[ নি র্বা চ ন ]
টিআইবির নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা প্রধানমন্ত্রী কেন আমলে নিলেন না
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৯
গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রস্তাবিত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমলে নেননি। অবশ্য সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে টিআইবির আগেও ব্যক্তি পর্যায়ে একাধিক প্রস্তাব পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তবে টিআইবির প্রস্তাবটি ছিল কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে প্রথম এ ধরনের প্রস্তাব। টিআইবির প্রস্তাবটি অন্য যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এটির স্বয়ংসম্পূর্ণতা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ছাড়াও আরো কয়েকটি দল টিআইবি প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখাকে ‘ইতিবাচক” হিসেবে আখ্যায়িত করলেও প্রধানমন্ত্রী কেন সেটিকে আমলে নিলেন না তা পর্যালোচনা করার আগে দেখা যাক টিআইবি প্রস্তাবিত রূপরেখার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো কি।
পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী টিআইবি প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—এক. জাতীয় সংসদের স্পিকার সরকারি ও বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি কমিটি গঠন করবেন। দুই জোট থেকে চারজন করে বা এর বেশি গ্রহণযোগ্য সংসদ সদস্য দ্বারা গঠিত কমিটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবে। সংসদের নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কমপক্ষে ৩০দিন আগে এ কমিটি গঠন করতে হবে। দুই. প্রথমত, সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি নির্বাচনকালীন সরকারের একজন প্রধান নির্বাচন করবে। তারপর তার সঙ্গে আলোচনা করে সরকারের বাকি ১০জন মন্ত্রী নির্বাচন করবে। অথবা প্রথমে সরকারের ১০জন মন্ত্রী নির্বাচন করবে। পরে তারা আলোচনা করে ওই সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নির্বাচন করবে। তবে সরকার প্রধানের ক্ষেত্রে ঐকমত্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হলে স্পিকারের কাছে অনধিক তিনজনের নাম প্রস্তাব করবে। রাষ্ট্রপতি তাদের মধ্য হতে একজনকে সরকার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেবেন। তিন. সংসদের নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওযার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে ওই সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। চার. নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান বা অন্য মন্ত্রীরা নবম সংসদের নির্বাচিত সদস্য হতে পারেন, অনির্বাচিত নিরপেক্ষ ব্যক্তি হতে পারেন অথবা উভয়ের সমন্বয়েও মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে। তবে সবার কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। পাঁচ. এ সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন। এক্ষেত্রে প্রশাসনিক দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ছাড়া বড় কোন প্রকল্প গ্রহণ, কূটনৈতিক চুক্তি সম্পাদন বা জনগুরুত্ব কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। ছয়. এ সরকারের মেয়াদ হবে দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে পরবর্তী ৯০ দিন। তবে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে মেয়াদ আরো সর্বোচ্চ ৯০ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
টিআইবি নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা উপস্থাপনের একদিন পর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনের আগে নতুন নতুন ফর্মুলা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারে। নির্বাচিত সরকারের অধীনেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যে সম্ভব, আওয়ামী লীগ তা দেখিয়ে দিয়েছে। পরবর্তী নির্বাচনও একইভাবে অনুষ্ঠিত হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে নতুন কোন ফর্মুলা দেয়ার প্রয়োজন নেই। নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে যারা ফর্মুলা দিচ্ছেন, তাদেরকে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী টিআইবি প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখার প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত না করলেও এটা বুঝতে মোটেই অসুবিধা হয় না যে, মূলত টিআইবির প্রস্তাবকে কেন্দ্র করেই তিনি তার বক্তব্য রেখেছেন।
এখন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা যাক। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগে নতুন ফর্মুলা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত যা বলতে চেয়েছেন তা হলো, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি নির্বাচিত সরকার মেয়াদ শেষে আরেকটি নির্বাচিত সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। অন্য কারো কাছে নয়। মাঝখানে অন্য কোনো প্রকার সরকার গঠিত হলে তাতে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। আমাদের দেশেও এটি সমভাবে প্রযোজ্য।
