মার্গারেট থ্যাচারের সংগ্রাম
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৪০
শান্তির সময়েই কেবল রাজনীতিবিদরা দুনিয়া বদলে দেবার দাবি করতে পারেন। মার্গারেট থ্যাচার তাদেরই একজন। তিনি নিজের দল কনজারভেটিভ পার্টির রূপান্তরই শুধু ঘটান নাই, বদলে দিতে পেরেছিলেন গোটা ব্রিটিশ রাজনীতিকে। বেসরকারিকরণের প্রশ্নে তাঁর উদ্যম বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের সূচনা করেছিলো। তাঁর দৃঢ়তা সোভিয়েত ইউনিয়নের নিঃশেষিত হওয়ার পথে সহায়ক হয়েছিলো। উইনস্টন চার্চিল যুদ্ধজয় করেছিলেন, কিন্তু তিনি কোনো মতবাদের জন্ম দিতে পারেননি।
থ্যাচারিজমের সারকথা হলো স্থিতাবস্থার বিপরীতে স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো। প্রকারান্তরে তিনি রক্ষণশীলতাকে মূর্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর চিন্তা ছিল এরকম যে, ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতার মধ্য দিয়েই জাতি মহান হয়ে উঠতে পারে। তাঁর সংগ্রামের মূল কথা, যতদূর সম্ভব রাষ্ট্রের সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপনার কবল থেকে মুক্ত হয়ে ব্যক্তির জীবন নির্বাহের অধিকার অর্জন করা। তাঁর এই নীতি উইনস্টন চার্চিলের বিখ্যাত ‘বাস্তব লাভ’ তত্ত্বের সদৃশ নয়। রাজনীতিতে তিনি যখন নবীন, তখন উদার অর্থনীতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। সোভিয়েট ইউনিয়ন তার সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছে। ভিন্নমতালম্বী একামেডিশিয়ান হিসাবে মিলটন ফ্রিডম্যান ও ফ্রেডারিক হাইয়েক পরিত্যক্ত। ব্রিটেনে ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে সরকারের লবেজান অবস্থা। কেনেজিয়ান চাহিদা তত্ত্বের আলোকে ব্যর্থ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছিলো। এই উচ্চাভিলাষী তরুণ রাজনীতিক এর মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে থাকেন। তখন এই ধারণা প্রবল হয়ে দেখা দেয় যে, অবক্ষয় কিভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটাই হওয়া উচিত রাজনীতি। এই ধারণায় তাঁর রক্ত টগবগ করে ওঠে।
ফ্রিডম্যান ও হাইয়েকের চিন্তাধারা মার্গারেট থ্যাচারকে অনুপ্রাণিত করে। এইসব বৈপ্লবিক চিন্তার বেশিরভাগই তাঁর ভোটারদের জানা ছিলো না। ১৯৭৯ সালে যে নির্বাচকমন্ডলি থ্যাচারকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন তাদের বেশিরভাগই এইসব বৈপ্লবিক চিন্তা সম্পর্কে তেমন কিছু জানতেন না। শ্রমিকদের অদক্ষতা বড় এক হতাশার কারণ হয়ে দেখা দেয়। অতঃপর আসে অর্থনৈতিক বিপ্লব। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প বেসরকারিকরণ করেন। ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা করতেও অস্বীকার করেন। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ রহিত করেন। কেইনসের মতবাদের বিপরীতে তিনি অনুসরণ করেন ফ্রিডম্যানের মুদ্রাতত্ত্ব। মুদ্রাস্ফীতির হার নেমে আসে। ১৯৭৫ সালে মুদ্রাস্ফীতি ছিল যেখানে ২৭ শতাংশ সেখানে ১৯৮৬ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ২.৪ শতাংশে। ধর্মঘটে কর্মঘন্টা নষ্ট হওয়ার মাত্রাও কমে আসে। ট্যাক্সের সর্বোচ্চ হার ৮৩ শতাংশ থেকে কমে আসে ৪০ শতাংশে।
বামপন্থিদের সঙ্গে, বিশেষ করে খনি শ্রমিকদের সাথে তাঁর লড়াই তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। টরি দলের পুরোনো ধাচের ‘অপরিণত’ দৃষ্টিভঙ্গিকে পশ্চাতে ফেলে তিনি কনজারভেটিভদের শক্ত অবস্থান গ্রহণের প্রশ্নে অবিচল থাকেন। লন্ডন শহরে সে ছিলো এক মহাবিস্ফোরণ। তিনি জর্জ বুশ সিনিয়রকে বলেছিলেন, এটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সময় নয়। রোন্যাল্ড বিগ্যান ছিলেন তাঁর চিন্তার সহযাত্রী। কিন্তু ঘাটতির প্রতিকূলতা এবং স্পষ্ট মোড় বদলের সমস্যা তাঁর ছিল না।
তিনি বামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েননি। আসলে তিনি কিভাবে সমঝোতা করতে হয় তা ভালমতই জানতেন। তিনি বাণিজ্যিক স্বার্থে মিখাইল গর্ভাচেভকে সাগ্রহে গ্রহণ করেন। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি প্রয়োগে পক্ষপাতী মার্কিন বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেন। তিনি ১৯৮১ সালে খনি শ্রমিকদের সাথে বিবাদে না জড়িয়ে ফিরে আসেন সাময়িকভাবে। উদ্দেশ্য ছিল যাতে তিনি পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে পর্যাপ্ত কয়লার মজুদ গড়ে তুলতে পারেন। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সংস্কারের ব্যাপারেও তিনি অনেক কথাবার্তা বলেন।
