[ রা জ নী তি ]
চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশ্নবিদ্ধ নিরপেক্ষ নির্বাচন
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৩, ২০:৪৮
বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাস মার্চ শুরু হতে না হতেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নানামুখী রাজনৈতিক সংঘাত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ অবস্থাকে ইরাক ও আফগানিস্তানের ব্যর্থ রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অনেকে আবার বাংলাদেশে প্রলম্বিত গৃহযুদ্ধের আশংকা করছেন। আবার অনেকে সামপ্রদায়িক দাংগা-জাত বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার নিরন্তর সংঘাতের পূর্বাভাস দিচ্ছেন। এমন ভয়াবহ রাজনৈতিক দুর্যোগ হতে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হিসেবে বিশ্লেষকগণ নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করার অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে বা প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনা থেকে বিভিন্নভাবে নির্বাচনী রূপরেখা প্রণয়ন করে আসছেন। দুর্ভাগ্যবশত, প্রধানত সরকারের দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপের অপর্যাপ্ততা ও বিরোধী দলের ফলপ্রসূ ও উপযুক্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দুষ্প্রাপ্যতা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বাধাগ্রস্ত করছে।
এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে টি আই বি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার যৌক্তিক মডেল উপস্থাপন করে। কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী মহল থেকে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এমনকি টি আই বি’র সহজ- সরল প্রস্তাবকেও রাজনৈতিক জটিলতার উদ্রেককারী বা নিয়ামক হিসেবে অভিহিত করা হয়।
এ মুহূর্তে সম্ভবত সরকার বা বিরোধী দলের কাছে স্পষ্ট, গ্রহণযোগ্য, যৌক্তিক কোন নির্বাচনী রূপরেখা নেই। এ বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে প্রয়োজন হলো নিরক্ষেপ নির্বাচনের নতুন নতুন প্রস্তাবনা তুলে ধরা, যাতে এক পর্যায়ে হয়তো রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ঐ প্রস্তাবনার মধ্যে তাদের ঈপ্সিত লক্ষ্যার্জনের সুযোগ পাবেন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে পা রাখা তাদের জন্য সহজ হবে।
নিত্যদিনের রাজনৈতিক বক্তৃতা-বিবৃত্তি হতে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের মধ্যে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে গভীরতর এক ঐক্যবন্ধন গড়ে উঠার চেষ্টা হচ্ছে, যা প্রচ্ছন্ন, যা অপ্রকাশিত। এখন কেবল এক যুগান্তকারী মডেল সকলকে নির্বাচনের ময়দানে নিয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ নির্বাচন প্রশ্নে উভয় দলই নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ব্যাপারে একমত। তবে আওয়ামী লীগ চাচ্ছে দলীয় সরকারের অধীনে ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন’। অন্যদিকে বিএনপি চাচ্ছে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন।’ সৌভাগ্যের আশা জাগানিয়া যে, সুরলহরী উভয় দলের বক্তৃতা বিউগলে ঝংকৃত হচ্ছে এবং অযুত কণ্ঠে তা শ্রুত হচ্ছে, তা হলো তারা উভয়েই এবং এ জাতির সকলেই চাচ্ছে নিরপেক্ষ নির্বাচন।
ক্ষমতাসীন সরকার মেয়াদ শেষে পুনরায় ক্ষমতারোহণের কৌশল অবলম্বনে কেয়ারটেকার সরকারের গঠন প্রক্রিয়ায় যে হীন রাজনীতিকীকরণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতির ইতিহাসে সংযোজিত করে আসছে, তার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করতে দ্বিধান্বিত হচ্ছে ও শংকাবোধ করছে। এ কথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে, আমাদের কেয়ারটেকার ব্যবস্থার স্বল্পকালীন ইতিহাসের বিশ্লেষণ করলে কেয়ারটেকার সরকার গঠনে এ রাজনীতিকীকরণের দুর্নাম ক্ষমতাসীন সকল সরকারের স্কন্ধেই বর্তায়। বস্তুত কেয়ারটেকার ব্যবস্থা তিরোহিত না করে এ ব্যবস্থায় রাজনীতিকীকরণের অনুশীলন চিরতরে বন্ধ করার প্রত্যয় ও নীতি গ্রহণ করলেই তা বাংলাদেশের জন্য কল্যাণকর হতে পারতো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তা আর আজ সম্ভব নয়।
মূলত বাংলাদেশের মতো একটি আধা-ঘুমন্ত, আধা-চেতন বা আত্ম-অচেতন দেশে নিরপেক্ষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দুষপ্রাপ্যতাও কম নয়। সে কারণে “নিরপেক্ষ” নয় বরং “পক্ষীয়” ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে অচিরেই একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন কমিটি-অনিক’ (Interim Electoral Committee) গঠন করা যেতে পারে। ঐ কমিটিতে প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রত্যেকের ৩ জন করে ৬ জন প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবেন। এ ৬ জনের সাথে যুক্ত হবেন আরো ৪ জন অরাজনৈতিক সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, যারা সমান সংখ্যায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্তৃক প্রদত্ত হবেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট দেশ ও জাতির অভিভাবক ও এই অনিকের মুরুব্বি সদস্য হিসেবে মোট ১১ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচনী কমিটি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা গঠন করবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় ২ জন আওয়ামী লীগ, ২ জন বিএনপি, ২ জন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং ৪ জন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি থাকবেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদ্বয় এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধি চতুষ্টয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্তৃক সমান সংখ্যায় প্রদত্ত হবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দশজন মন্ত্রী গ্রহণযোগ্য, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একজন গ্রহণযোগ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে মনোনীত করবেন।
