র ঘৃণা আছড়ে পড়ছে এসব লোভী অমানবিক রাজনীতিকদের ওপর। আমরা বিশ্বাস করি এভাবে চাপিয়ে দেয়া হরতাল বন্ধ না করলে রাজনীতিকরা গণরোষের মুখোমুখি হবেন। এই মুহূর্তে সরকার পক্ষের নিবর্তন নেমে এসেছে বিএনপির ওপর। বিএনপির ঘর খালি করে প্রায় সব নেতাই কারাগারে অবরুদ্ধ। অন্য সময় হলে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতো। এখন একান্ত দলীয় লোক ছাড়া কারো কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। যেন বলতে চাইছে আমাদের কষ্ট দিচ্ছ এখন তোমরাও এর উচিত সাজা পাও। ১১ এপ্রিল শিবিরের ডাকা হরতালের বিকালে সাভার বাজারে গিয়েছি। শুনলাম দুপুর থেকেই দোকানপাট খুলে গেছে। এক মুদি দোকানে টেলিভিশন চলছিল। অনেকেই দাঁড়িয়ে খবর দেখছিলেন। এক পর্যায়ে দেখানো হলো হরতাল সমর্থনকারীদের মিছিল। পুলিশের দিকে ইটপাটকেল আর ককটেল নিক্ষেপের দৃশ্য। পুলিশ ধাওয়া দিয়ে দুজন পিকেটারকে ধরে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তোলে। আমি লক্ষ্য করলাম দর্শকরা অনেকেই উত্ফুল্ল। মাঝবয়সী মুদি দোকানি অনুচ্চ চীত্কার করে বলে উঠলেন, ‘পিটা শালাগো, হাত-পা ভাইঙ্গা দে’। অধিকাংশ দর্শকের চেহারায় ও শব্দ প্রয়োগে দোকানির প্রতি সমর্থন দেখতে পেলাম। অথচ কয়েক বছর আগেও এমন অবস্থার রিএ্যাকশন পুলিশের বিপক্ষে যেতো।
জীবন সংহারী ও অর্থনৈতিক কাঠামো বিধ্বংসী এই অযৌক্তিক হরতালের বিরুদ্ধে এখন সাধারণ মানুষকে পথে নামতেই হবে। কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি এভাবে সাধারণ মানুষ হতে পারে না। কোনো দলকে এই স্বাধীনতা কেউ দেয়নি যে, ইচ্ছে হলো আর হরতাল ডেকে দিল। বিএনপি নেতাদের পুলিশ আটক করলো কেন বা আদালত জামিন দিল না কেন তা নিয়ে শতবার বিএনপি আইনি লড়াই করুক। সরকার আগ্রাসী হয়েছে, তাই বলে সাধারণ মানুষের কি অন্যায় যে, দেশব্যাপী হরতালের ছোবল হানতে হবে। শিবিরের সভাপতি গ্রেফতার হলো কেন, তাকে মুক্তি দেয়া হলো না কেন—এর দায়ও সাধারণ মানুষকে বহন করতে হলো হরতালের চাবুক পিঠে নিয়ে। অরাজনৈতিক বলে প্রচারিত আলেম-ওলামাদের হেফাজতে ইসলাম ঢাকায় হিজরত করে ৫মে পর্যন্ত দাবি মানার জন্য সরকারকে আল্টিমেটাম দিল। এর মাঝখানে তো আর কথা চলে না। তারপরও যাবার বেলায় সঙ্গদোষে একদিনের হরতাল ডেকে গেল। এভাবে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেয়ার অধর্মের কাজ ধর্মনেতারা করতেও দ্বিধা করেন না।
হরতাল ডাকিয়ে পক্ষের চিরাচরিত দাবি ‘জনগণ হরতালের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানিয়েছে’। তা হলে সত্সাহস নিয়ে হরতাল ডেকে ভয় না ছড়িয়ে ঘরে বসে থাকুন। আগেরদিন থেকে জ্বালাও-পোড়াও করবেন না। হরতালের দিন কোনো পিকেটিং হবে না। সরকার পক্ষও নির্লিপ্ত থাকবে। পথে পুলিশ-র্যাবের মহড়া হবে না। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে দেখুন মানুষ কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করে।
মানুষ কি এতটা মূর্খ যে, রাজনীতিকদের প্রতারণা বুঝে না। এ কারণেই এখন মুক্তমনের মানুষ বিশ্বাস করে এ ধরনের অমানবিক, মানবতা বিরোধী, স্বেচ্ছাচারী হরতালের বিরুদ্ধে গণমানুষের তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। এই লক্ষণ এখন চারদিকে স্পষ্ট হচ্ছে। গণপ্রতিরোধে হরতাল সংস্কৃতির অবশ্যই অবসান হবে। বিপন্ন মানুষ সেই যুদ্ধের জন্য এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
shahnawazju@yahoo.com