স্বস্তির নাম রবিউল

স্বপ্নের লর্ডসে অভিষেক হয়েছিল। কিন্তু অভিষেকটা স্বপ্নময় করে রাখতে পারেননি। এরপরও নিজেকে ধারাবাহিক করে তুলতে পারেননি। নিয়মিত পারফরম্যান্স নেই বলে গতি কম; নানা অভিযোগে কিছুতেই দলে নিয়মিত হতে পারছিলেন না। তার ডাক পড়ত শুধু নিয়মিত পেসারদের কারো ইনজুরি হলে! তাই গত তিন বছরে মাত্র পাঁচটি টেস্ট খেলার সুযোগ হয়েছে তার। তাই অপেক্ষা আর অপেক্ষার পালা চলছিল তার। অবশেষে। অবশেষে গতকাল নিজেকে প্রমাণ করতে পারলেন রবিউল ইসলাম শিপলু। অবশেষে সারা পৃথিবীকে যেন জানিয়ে দিতে পারলেন, তিনি থাকতে এসেছেন। হারারেতে যখন ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছিলেন; তখনই এক ঝলক স্বস্তির বাতাস বইয়ে দিলেন রবিউল। পরপর দুই বলে স্বাগতিকদের দুই ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে দিয়ে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত হ্যাটট্রিক করেননি; তবে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্তই ৩৫ রানে ৬ উইকেট; এখন পর্যন্ত জিম্বাবুয়ের উইকেটের পতনও হয়েছে ৬টিই! রবিউলের এই দুরন্ত পারফরম্যান্স দৃশ্যত হারারে টেস্টে বাংলাদেশকে একটু স্বস্তিতে রেখেছে। কিন্তু বৃহত্তর অর্থে তার এই পারফরম্যান্স আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যই বিরাট এক স্বস্তির খবর। বাংলাদেশের ক্রিকেটের আদিকাল থেকে সবচেয়ে বড় সংকটের নাম পেস বোলিং। মাশরাফি বিন মুর্তজা ছাড়া আর কোনো পেসার নিজেকে আস্থাভাজন করে তুলতে পারেননি। সেই মোহাম্মদ শরীফ, সাজিদুল থেকে শুরু করে শাহাদাত, সফিউল, রুবেল; সবাই শুরুতে চমক দেখিয়েই যেন ফুরাতে বসেছেন। এরপর আবার শুরু হয়েছে ভয়ানক ইনজুরির ছোবল। একের পর এক ইনজুরিতে পড়ে পেসাররা বেশিরভাগ সময়ই থাকছেন মাঠের বাইরে। একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠা পেসার মাশরাফি টানা অস্ত্রোপচারের ধাক্কায় টেস্ট ক্রিকেট ছেড়েই দিয়েছিলেন। ঠিক এই সময়ে একজন তরুণ পেসারের জন্য হা পিত্যেশ করছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট। তখনই আবার একটু স্বপ্ন দেখালেন রবিউল। নিজের প্রথম স্পেলের প্রথম ছয় ওভারে জিম্বাবুয়েকে ১০ রান দিয়ে নিয়েছেন চার উইকেট। হারারের স্পোর্টস ক্লাব মাঠে শুরু থেকেই উজ্জ্বল ছিলেন রবিউল। প্রথম ইনিংসের তিন উইকেটের পর কাল নিয়েছেন আরো ছয় উইকেট। জিম্বাবুয়ে যাওয়ার দুইদিন আগে ইত্তেফাককে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘নিজেকে তৈরি করতে আমার অনেক সময় লেগেছে। শ্রীলংকা থেকে আসার পর প্রতিদিন নেটে বোলিং প্রাকটিস করেছি। হারারের কন্ডিশন শ্রীলংকার চেয়ে একটু আলাদা, তবুও অনুশীলন করে যাচ্ছি। কিছু একটা করার আশা আছে এবার’। রবিউলের সেই ‘কিছু একটা’ করে দেখালেন কাল হারারে মাঠে। লর্ডসের অভিষেক টেস্টের পর জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ে রবিউল মনোযোগী ছিলেন ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে। গত জাতীয় লিগে খুলনা বিভাগের হয়ে চারটি ম্যাচ খেলে নিয়েছিলেন ১৯টি উইকেট। এর আগের জাতীয় লিগে তিন ম্যাচে নিয়েছেন সাত উইকেট। ঈর্ষণীয় সাফল্যই পেয়েছেন তিনি বল হাতে। কিন্তু জাতীয় দলে ঢোকার পরই যেন হারিয়ে যান এই পেসার। শফিউল ইসলাম ও মাশরাফি বিন মুর্তজার ইনজুরি সুযোগ করে দিয়েছে তাকে। জিম্বাবুয়ের ৩৮৯ রানের পর বাংলাদেশ অলআউট হয়ে যায় ১৩৪ রানে। ২৫৫ রানের লিড থাকা সত্ত্বেও জিম্বাবুয়ে দ্বিতীয় ইনিংস ব্যাট করতে নেমে প্রথম বিপদে পড়ে রবিউলের বলে। প্রথম ইনিংসের মত প্রথম ওভারে উইকেট না পেলেও নিজের দ্বিতীয় ওভারে ভূসি সিবান্দাকে বোল্ড করে যাত্রা করেন এই পেসার। নিজের তৃতীয় ওভারে হ্যামিল্টন মাসাকাজ্জাকে রিটার্ন ক্যাচ ধরে ড্রেসিংরুমে ফিরিয়ে দেন। চতুর্থ ওভারে মারুমাকে এলবিডব্লিউ এবং নিজের ষষ্ঠ ওভারে প্রথম স্লিপে ক্যাচ বন্দি করে প্রথম আধা ঘণ্টায় তিনি নিয়ে ফেলেন চার উইকেট। এখানেই শেষ নয় রবিউল কীর্তি। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা অধিনায়ক ব্রেন্ডন টেইলর ও চিগুম্বুরা মিলে যখন ফের বাংলাদেশের বুকে পেরেক ঠুকছিলেন, আবারো রবিউলের আঘাত। নিজের এগারতম ওভারে পরপর দুই বলে চিগুম্বুরা ও মুটুমবামিকে ফিরিয়ে দিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেন।