ধ্বংসস্তূপের মাঝে স্বর্গ রচনায় অগ্রসরমান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইটালিতে খাদ্যাভাব চরমভাবে দেখা দিয়েছিল। বৈশ্বিক মন্দার কবলে পড়ে পুনরায় ইটালিতে চলছে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দুঃশাসনের পালা। বৈশ্বিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশ সরকারসহ পৃথিবীর অনেকগুলো রাষ্ট্র ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ধ্বংসরূপ পরিগ্রহ হচ্ছে অর্থনীতিতে, শিক্ষায়, চিকিত্সায়, পোশাক শিল্পে, রাবার উত্পাদন, চামড়া শিল্পে, গ্যাস, বিদ্যুত্, শ্রমশক্তি রফতানি, অন্যান্য রফতানি এবং আমদানিতে। ২০১৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে সরকার রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থাতেও ফিরতে পারে। বৈশ্বিক মন্দায় আরো চরম আকার ধারণ করতে পারে বিদ্যমান অর্থনীতি ও রাজনীতি। অপরদিকে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। উভয় অংশে একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তাক করে রেখেছে। জাপান মারণাস্ত্র নিবারণের জন্য সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন করেছে। দুই কোরীয় সমুদ্র সীমানায় যুদ্ধ জাহাজ ও ভারি সমরাস্ত্র মোতায়েন করেছে আমেরিকা। চীন, রাশিয়া, কিউবা কমিউনিস্ট বলয়ের বন্ধু উত্তর কোরিয়ার পক্ষ নিতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ইসরাইলকে আক্রমণ করার হুমকি দিচ্ছে। প্রয়োজনে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে উভয়পক্ষ। ইসরাইল প্যালেস্টাইনের পশ্চিম তীর ও গাজা এলাকা নিশ্চিহ্ন করে দিতে প্রস্তুত। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ন্যাটোর বিমান এবং ড্রোন হামলা হচ্ছে। যেকোন মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেধে যেতে পারে। সিরিয়া, লিবিয়া, মিসর, ইরাক গণতন্ত্রের নামে গৃহযুদ্ধ করে দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মিসরে ক্ষমতা পালাবদলের নামে তাহরির স্কোয়ারে মৃত্যুকূপে পুড়েছে হাজার মানুষ। চীন কমিউনিস্ট বিরোধী আন্দোলনে তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে গুলি করে মেরেছে হাজার হাজার গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতা। চলতি ২০১৩ সালে গত চার মাসে হয়ে গেল প্রায় ৪০টি হরতাল। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী প্রায়শই থাকে বিচ্ছিন্ন। পুলিশ, র্যাবের ওপর হামলা। ডিবি, এসবি পরিচয়ে পথচারি উঠিয়ে নিয়ে গুম অথবা টাকাকড়ি কেড়ে নিয়ে দূরে কোথাও ছেড়ে দেয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কমে আসছে। তাদের কর্তব্য-কর্মে দলীয় কর্মীদের আচরণ ফুটে উঠছে। ব্যাংকগুলো মন্ত্রী ও এমপিদের নির্দেশ পালন করতে হিমশিম খাচ্ছে। নামে-বেনামে টাকা-ডলার চলে যাচ্ছে সীমান্তের বাইরে। দেশের শিল্প ও বিদ্যুত্ উত্পাদনে গ্যাসের স্বল্পতা। সরকার সার্কুলার দিয়ে সকল সার কারখানায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ ব্যবস্থাপনায় হরিলুট। তেল, বিদ্যুত্ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে কয়েক দফা। জাতীয় উত্পাদন প্রবৃদ্ধি ৭.২% লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে ব্যর্থ। এটা ৫% পর্যন্ত হলে তা হবে কৃষক ও কৃষি উত্পাদনের অবদান। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন দিতে ব্যাংক ঋণ ব্যবহার করা হচ্ছে। উত্পাদনশীল প্রকল্পে সিডিউল ব্যাংকগুলো কোন ধরনের প্রকল্প ঋণ অথবা Long Term Loan দিতে পারছে না। পর্যটন শিল্প বিকাশে কক্সবাজার হোটেল মোটেল জোনে পাঁচ তারকাবিশিষ্ট আবাসিক হোটেল নির্মাণে ব্যাংক ঋণ দিতে পারছে না কোন ব্যাংক। বিদেশে শ্রমিক রফতানিতে মন্ত্রণালয় ও বায়রার মধ্যে দড়ি টানাটানি। এক পর্যায়ে বায়রার সভাপতি ও মহাসচিবসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে রমনা থানায়। যা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। শেয়ারবাজারকে মূলধনী বাজার না বানিয়ে ফটকাবাজার বানিয়ে দিয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ফিরে যাচ্ছে। বিদেশি ক্রেতাগণ আমদানি বন্ধ করতে যাচ্ছেন। এরূপ একটি কঠিন ধ্বংসস্তূপে বসে সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখছে। ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে অবশ্যই ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা দরকার। সেজন্য তারা তাদের আন্দোলনের ফসল তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে একদফা আন্দোলন শুরু করেছে বিরোধীদল। শোনা যাচ্ছে ১৯৯৬ সালের মত অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিবে বিরোধী দলসমূহ। ১৮ দলীয় জোটের প্রধান প্রধান নেতাদের কারাগারে নিক্ষেপ, জামিন বাতিল, টর্চার ও ডাণ্ডাবেড়ি পরানো ইত্যাদি দেখে মনে হয় দেশে আইনের শাসন বিলুপ্ত হতে চলেছে। সুশাসন এখন দুঃশাসনে পরিণত হয়েছে। শাসক শাসন করছে স্বেচ্ছাচারী ভূমিকায়। সরকারি দল এতটাই আতংকে আছে যে জামায়াত-শিবির সন্দেহে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পেটাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে জামায়াত, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি যুগপত্ভাবে পবিত্র রোজার মাসেও হরতাল করে সে সময়কার বিএনপি সরকারকে বাধ্য করেছিল রাতের মধ্যে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করাতে। সংসদে বেশি আসন পাওয়াতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশি ত্রুটি হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থেকে সরকারকে মনে রাখতে হবে ক্ষমা প্রার্থনা করলেই অযোগ্যতার ত্রুটি সংশোধন হয় না, তাতে কেবল ত্রুটি স্বীকার করা হয় মাত্র।  লেখক : সাবেক ট্রেজারার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।