[ আ ন্ত র্জা তি ক ]
কোরীয় উপদ্বীপে সংকট
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৩, ২২:১০
কয়েক সপ্তাহ ধরে কোরীয় উপদ্বীপে এবং উপদ্বীপকে ঘিরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়া ১০ দিনব্যাপী যৌথ সামরিক মহড়া শেষ করেছে। এই মহড়ায় অংশ নেয়া মোট সাড়ে ১৩ হাজার সৈন্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে তিন হাজার সৈন্য অংশগ্রহণ করে। বি-টুয়েন্টি ও বি-থার্টি টু যুদ্ধ বিমান এবং যথারীতি মার্কিন বিমান বাহিনীর প্রায় শীর্ষ কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সুসম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি অতিবাহিত করা ছিল এই মহড়ার অন্যতম উদ্দেশ্য।
চলতি বছরের এই যৌথ মহড়ায় প্রথমবারের মত দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ নেতৃত্ব দেন। কোরিয়ার সামরিক অভিযানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধকালীন অভিযানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়াদি এই মহড়ায় গুরুত্ব পায়। আলোচ্য যৌথ মহড়াটি নানাদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং এর থেকে প্রভূত উপকারও পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, উত্তর কোরিয়া তার স্থল ও নৌ সীমান্তকে ‘নো ফ্লাই জোন’ ও ‘নো সেইল জোন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। উত্তর কোরিয়ার প্ররোচনামূলক বাগাড়ম্বর ও অস্ত্র প্রদর্শন বন্ধু দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল একটি হুমকি। সেক্ষেত্রে এই যৌথ মহড়া একটি তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা।
১৯৫০-৫৩ সালে সংঘটিত কোরীয় যুদ্ধের অবসানে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক অনাক্রমণ চুক্তিও উত্তর কোরিয়া একতরফাভাবে নাকচ করে দিয়েছে। উত্তর দক্ষিণ কোরিয়ার মাসব্যাপী সামরিক মহড়ার যেমন কড়া সমালোচনা করেছে, তেমনি একথাও ঘোষণা করেছে যে, তাদের সেনারা একটি চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। নির্দেশ পাওয়া মাত্র দক্ষিণের সব আয়োজন গুঁড়িয়ে দেবে তারা। উল্লেখ্য, দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ফোয়াল ঈগল’ শীর্ষক এই মহড়া চলতি মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত চলবে।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, তারা যে কোন পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং কাউন্টার আক্রমণেও প্রস্তুত। যদি তারা আক্রান্ত হয় তাহলে প্ররোচনাকারী উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ১০ গুণ শক্তিশালী হামলা করতে পিছপা হবে না।
একথা অনস্বীকার্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার রণকৌশলের পাল্টা জবাবে একটি যৌথ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেছে। পর্যবেক্ষক মহল এমনও ধারণা করছে যে, আত্মরক্ষার দোহাই দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিআক্রমণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
ওয়াশিংটন অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়ার অতিমাত্রার আক্রমণাত্মক আচরণকে সহজভাবে মেনে নিতে অনাগ্রহী। ওয়াশিংটনের আশংকা, এতে দুই কোরিয়ার মধ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ বা বিপর্যয়ের আশংকা বিদ্যমান, যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে জড়িয়ে ফেলতে পারে। সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরী দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেন এবং শিউলে বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়াকে ধৈর্যের সঙ্গে সমস্যাটি মোকাবিলা করতে উপদেশ দেন।
ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন উত্তর কোরিয়াকে চরম শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর এবং এক্ষেত্রে অগ্রগতিও যথেষ্ট। পিয়ং ইয়ং তথা উত্তর কোরিয়ার শাস্তি এ কারণে যে, তারা গত ১২ ফেব্রুয়ারি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। ইতিমধ্যে তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ২০৯৪ নম্বর রেজুলেশনটি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করিয়েছে। ৭ মার্চের ঐ রেজুলেশনে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবরোধ আরোপের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, অনুরূপ কঠোর অবরোধ ইরানের বিরুদ্ধে গত ২ বছর ধরে বিদ্যমান। যুদ্ধপ্রিয় মারমুখো ও বাগাড়ম্বরে দক্ষ উত্তর কোরিয়া ঐ অবরোধের ব্যাপারে দম্ভ প্রকাশ করে বলেছে, প্রয়োজনে তারা মিসাইল ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করতে প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধের হুমকি সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়ার বিরোধে প্রবৃত্ত নেতাদের ওপর এর মাধ্যমে সামান্যই প্রভাব রাখা যাবে। ফলে ভয়ের আশংকা থাকবেই। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, অবরোধ প্রকৃতপক্ষে উত্তরকে দমাতে সমর্থ কিনা এবং তারা পারমাণবিক পরীক্ষা ও রকেট উেক্ষপণের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসবে কিনা।
কোরিয়া হেরাল্ডের ১১ মার্চের সংখ্যায় রয়টার্সের একটি বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। এখানে যথার্থই বলা হয়েছে যে, জাতিসংঘের সার্বিক অবরোধ নির্ভর করে মূলত চীনের ভূমিকার ওপর। প্রফেসর জর্জ লোপেজ এই বিষয়ে বলেছেন, অবরোধ কার্যকর হলে উত্তর কোরিয়া নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উত্তরের মুদ্রাপ্রবাহ শিথিল হয়ে পড়বে। একই সাথে ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র সাজে প্রয়োজনীয় বিশেষ উপাদানসমূহ সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হবে। পারমাণবিক কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে ২০১০ সালের জুনে ঠিক অনুরূপ রেজুলেশন নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের ওপর আরোপ করেছিল। সর্বশেষ রেজুলেশন অনুযায়ী পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোন দেশের পক্ষে উত্তর কোরিয়াকে সহযোগিতা রহিত করার কথা বলা হয়েছে। এতদসত্ত্বেও বলতে হয়, ইরানের মত উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি অত শক্তিশালী নয়। উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে বলা হয় ‘ক্লোজড ইকোনমি’। ফলে উত্তর কোরিয়ার ক্ষতির আশংকা অনেক কম। এখানে একথাও উল্লেখের দাবি রাখে যে, চীন যদিও উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের উদ্যোগে হতাশাগ্রস্ত, তবুও সে পিয়ং ইয়ংয়ের ধসে পড়া কামনা করবে না। চীন মনে করে ক্ষয়িষ্ণু হলেও উত্তর কোরিয়া তার প্রতিবেশী। উত্তর কোরিয়ার অবসান মানে অর্থনৈতিক শরণার্থী হিসেবে চীনে তাদেরকে আশ্রয় দেয়া। আরও বড় সংকট হল, সিউলের নেতৃত্বে একটি পুঁজিবাদী কোরিয়ার আত্মপ্রকাশ—যারা আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ মিত্র। চীনে এখন নতুন নেতৃত্ব চলছে। তাদের কাছে কোরিয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনুমোদন পাবে কিনা সংগত কারণেই সে প্রশ্নের উদ্রেক করবে। পাশাপাশি একথাও বিশ্বাসযোগ্য যে, চীন যে করেই হোক এক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার লাগাম বা রাশ টেনে ধরবে। পরিস্থিতি পিয়ং ইয়ংয়ের জন্য পতনোন্মুখ হোক চীন তা চাইবে না। চীন একই সাথে অন্যান্য দেশকেও সতর্ক করে দিতে চায় যে, যাতে কেউ উত্তর কোরিয়ায় অনধিকার প্রবেশের মাধ্যমে লাভ তুলে নিতে না আসে। ফলশ্রুতিতে সিআইএ’র সাবেক বিশ্লেষক ব্রুস ক্লিনগনারের মতে জাতিসংঘের সর্বশেষ রেজুলেশনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে সংযত রাখতে বিনাশ্রমে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হল যা মার্কিন রাষ্ট্রদূত সুসান রাইয়ের প্রত্যাশারও অতীত। চীন এ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের অবরোধ সমর্থন করছে। কিন্তু কতদিন।