টিআইবির রূপরেখায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান বা অন্য মন্ত্রীরা নবম সংসদের নির্বাচিত সদস্য হতে পারেন, অনির্বাচিত নিরপেক্ষ ব্যক্তি হতে পারেন অথবা উভয়ের সমন্বয়েও মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী হয়তো এখানে বলতে চেয়েছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দিয়েছেন এবং শুধু জনগণের দ্বারা নির্বাচত জাতীয় সংসদ সদস্যগণ দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সুতরাং অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের দ্বারা বা তাদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তাছাড়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনকারী ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছে।
টিআইবির ফর্মুলায় বলা হয়েছে, সংসদের নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। সংবিধান অনুযায়ী ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান সংসদের মেয়াদ বহাল থাকবে এবং সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। টিআইবির রূপরেখা মোতাবেক আগামী ২৪ জানুয়ারির পর ঐকমত্য কমিটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ মোতাবেক জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্ভব হবে না।
সরকার ও বিরোধী দলের চলমান রাজনৈতিক সংঘাতের মূল কারণ হলো নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এ সংঘাত। বিরোধী দল বিএনপি চায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বহাল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এতে রাজি নয়। সংকট সমাধানে গত ৩০ জুলাই লন্ডনে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালে বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভায় বিএনপিও অংশগ্রহণ করতে পারবে। নির্বাচনের সময় সরকার গঠনে বিরোধী দল যদি অংশীদারিত্ব চায় সেটা দিতে পারি। সবাই মিলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারি। একটা ছোট মন্ত্রিসভা করে ইলেকশন করতে পারি।’ এজন্য সংসদে এসে বিএনপিকে প্রস্তাব দেয়ার জন্য আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী। যদিও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে মাঝে মাঝে বক্তব্য দেন, এটি তাদের রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে হয়। বিরোধী দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে আওয়ামী লীগ তাদের আগের প্রস্তাব থেকে সরে যায়নি বলে মনে হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাম্প্রতিক বক্তব্য হতে এটা প্রতীয়মান হয়।
বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার উচিত হবে বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের যে প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন তাতে রাজি হওয়া। তাকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরোধী দলের প্রতিনিধি সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের তিনিই প্রথম প্রবক্তা। ১৯৯৪ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন, যদিও তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের অসহযোগিতার কারণে সে উদ্যোগটি সফল হয়নি।
অনেকে মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে বিএনপি শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে আসবে। গত ২৪ মার্চ বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপির ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও কিছুটা ছাড় দিয়ে বিরোধী দলীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন যৌথ সরকার গঠনের পথে হাঁটবে। সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন সত্ত্বেও বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন মেনে নেবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতেই বিএনপি এ সিদ্ধান্ত নেবে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিটি ব্যাংক এনএ। তবে এজন্য এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই। সৃষ্টি করতে হবে অনুকূল পরিবেশ। বিএনপির আটককৃত প্রথম সারির সব নেতা এবং যতদূর সম্ভব অন্যান্য পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে জামিন দিতে হবে এবং বিএনপির গুম হওয়া নেতাদের সন্ধান প্রদান করতে হবে। যেহেতু নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির জন্য সরকার দায়ী, সেহেতু বিরোধী দলীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন যৌথ সরকারের রূপরেখা সরকারকেই উপস্থাপন করতে হবে।
সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, সংঘাত ও ঝঞ্ঝাটপূর্ণ একটি বছরকে পেছনে ফেলে দেশবাসী নতুন বাংলা বছর ১৪২০কে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা চান, নতুন বছর দেশের জন্য বয়ে আনুক শান্তি ও উন্নতি। তারা চান, গণতন্ত্রের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার স্বার্থে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হোক জাতীয় সংসদ। একটি সফল গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।
লেখক :সাবেক সচিব
E-mail:latifm43@gmail.com