আসন্ন সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে সময় অত্যন্ত কম। সেজন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অর্থবহ রাজনৈতিক সংলাপের। আর তার সফলতার প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হলো সরকার ও বিরোধী দলের মনোকাঠামোগত প্রস্তুতি। মনোজাগতিক জড়তা, দ্বিধা ও সংশয় নিয়ে কোন সংলাপ কার্যকর হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অনুঘটকসমূহের (Catalysts) অবাধ পদচারণা ও সূক্ষ্ম-স্থূল হস্তক্ষেপ এক-এগারোর মতো ভয়ংকর অধ্যায় রচনা করতে পারে, এ আশংকা যেন উভয় দলের হূদয়ের গহীন কন্দরে প্রোথিত থাকে। তৃতীয়ত, বহু প্রতীক্ষিত নিরপেক্ষ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিরন্তন আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাসের কুসংস্কার হতে বেরিয়ে আসার উচ্চতর মূল্যবোধ লালনের সৃজনশীল ও যুগোপযোগী কৌশল অবলম্বন করতে হবে। পারস্পরিক চরিত্র হননের বদাভ্যাস বর্জন করে দেশের কল্যাণে সাহস, যোগ্যতা ও সৌন্দর্য অর্জন করতে হবে।
প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রণয়ন করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংলাপ অনুষ্ঠান এখন সময়ের দাবি। আমাদের রাজনৈতিক সংলাপের অপরিহার্যতা অনুধাবনে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা নেমে আসবে, যা থেকে উত্তরণ খুব সহজ হবে বলে অনুমিত হয় না। আমাদের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াচক্রের আগ্রাসী ছোবলের করাল গ্রাস হতে রক্ষা পেতে আজই দরকার রাজনৈতিক সংলাপের। আর তা সম্পন্ন করার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের। এ দায়িত্ব প্রত্যেকের এবং সকলের। অর্থবহ সংলাপ অনুষ্ঠিত হলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রাজনৈতিক সমঝোতার একটা বিন্দুতে হয়তো পৌঁছাবে। কিন্তু আসন্ন নির্বাচন আদৌ হবে কিনা অথবা নির্বাচন হলেও তা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কিনা—এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ নানা সন্দেহ, সংশয়ের দোদুল্যমানতায় ভুগছেন।
কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে বিএনপি নেতৃবৃন্দের অনড় অবস্থান এবং কেয়ারটেকার ব্যবস্থায় অপ্রত্যাবর্তনে আওয়ামী লীগের অনড় অবস্থানের কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনাকে খুবই ক্ষীণ মনে হচ্ছে।
যতদূর জানা যায়, সুপ্রিম কোর্টের যে রায়ের ভিত্তিতে বর্তমান জাতীয় সংসদে কেয়ারটেকার সংক্রান্ত ব্যবস্থা বিধান রহিত করে সংশোধনী আনা হয়েছে সেই রায়টি পরবর্তী দুটি পার্লামেন্ট নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত করার সুপারিশ ছিলো। এমনকি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ যে ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তারাও অন্তত একটি নির্বাচন কেয়ারটেকার ব্যবস্থায় করা যেতে পারে বলে মতামত দিয়েছিলেন। পত্র-পত্রিকা ও রেডিও টিভির মাধ্যমে প্রধানসারির বুদ্ধিজীবীসহ সুশীল সমাজের সিংহভাগ কেয়ারটেকার বা অরাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা বা অন্যকোন নিরপেক্ষ পন্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকনিদের্শনা দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বন্ধ করার পথেই অগ্রসর হয়। অর্থাত্ কোনভাবেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে বর্তমান সরকার কেয়ারটেকার ব্যবস্থায় যে ফিরে যাবে না তা অনেক বিশ্লেষকগণ ইতিমধ্যেই ব্যাখ্যা করেছেন। অপরদিকে কেয়ারটেকার সরকার পুনর্বহাল করা ছাড়া বিএনপি কোন নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে হাইকমান্ড তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
এ বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বা এসব রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দলের হাইকমান্ডসহ অসংখ্য নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ও রিমান্ড সংক্রান্ত ঘটনাসমূহ। নেতৃবৃন্দের অবর্তমানে বিরোধী দল হয়তো সরকারের সঙ্গে কোন আলোচনায় বসবে না। ফলে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতারও কোন অবসান হবে বলে এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এতসব রাজনৈতিক অস্থিরতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং নীতি-অনিশ্চয়তার কারণে রাজনৈতিক সংলাপের সম্ভাবনা এতোদিনে তিরোহিতপ্রায়। তারপরও যদি বহু প্রতীক্ষিত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় তাহলে সেই সংলাপে অত্র নিবন্ধে প্রস্তাবিত নির্বাচনী রূপরেখা আলোচিত হতে পারে। টিআইবির প্রস্তাবনা, অন্যান্য সুশীল ব্যক্তিদের পরামর্শ এবং আমাদের উত্থাপিত রূপরেখা মূল্যায়ন পূর্বক যদি সরকার ও বিরোধী দল একটি সুষ্ঠু ও কার্যকর নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় তাহলে সেই ক্ষণ হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। পুরো জাতি এমন এক স্বর্ণালী সময়ের প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
mramin68@yahoo.com