ধর্ম
লাঙ্গলবন্দ ও একটি সেবাক্যাম্পের কথা
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৪০
ত্রেতাযুগে জমদগ্নি স্ত্রী রেণুকার জল আনতে বিলম্ব হলে বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা করে এবং যোগবলে তার মানসিক বিকৃতির কথা অবহিত হন। ক্রোধান্বিত হয়ে মুনি রূঢ়স্বরে তার পুত্রদেরকে তাদের মাকে হত্যা করার আদেশ দেন। অগ্নিশর্মা মুনির উক্ত আদেশ প্রথম চার পুত্রের কেউই পালন করতে রাজি হয়নি। পরে বিষ্ণুর দশম অবতারের মধ্যে ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম পিতার আদেশে কুঠার দিয়ে মায়ের দেহ দ্বিখণ্ডিত করেন। কিন্তু পরশুরামের হাতে ঐ কুঠারটি লেগে থাকে। পিতার কাছে এর কারণ জানতে চাইলে পিতা বলেন— ‘তুমি মাতৃহত্যা আর নারীহত্যা এই দ্বিবিধ পাপেই আক্রান্ত হয়েছো। আর জেনে রেখো, পাপ ছোট বা বড় যা-ই হোক না কেন কৃতকর্মীকে তা স্পর্শ করবেই।’ পুত্রকে আশ্বস্ত করে তীর্থ পরিভ্রমণের উপদেশ দিয়ে বলেন—‘যে তীর্থ গমনে বা স্নানে তোমার হাতের কুঠার স্খলিত হবে, জানবে যে, ঐ পুণ্যস্থানই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র।’ পিতৃ আজ্ঞায় পরশুরাম তীর্থ পরিভ্রমণে বের হয়ে বিভিন্ন তীর্থ ভ্রমণ করতে লাগলেন। পরশুরাম ব্রহ্মকুণ্ডে স্নান করার সাথে সাথে তার হাতের কুঠার স্খলিত হয়ে যায় এবং সর্বপাপ থেকে মুক্তি লাভ করেন। তিথিটি ছিল চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথি, বুধবার পুনর্বসু নক্ষত্র। পরশুরাম চিন্তা করলেন—এমন পুণ্যজনক জলকে সকলের সহজলভ্য করার জন্য এর ধারা পৃথিবীতে নিয়ে আসবেন। পিতৃ আজ্ঞায় ব্রহ্মকুণ্ডের জলধারাকে এ পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য পরশুরাম হাত থেকে স্খলিত কুঠার দিয়ে ব্রহ্মকুণ্ডের জলধারাকে হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত আনতে সক্ষম হন। তারপর লাঙ্গল দিয়ে মাটি কর্ষণ করে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলার ‘লাঙ্গলবন্দ’ পর্যন্ত নিয়ে আসেন। সুদূর হিমালয় থেকে একাধিক্রমে হাল চালনায় ক্লান্ত হয়ে পরশুরাম বিশ্রাম করার জন্য যেখানে লাঙ্গল বন্ধ রাখেন সেই স্থানটির নাম হয় ‘লাঙ্গলবন্দ’।
প্রতি বার বছর পর পর চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী বুধবার ও পুনর্বসু নক্ষত্র যোগ হলে তাকে ‘বুধাষ্টমী’ বলে। আর এ সময় ব্রহ্মপুত্রে সর্বতীর্থের সমাগম হয় এবং তীর্থরাজে পরিণত হয়। এই ‘বুধাষ্টমী’ যোগে ব্রহ্মপুত্র স্নানে সর্বপাপ থেকে মুক্তি লাভ হয়। সুদর্শন ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা-১৪২০ বঙ্গাব্দ মতে দেখা যায়, বছর ঘুরে ১৪২০ বঙ্গাব্দের আজকে অনুষ্ঠিত স্নানে সেই পুণ্যতিথি ‘বুধাষ্টমী’ যুক্ত হয়েছে। স্নানের সময় : ৩ বৈশাখ, বুধবার রাত্রি ঘ ২/৯/১৫ সে. গতে ৪ বৈশাখ, বৃহস্পতিবার, রাত্রি ঘ ৩/৪৭/১৬ সে. পর্যন্ত। স্নানের উত্তম সময়: ৪ বৈশাখ, বৃহস্পতিবার, দিবা ঘ ৭/১৭/১৪ গতে ৯/১২/৪১ মধ্যে পুনর্বসুনক্ষত্রযুক্ত বৃষলগ্ন ব্রহ্মপুত্র স্নানে সর্বপাপক্ষয়।
