বাংলা মাধ্যমে ইংরেজি ভীতি

অনেকটা ইচ্ছা করেই আমরা বলা বা লেখার প্রথম লাইনে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছি। কারণ ঠিক ওই শব্দটার উপযুক্ত বাংলা এই মুহূর্তে হয়তো মাথায় আসছে না, নয়তো কিছুটা স্মার্টনেস আনার চেষ্টা। কিন্তু বাংলা মিডিয়ামে পড়াশোনা মানেই সারাজীবন ইংরেজি মাধ্যম থেকে পিছিয়ে থাকা—এই বদ্ধমূল ধারণাটি তরুণদের মাঝে বেশি লক্ষ করা যায়। সহজেই ইংরেজি শিখতে পারলে এই হীনম্মন্যতা কাটিয়ে উঠা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নিজের মেধা এবং আগ্রহই প্রধান। এ নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন আশীষ সেনগুপ্ত রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, আগে বাংলার বুনিয়াদ গড়ে তারপর ইংরেজির গোড়াপত্তন। শহুরে মা-বাবারা তাদের সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল-কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করানোর জন্য এককথায় বলতে গেলে রাতের ঘুম হারাম করে ফেলেন। কিন্তু সঠিক বাংলা শেখানোটা খুব বেশি প্রয়োজন মনে করেন না। আবার যারা বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করেন তাদের মধ্যেও এক ধরনের হীনম্মন্যতা কাজ করে ইংরেজি না বলতে পারা নিয়ে। ইংরেজরা যখন এই উপমহাদেশে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি নিয়ে এসেছিলেন তখন তাদের চিন্তাটা ছিল ভিন্ন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব বদলে গেছে। এটি বর্তমানে শুধু একটি ভাষাই নয়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম। সুতরাং ইংরেজি আমাদের শিখতে হবে, তবে ঠিক করতে হবে, শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ও বাঙালি আর স্বদেশের অবস্থান কী হবে। যে শিক্ষাব্যবস্থা নিজের দেশ, নিজের ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর কৃষ্টি সম্পর্কে জানতে উত্সাহী করে না, সে শিক্ষাব্যবস্থা প্রকৃত অর্থে কোনো শিক্ষিত মানুষ তৈরি করতে পারে না। আমাদের দেশে শিক্ষার দুটি মাধ্যম আছে। একটি বাংলা মাধ্যম আরেকটি ইংরেজি মাধ্যম। বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী বাংলা মিডিয়ামে পড়াশোনা করে। ইংরেজি মাধ্যমের পড়ালেখার প্রতি একেকজনের একেকরকম দৃষ্টিভঙ্গি। কারও মতে, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থাই উত্তম এবং সারা দেশে এটাই অনুসরণ করা উচিত। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যমের কোনো প্রয়োজনীয়তাই নেই। ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যসূচি বাইরের উন্নত দেশ থেকে আসে। এতে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে যা নাকি সনাতনী বাংলা মাধ্যমের পাঠ্যসূচিতে নেই। আবার ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যসূচিতে বাংলা আছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। ইংরেজি শেখাটা আবশ্যক এবং ব্যবহার করতে জানাটা অতি আবশ্যক। তবে মানের এবং মেধার দিক থেকে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের রাখাই যায়। বাংলা মাধ্যমের উচ্চ শিক্ষিতেরও ইংরেজি ভীতি আছে। ইংরেজি বলার অনভ্যস্ততার কারণে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে আছে। ঠিকভাবে ইংরেজি বলতে পারে না। ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেমেয়েদের চালচলন বেশ অন্য রকম হয়। নিজেদেরকে চলনে,বলনে,চরিত্রে পুরো বদলে ফেলে। ঠিক তেমনই বাংলা মাধ্যমের ছেলেমেয়েরা কিছুটা পিছিয়ে। নিজেদের অনেকটাই আনস্মার্ট মনে করেন, এদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ইংরেজি জেনে কী করবেন? উত্তরে বলবেন, ‘জানা তো অবশ্যই দরকার, কারণ ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা, সবার সাথে এই একটা ভাষায় কথা বলা যায় সব দেশে, সব জায়গায়। উচ্চশিক্ষার জন্যে ইংরেজি আবশ্যকীয়।’ তো? ইংরেজি জানার বদৌলতে আপনি চৌকষ হয়ে গেলেন? এটা ঠিক বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের দৌড়ে আপনি একধাপ এগিয়ে গেলেন। যাবতীয় আন্তর্জাতিক লেখকের লেখা পড়ে বোঝার সুযোগ আপনি পেয়ে গেলেন যেটা ইংরেজি না-জানার কারণে অনেকে পারছে না। কিন্তু স্মার্টনেসের সংজ্ঞায় কিন্তু এই ভাষার কোনো ভূমিকা নেই। আপনি জ্ঞানলাভের জন্য এবং সকলের সাথে যোগাযোগের জন্য সুবিধা পেলেন ঠিকই, কিন্তু যে এই ভাষা জানে না, তার নিজেকে ‘আনস্মার্ট’ ভাবার কোনো কারণ নেই। একইভাবে ইংরেজি জেনে আপনি দিনের পর দিন একই চাকরি করে গেলেন সে যত বড় বহুজাতিক কোম্পানিই হোক যেখানে ৯টা থেকে ৫টার কাজে আপনি নিজের মাথা খাটিয়ে কিছু বের করলেন না যা থেকে কোম্পানি আরও এক ধাপ আগে বাড়তে পারে। আপনি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না, আপনি লোকজনকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন না। দিনের পর দিন আপনি ইংরেজিতে ইমেইল চালাচালি করছেন কিংবা পাওয়ার-পয়েন্টে কিছু অন্যের জোগাড় করে দেওয়া তথ্য সাজিয়ে ইংরেজি ভাষায় উপস্থাপনা করছেন। ভাবুন তো একবার, বাংলায় যদি আপনার সারাদিনের কাজগুলো করা যেত, তাহলে আপনাকে এই কাজের জন্য কত শত ‘স্মার্ট’ লোকের সাথে পাল্লা দিতে হতো? কয়টা ইংরেজি-জানা ‘বাংলাদেশি’ শুদ্ধ বাংলায় একই প্রেজেন্টেশন দিতে পারে যেটা তারা প্রতিদিন ইংরেজিতে দিচ্ছে? আসলে, স্মার্ট হওয়ার জন্য এই ভাষা জানার ‘আবশ্যকতা’ আছে সেটা বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং আমেরিকান সেন্টার ইংরেজি শেখানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ইংরেজি ভাষার সঠিক প্রয়োগ, শুদ্ধ উচ্চারণ ও সঠিক পদ্ধতিতে শেখানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো। ভিন্ন ভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে তারা চালু করেছে নানা রকম কোর্স। ব্রিটিশ কাউন্সিলের কোর্সগুলোর মধ্যে রয়েছে আইএলটিএস প্রিপারেশন কোর্স, সাধারণ ইংলিশ কোর্স, ফাউন্ডেশন কোর্স এবং বিজনেস ইংলিশ কোর্স। ইংরেজি শিখতে হলে যে শুধু কোর্স করে শিখতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আজকাল অনেক মাধ্যমই বের হয়েছে যার প্রতি একটু মনোযোগ দিলেই ইংরেজি শেখা সম্ভব। ইংরেজি সিনেমা দেখার প্রতি এখন অনেকেই মনোযোগী। যদি ডায়লগগুলো ভালোভাবে শোনা হয় তাহলে ইংরেজিতে কথা বলার বিষয়টি আয়ত্ত করা কঠিন কোনো কাজই না। ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের জন্য বিবিসি জানালাও এখন কাজ করে যাচ্ছে। মোবাইলে, অনলাইনে কিংবা অডিও সিডি শুনে শুনে রয়েছে ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ। ইংরেজি শেখার জন্য ইচ্ছেটাই যথেষ্ট। হাতের কাছে একটি কাগজ পেলে সেটিতে চোখ বুলিয়েও নতুন নতুন ওয়ার্ড শিখে নেওয়া যায়। বন্ধুদের মধ্যে যারা ভালো ইংরেজি জানে তাদের সঙ্গ পেলে তো কোনো কথাই নেই। মনে রাখতে হবে ইংরেজি ভালোভাবে শিখতে হলে সব সময় ইংরেজি বলতে হবে। সেটি ভুল ইংরেজি হোক আর শুদ্ধই হোক। তবে অপরিচিত কারও সামনে ইংরেজি বলার সময় সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ অযথাই একটা ভুল ইংরেজি বলতে গেলে হাসির পাত্র হতে হবে। শেষে ইংরেজি বলার স্পৃহাটাই কমে যেতে পারে। কিছু কিছু বইয়ে ভুল ইংরেজি লেখা থাকে। তাই যে বইটির উপর ভরসা করা হবে সেটি পুরোপুরি শুদ্ধ কিনা তা যাচাই করে নিতে হবে। নইলে শেখায় ভুলটাই থেকে যাবে। বন্ধুদের আড্ডায় পাঁচ মিশালী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তাই প্রতিদিনের পুরো আড্ডাটা যদি ইংরেজিতে দেওয়া যায় তাহলে মোটামুটি চলনসই ইংরেজি শেখা হয়ে যাবে। বাকিটুকু বইপুস্তক অনুসরণ করলেই হবে। সর্বোপরি এইটুকু মনে রাখতে হবে, ইংরেজিকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আগ্রহ নিয়ে ইংরেজি শিখলে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জিত হবেই। আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাইলে এই আগ্রহটুকু থাকতেই হবে। আপনাদের প্রয়োজনে কয়েকটি ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেওয়া হলো : http://www.focusenglish.com http://www.englishcommunications.com http://www.audioenglish.net http://www.teachingenglish.org.uk http://www.yourenglishonline.com মডেল জিহাদ ও ইরন