তিনি অনেক ক্ষেত্রে সৌভাগ্যবানও ছিলেন। যখন খনি শ্রমিকরা আন্দোলন ও ধর্মঘট করছিল, তখন তার নেতৃত্বে ছিলেন আর্থার স্কারগিল, যিনি একজন কট্টর মার্কসবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অথচ সমঝোতার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হয়নি। ব্রিটিশরা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনির্বাচিত নেতাদের পছন্দ করেছিলেন ও মেনে নিয়েছিলেন। তাছাড়া সেনাপতি গ্যালটিয়েরি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে হামলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলেন। উত্তর সাগরে তেলের অস্তিত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর ছিল। সর্বোপরি তিনি তাঁর সময়ের জন্যও সৌভাগ্যবান ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর নতুন শক্তির আবির্ভাবের প্রতি এক ধরনের সাধারণ ঐকমত্য ছিল। সেসময় ব্যক্তিগত কম্পিউটারের অধিকার থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সমতা রক্ষারও দাবি ওঠে। এভাবে কোলাহলপূর্ণ সময়েও পুঁজিবাদী নীতি অবলম্বন তাঁর জন্য যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল।
মার্গারেট থ্যাচারের বিরুদ্ধে দুইভাবে সমালোচনা করতে দেখা যায়। প্রথমত কখনও কখনও ঘৃণাবোধ তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল। বামপন্থি স্থানীয় কাউন্সিলরদের উদ্ভট আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে হোয়াইটহলে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। টনি ব্লেয়ার থ্যাচারবাদ প্রয়োগ করে কয়েকটি নির্বাচনী বৈতরণী পার হন। দ্বিতীয়ত সমালোচনা উঠেছে থ্যাচারবাদের সারবত্তা নিয়ে। বলা হয় তাঁর সংস্কারসমূহ সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক সংকটের বিজ বপন করেছে। থ্যাচারবাদ ছাড়া ব্রিটিশ অর্থনীতি ও ব্রিটেন ব্যক্তিগত ও সরকারি ঋণ নিয়ে এত বিপাকে পড়তো না। ব্যক্তিপর্যায়ে মাত্রাতিরিক্ত ধার-দেনা ও ব্যাংকগুলিকে বেলআউট সুবিধা দিতে গিয়ে ব্রিটেনের অর্থনীতিকে আজ নিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
এসব সমালোচনা অনেকাংশে সত্য। কিন্তু থ্যাচারবাদ ছাড়া ব্রিটেনের অর্থনীতি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণারোপের ঘেরাটোপে পড়ে আরও অসুবিধায় পড়তো। অর্থনৈতিক শিখরগুলির মালিকানা রাষ্ট্রের না হয়ে হয়ে যেত সরকারের এবং দেশে জঙ্গি ইউনিয়নগুলির শক্তি বৃদ্ধি পেতো। প্রকৃতপক্ষে সংকটের কারণ হল, থ্যাচারের নীতিমালা হতে আমরা সরে যাচ্ছি। পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতিতে এখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যাপক বাড়ছে। বেসরকারি খাতকে কোনঠাসা করার চেষ্টা চলছে। ব্যবসায়িগণ গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্যে আছেন। অথচ গত ত্রিশ বছরে এমন পরিস্থিতি কখনও ছিল না। অর্থনৈতিক উদারীকরণ নয়, বরং চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণবাদকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলি আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করছে।
প্রবৃদ্ধির জন্য সারা বিশ্বের এ রকম মরিয়া ভাব একটি ভুল নির্দেশনা। মুক্তবাজার অর্থনীতিকে মনেপ্রাণে গ্রহণ না করা পর্যন্ত ইউরোপ কখনো উন্নতি লাভ করতে পারবে না। আমেরিকা মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের পথ পরিহার না করলে কখনো অর্থনৈতিক দুর্দশা হতে মুক্তি পাবে না। চীন অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথ গ্রহণ না করলে বর্তমানের উন্নতি ধরে রাখতে পারবে না। মার্গারেট থ্যাচারের কেন্দ্রীয়করণের ধারণা গ্রহণ করলেই কেবল কোন দেশ সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে। আসলে পৃথিবীতে এখন থ্যাচারবাদের প্রয়োগ কম নয়, বরং আরও বেশি করে দরকার।
ইকোনমিস্ট অবলম্বনে