ঢাকা থেকে ২১ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানার মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ। দেশি-বিদেশি লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগমের তীর্থস্থল মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ। এ বিপুল সংখ্যক মানুষের সার্বক্ষণিক সেবা দিতে সেবাক্যাম্প স্থাপন করে প্রায় ৩২টি সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন। সেবা একটি মহত্ কাজ। ৩৫ বছর ধরে এ সেবা কাজে যুক্ত ‘বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি’। স্বেচ্ছাসেবকগণ ভক্তদের মাঝে কি কি সেবা দিয়ে থাকে এবং সেবা কাজ কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে তাদের সাথে আমার নানান আলোচনা হয়েছে।
বহুবিধ সেবায় কি কি রয়েছে সে প্রশ্নের জবাবে সমিতির সহ-সভাপতি ও লাঙ্গলবন্দ স্নান সেবাকার্যক্রম পরিচালনা কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক জীতেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ মহোদয় জানালেন : ১. দূর-দূরান্ত থেকে তীর্থক্ষেত্রে আগত পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে স্নানের ঘাটে শৃঙ্খলা রক্ষা করা। ২. স্নানান্তে মহিলাদের কাপড় পাল্টানোর জন্য আলাদা প্যান্ডেল প্রস্তুতের ব্যবস্থা করা। ৩. স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা করা। ৪. পানীয় বিশুদ্ধ জলের ব্যবস্থা করা। ৫. ভক্তদের প্রাথমিক চিকিত্সাসেবা প্রদান করা। ৬. দুগ্ধপোষ্য শিশুদের মাঝে দুগ্ধ ও পায়েস বিতরণ করা। ৭. আগত ভক্তদের মাঝে শ্রী শ্রী অন্নপূর্ণা দেবীকে নিবেদিত অন্ন/খিঁচুরি প্রসাদ বিতরণ করা। ৮. ছিনতাইকারীদের হাত থেকে মুক্ত থাকার সতর্ককরণ ব্যবস্থা করা। ৯. আগত পুণ্যার্থিগণের রাত্রিযাপনে সাধ্যানুযায়ী বিশ্রামের ব্যবস্থা করা। ১০. পুণ্যার্থী, শিশু, যে কোন মালামাল হারানো গেলে তা উদ্ধারে মাইকে ঘোষণা প্রদানসহ যথাসাধ্য চেষ্টা করা।
‘বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই দেবোত্তর সম্পত্তি শ্রী শ্রী অন্নপূর্ণা ঘাটে ক্যাম্প স্থাপন করে সেবা কার্যক্রম শুরু হয়। তবে সরকারি যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে পুণ্যার্থীদের অবর্ণনীয় অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। স্নানের জন্য পর্যাপ্ত পরিষ্কার জলের ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট সমপ্রসারণ ও শৃঙ্খলা রক্ষা, যাত্রীছাউনির ব্যবস্থা করাসহ সরকারিভাবে পুণ্যার্থীদের সকল প্রকার সেবা দেয়ার অনুরোধ করছি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সেই তীর্থকে জাতীয় তীর্থকেন্দ্রকরণের ঘোষণা দিলেও চোখে পড়ছে না প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তাই ভক্তগণের প্রাণের আকুতি— মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দকে জাতীয় তীর্থকেন্দ্রকরণের কার্যকর ব্যবস্থা অবিলম্বে গ্রহণ করা হোক। ওঁ শান্তি।
লেখক : ধর্মীয় চিন্তাবিদ ও সরকারি চাকরিজীবী
ই-মেইল: dasgourmohan@yahoo.com