রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পূর্ণ মেয়াদের জন্য হবে না
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০১৩, ২০:৩৪
সদ্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মৃত্যুজনিত পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ৫ বছর হবে, নাকি প্রয়াত রাষ্ট্রপতির অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন এ নিয়ে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে।
আমাদের বিদ্যমান সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদের মেয়াদ যেহেতু ৫ বছর, সুতরাং সংসদ সদস্যদেরও মেয়াদ ৫ বছর এবং প্রধানমন্ত্রী-স্পিকারের মেয়াদও ৫ বছর। দেশের জনগণ জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের সময় ৫ বছরের জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। ফলে সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যের শূন্যপদে যতবারই নির্বাচন হোক আর ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর শূন্যপদে যতবারই নির্বাচিত হোক তা আর ৫ বছরের জন্য হবে না। রাষ্ট্রপতির মেয়াদও ৫ বছর। আলোচ্য ২০তম রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত। বিদ্যমান নবম জাতীয় সংসদ একবার জিল্লুর রহমানকে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত করেছে, সুতরাং এই নবম সংসদে পূর্ণ মেয়াদে আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতেই পারবে না—এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। মৃত্যুজনিত কারণে যতবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করুক ততবারই হবে অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য, পূর্ণ মেয়াদের জন্য নয়। ২০তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত। সংবিধানে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়-১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে :
(১) রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে উক্ত পদ শূন্য হইলে মেয়াদ সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী নব্বই হইতে ষাটদিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে : তবে শর্ত থাকে যে, যে সংসদের দ্বারা তিনি নির্বাচিত হইয়াছেন সেই সংসদের মেয়াদকালে রাষ্ট্রপতির কার্যকাল শেষ হইলে সংসদের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত অনুরূপ শূন্য পদ পূর্ণ করিবার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে না, এবং অনুরূপ সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের দিন হইতে ত্রিশদিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির শূন্যপদ পূর্ণ করিবার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। অর্থাত্ নবম জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যগণ রাষ্ট্রপতিকে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত করেছেন। সুতরাং এই নবম সংসদে অনুরূপ শূন্যপদ পূরণে অর্থাত্ ৫ বছরের জন্য আর নির্বাচন অনুষ্ঠান হতেই পারবে না। রাষ্ট্রপতির অনুরূপ শূন্যপদে অর্থাত্ পূর্ণ মেয়াদের নির্বাচন পরবর্তী সংসদের সাধারণ নির্বাচন ছাড়া আর সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হলেও যেখানে পূর্ণ মেয়াদে নির্বাচন না করার জন্য সংবিধানে নির্দেশনা রয়েছে সেখানে মৃত্যুজনিত কারণে পূর্ণ মেয়াদে নির্বাচন হবে কিভাবে? প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদ সদস্যদের শূন্যপদ মানে হচ্ছে অবশিষ্ট মেয়াদ। হঠাত্ করে রাষ্ট্রপতির বেলায় শূন্যপদ পূর্ণ মেয়াদ হবে কেন? এটা একেবারেই অযৌক্তিক, সাংবিধানিক চেতনার বিপরীত ও গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থি। রাষ্ট্রপতি ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় প্রশ্নে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে চূড়ান্ত নির্দেশনা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রশ্নে সংবিধানের ১২৩ (২)-এ বলা আছে:মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইলে পদটি শূন্য হইবার পর নব্বইদিনের মধ্যে, তাহা পূর্ণ করিবার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। আর সংসদ সদস্যের প্রশ্নে ১২৩(৪)-এ বলা হয়েছে:সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদের কোন সদস্যপদ শূন্য হইলে পদটি শূন্য হইবার নব্বইদিনের মধ্যে উক্ত শূন্যপদ পূর্ণ করিবার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ সদস্য নির্বাচন সংবিধান একই ধরনের আইন ১২৩ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করেছে। ১২৩(৪) সংসদ সদস্যের শূন্যপদ যেভাবে পূর্ণ হবে ১২৩(২) রাষ্ট্রপতির শূন্যপদ সেভাবেই পূর্ণ হবে। ১২৩(৪) মোতাবেক সংসদ সদস্যের শূন্যপদ পূরণ হবে অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য, সুতরাং ১২৩(২) রাষ্ট্রপতির শূন্যপদও পূরণ হবে অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য। প্রয়াত সংসদ সদস্য আবদুল জলিলের শূন্যপদে নির্বাচন হবে অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য, তেমনি রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের শূন্যপদেও নির্বাচন হবে অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য। একই অনুচ্ছেদে একই নির্দেশনা থাকার পরেও রাষ্ট্রপতির বেলায় ভিন্ন ব্যাখ্যা হবে সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন।
সংবিধানে রাষ্ট্রপতির শূন্যপদের দুইটি ব্যাখ্যা রয়েছে: (১) Expiration of the Term মেয়াদ অবসানজনিত (২) Occurrence of the vacancy দুর্ঘটনাজনিত। মেয়াদ অবসানজনিত শূন্যপদ আর দুর্ঘটনাজনিত শূন্যপদের মর্ম যদি এক হতো তাহলে সংবিধানে দুইটি ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতো না। অন্যদিকে শূন্যপদ হলেই পূর্ণ মেয়াদ পেলে দলীয় সরকার তার শেষ সময়ে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগে বাধ্য বা অপসারণ করে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে যাতে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত না করতে পারে তার জন্যই সংবিধান এ সুরক্ষা দিয়েছে। এটা সংসদীয় চেতনাকে বিকশিত করার উপযোগী। আর সংবিধানের ৫০(১) এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বত্সরের মেয়াদে তাঁহার পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন : তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার উত্তরাধিকারী-কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন।
রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ বিবেচিত হবে সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে। অর্থাত্ রাষ্ট্রপতি অনুরূপ পদে নির্বাচিত হয়েছেন না মৃত্যুজনিত কারণে শূন্যপদে নির্বাচিত হয়েছেন সে বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির মেয়াদ কার্যকর হবে। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ৫ বছর মানে কী রাষ্ট্রপতিকে সংবিধানে ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অভিশংসন বা ৫৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অপসারণ করা যাবে না বা শপথ নিয়েছেন বলে পদত্যাগ করতে পারবেন না? Term of office of President দেখতে হবে Subject to the provisions of this constitution-এর ভিত্তিতে। অর্থাত্ সংবিধানের দ্বারা আরোপিত বাধা- নিষেধ সাপেক্ষে। আক্ষরিক অর্থে মেয়াদ বিবেচনার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ৫ বছরের শর্তসাপেক্ষ—শর্তহীন নয়।
আমাদের বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সংসদ নির্বাচনে ভোটার হচ্ছে ‘জনগণ’ আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হচ্ছে ‘সংসদ সদস্যগণ’। যেহেতু সংবিধানের ৭(১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। সেই জনগণই যখন সংসদের সাধারণ নির্বাচন ছাড়া আর কোন সময়ই সংসদ সদস্যদের ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত করতে পারে না, তেমনি ‘সংসদ সংসদ্যগণ’ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার নির্বাচনে ৫ বছরের জন্য একবারই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এর মধ্য দিয়ে সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদের সুযোগের সমতা এবং সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ এর আইনের দৃষ্টিতে সমতা নিশ্চিত হবে। সুতরাং সংবিধানের ১২৩(১) মোতাবেক বিদ্যমান নবম সংসদের এই পর্যায়ে পূর্ণ মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক বাধা রয়েছে। সুতরাং ২০তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে পূর্ণ মেয়াদের জন্য নয়, অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য।
লেখক: গীতিকার
ই-মেইল: faraizee@yahoo.com