ইতোমধ্যে চীন ও রাশিয়া ছয় দেশীয় সাহায্য প্রদানে দুই কোরিয়ার সাথে অবিলম্বে আলোচনার সূত্রপাত করার আহবান জানিয়েছে। চীন, রাশিয়া ছাড়াও জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এর অন্তর্ভুক্ত। স্পর্শকাতর ও উত্তেজনাপূর্ণ এই সময়ে এহেন প্রস্তাবে দক্ষিণ কোরিয়া খুশি নয়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ওবামার মাধ্যমে এই আহবানে সাড়া দিয়েছে। ওবামা উত্তর কোরিয়াকে একের পর এক বিরোধ সৃষ্টির পরিবর্তে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির আহবান জানিয়েছেন। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, অবশ্যই উত্তেজনার পরিবর্তে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে এবং উত্তর কোরিয়ার কঠোরতা হ্রাস পেয়ে তারা অবশ্যই আরেকবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসবে।
কিন্তু যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হল, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে উত্তর কোরিয়া যদি নতি স্বীকার না করে তাহলে কী হবে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় নিশ্চিত আর তা হল দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান তাদের প্রতিরক্ষা নীতিমালা আরো আগ্রাসী করে তুলবে। এতে পূর্ব এশিয়ার বিদ্যমান প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি আরো জটিলতর হয়ে উঠবে।
বিষয়টি চীনা নতুন নেতৃত্ব বিশেষ করে চীনা প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের জন্যও একটা পরীক্ষাবিশেষ। চীনা সরকারি পত্রিকা পিপলস ডেইলিতে প্রকাশিত নিবন্ধের গূঢ়ার্থ হল—চীনের মনোভাব ভবিষ্যতে আরো কঠোরতর হতে পারে। ঐ পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী চীনা প্রেসিডেন্ট কোরিয়া উপদ্বীপের সংকট নিরসনে উচ্চ পর্যায়ের একটি টিম গঠন করেছেন। এই টিমে অন্যান্যের মধ্যে আছেন বৈদেশিক নীতি সংক্রান্ত শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়াং জিয়েচি এবং তার উত্তরসূরি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ুই। ওয়াশিংটন পোস্টের ডেভিড ইগনাটিয়াসের মতে, ওরা দু’জনই পিয়ংইয়ংয়ের সাথে অন্তরঙ্গভাবে আলোচনায় সমর্থ। বিষয়টিকে একটি ইতিবাচক হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নেভী ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের জলসীমার গুরুত্বও তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে শাস্তি এড়ানো যে অসম্ভব তা পিয়ংইয়ংয়ের বুঝতে অসুবিধা হবে না।
তবে একথা অনস্বীকার্য দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন নেতৃত্ব—প্রেসিডেন্ট পার্কের উপরই অনেককিছু নির্ভর করে। প্রেসিডেন্ট পার্ক ঠাণ্ডা মাথায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার যা করণীয় তা হল—শুধুমাত্র উত্তর কোরিয়ার সাথেই কূটনৈতিক আলোচনার প্রসার ঘটানো নয় বরং সংকট উত্তরণে চীনের সাথেও আলোচনা সাপেক্ষে একটা উত্তম পন্থা উদ্ভাবন করা।
এ প্রেক্ষিতে উল্লেখ করতে হয় যে, দক্ষিণ কোরিয়া সম্প্রতি সামরিক উত্তেজনা সত্ত্বেও উত্তরকে মানবিক সাহায্যের প্রথম শিপমেন্টটি অনুমোদন করেছে। স্মর্তব্য, ডিসেম্বরে পিয়ংইয়ং রকেট উেক্ষপণ করেছে এবং চলতি বছরের শুরুতে পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। ইউজেন বেল দক্ষিণ কোরিয়ার একজন সমাজসেবী। তিনি উত্তর কোরিয়ায় যক্ষ্মা রোগের ওষুধ দক্ষিণ থেকে পাঠানোর অনুমতি লাভ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রকৃত শক্তি সঞ্চয় সময়ের দাবি। তবে এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ কোরিয়াকে অবশ্যই উত্তরের সাথে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। দক্ষিণের যা প্রয়োজন বিশেষ করে নয়া প্রেসিডেন্ট পার্কের জন্য—তা হলো সাহসের বড়াই বা বাহাদুরি না দেখানো। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নতি অনিবার্য। এই প্রেক্ষিতে দক্ষিণ মেরুতে ডেনমার্কের সঙ্গে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং খনিজ সম্পদের উন্নয়নে কার্যকরভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
ভাষান্তর : কায়কোবাদ মিলন
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক