রাজনীতি পুষ্টিহীনতায় ভুগছে

দেশ একপ্রকার কারাগারে পরিণত হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হয় না। সরকারের দমননীতির কারণে বিরোধী দল দিনের পর দিন হরতাল দিচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকার যদি একটু সহনশীল হতো তাহলে মনে হয় না হরতাল আর আন্দোলন এতো ঘন ঘন হতো। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরীক্ষা দিতে পারছে না পরীক্ষার্থীরা, ক্লাস হচ্ছে না ঠিক মত স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে। সব মিলিয়ে রাজনীতি এখন পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। একজন মানুষ যখন পুষ্টিহীনতায় ভোগে তখন তার বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দেখা দেয়, এক পর্যায় অকাল মৃত্যু হয়। আমাদের রাজনীতির অবস্থা হয়েছে ঠিক সেই রকম, দেশের রাজনীতিকে অকাল মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক অবস্থার উপর দেশ স্থিতিশীল কিংবা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আমরা যে রাজনীতি চর্চা করি এ রাজনীতি দিয়ে বর্তমানে দেশের জন্য ভাল কিছু আশা করা যায় না। অতীতের রাজনীতি বর্তমানের রাজনীতি থেকে তুলনামূলক ভাবে অনেক ভাল ছিল, তাদের মধ্যে নিঃস্বার্থ রাজনীতির চর্চা বর্তমানের চেয়ে বেশি ছিল। গত ২২ মার্চ আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদের একটা লেখা ছিল, সেকাল ও একালের রাজনীতি। উনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আগের রাজনীতি কেমন ছিল, উনি প্রশ্নের জবাবে বলেন সেদিনের রাজনীতি ছিল সত্যিকারের রাজনীতি। আমাদের ছাত্রাবস্থায় তখন যারা রাজনীতি করতেন, তাদের ব্যক্তিগত লোভ-লালসা, চাওয়া-পাওয়া কিছুই ছিল না। রাজনীতির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-আদর্শ ছিল। কত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে আমরা ছাত্রলীগকে প্রতিষ্ঠা করেছি। জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্য ছিল। নিঃস্বার্থ রাজনীতির চর্চা যদি বাংলাদেশে থাকত, তাহলে যে সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল আজ হয়ত সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতো। রাজনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি এতো নেতিবাচক হয়েছে যে, যে দল করে ঐ দল ছাড়া দেশে বাকি সকল দল তাদের কাছে মনে হয় যেন বিষাক্ত কিছু, ওদেরকে সমূলে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে দিতে পারলেই যেন তারা সফল। এই মনোভাব দু’চারজন ছাড়া সবার মধ্যে আছে। বর্তমান দুটো আন্দোলনকে ঘিরে সকল রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট। যারা শাহবাগ আন্দোলনের পক্ষে তারা হেফাজতে ইসলামের বিপক্ষে, আর যারা হেফাজতে ইসলামের পক্ষে তারা শাহবাগ আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, একপক্ষের বক্তব্যকে অন্যপক্ষ বিকৃতভাবে মিডিয়াতে উপস্থাপন করছেন। যেমন হেফাজতে ইসলাম-এর ১৩ দফার মধ্যে একটা দফাতে আছে যে, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ বন্ধ করতে হবে। বিরোধীরা এই ইস্যুকে হাতিয়ার হিসাবে নিয়ে বলছে, নারীদেরকে গৃহবন্দী রাখার জন্য এই দাবি। মূলত তাদের দাবি হচ্ছে কুরআনের আলোকে নারীরা পড়ালেখাসহ সকল কাজকর্ম চালিয়ে যাবে। হেফাজতে ইসলাম পরবর্তীতে বলছে এর অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। দাবি যে একশ’ ভাগ পূরণ হবে না এটা হেফাজত ইসলামও বোঝে, সাধারণ মানুষও বোঝে। একদিক থেকে ওদের দাবি করাটা দোষের কিছু না। তবে একথা মানতে হবে যে কিছু ব্লগারের কারণে দেশের রাজনীতি ঘোলাটের দিকে গেছে এবং শাহবাগের আন্দোলনের শক্তি অনেকটা কমে গেছে। সরকার বিরোধী দলের লোকজনকে যেভাবে গণহারে ধরপাকড় করছে, এটা কোন দিক থেকে যৌক্তিক নয়। এভাবে চলতে থাকলে আগামী নির্বাচনে পাস করা কি সম্ভব ? ধরে নিলাম কোন ভাবে পাস করে ফেললো, তখন হয়ত গণআন্দোলনের মুখে সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হবে। তারপর কি হবে ? বিএনপি এসে এর বদলা নিবে বা আরও বেশি পরিমাণে ধরপাকড় শুরু করবে। তখন দেশের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকবে। এ থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হলে যারা সরকার গঠন করবে, তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে গত সরকার আমাদের সাথে যে আচরণ করেছে আমরা এর জবাবে কোন হিংসাত্মক কোন আচরণ করব না। বর্তমান যে রাজনীতির চর্চা হচ্ছে এ থেকে সোজা একশ’ আশি ডিগ্রি এঙ্গেলে নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। তখন রাজনীতিতে কোমল হাওয়া বইতে শুরু করবে। আমরা যে যাই করি না কেন ’৭১-এর পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের রাজনীতির চর্চা একই ধারায় চলছে। এর ফলে আমরা কি পেলাম? শেখ মুজিব, জিয়াসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে রাজনৈতিক হিংসার কারণে জীবন হারাতে হয়েছে। আজ পর্যন্ত এই রকম নজীর পাওয়া যায়নি এক দল অন্য দলের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ কোন আচরণ করেছে। এরকম নজীর নেই নির্বাচনে পাস করার পর সরকারি দল বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে কাজ করেছে, বিরোধী দল সরকারকে সহযোগিতা করেছে। দল হিসাবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয়ের অনেক ভুল-ত্রুটি আছে। তারা এক তরফা দলের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন এটা কাম্য নয়। এরকম দৃষ্টিভঙ্গি দল ও রাজনীতির জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। যারা রাজনীতি করেন তারা একদিন দু’দিনের জন্য রাজনীতি করেন না। তাই সবার উচিত সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। লেখক :শিক্ষার্থী, ২য় বর্ষ, কম্পিউটার সায়েন্স, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ইমেইল:ershadali52¦yahoo.com