বিষয়টি তলাইয়া দেখা প্রয়োজন

আবারও পত্রিকার পাতার শিরোনাম হইয়াছে ছাত্রলীগ। ছাত্রী উত্ত্যক্ত করা, টেন্ডার বিষয়ে একজন বিশিষ্ট ভাস্কর-শিল্পী ও সরকারি কর্মকর্তাকে লাঞ্ছনা এমনি ধারার দুষ্কর্ম ছাত্রলীগের সভ্যদের কেহ কেহ অব্যাহত রাখিয়াছে। এই সরকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ক্ষমতাসীন হইবার পর হইতেই ছাত্রলীগ যেন ইহার গলার কাঁটা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বিগত চার বত্সরে ছাত্রলীগের কর্মীরা এতসব দুর্বৃত্তায়ন ও দুষ্কর্ম ঘটাইয়াছে যে, উহা বলিয়া শেষ করা যাইবে না। এই সরকার ক্ষমতাসীন হইবার অব্যবহিত পর হইতে ছাত্রলীগ যেন হাতে চাঁদ পাইয়াছে। তাহারা দল, সরকার, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, রাষ্ট্রযন্ত্র কাহাকেও কোন তোয়াক্কা করে না। হলে সিট দখল, ক্যান্টিনে হুজ্জতি করা, টেন্ডারবাজি, হত্যাকাণ্ড ঘটানো, ভর্তি বাণিজ্য মায় এমন কোন অপকর্ম নাই যাহার সহিত কিনা ছাত্রলীগ কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা নাই। বর্তমানে সরকারকে সন্দেহাতীতভাবে সবচাইতে বেকায়দায় ফেলিয়া দিয়াছে এই ছাত্র সংগঠনটি। ইহার নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম্যে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিপর্যস্ত। সরকারের ভাবমূর্তিতে এই সংগঠনটি এমন কালিমা লেপন করিয়া দিয়াছে যে, উহা পুনরুদ্ধার করা দুষ্করই বটে। কিন্তু প্রশ্নটি হইল কেন এমনটি হইতে পারিল! সরকার যেখানে ইহাদের দুর্বৃত্তপনায় অসন্তুষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত বটে, সেখানে কি করিয়া ইহারা অবলীলাক্রমে দিনের পর দিন এইসব দুষ্কর্ম চালাইয়া যাইতেছে ইহাই এক বড় প্রশ্ন বটে। বাংলাদেশে ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এই দেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে এই সংগঠনটির গৌরবজনক ভূমিকার কথা কাহারও অজানা নাই। দেশ ও জাতি সেই পাকিস্তান আমলের গোঁড়ার দিক হইতে যতবারই বিপদাপন্ন হইয়াছে কিংবা দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছে তখন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জাতিকে পথের দিশা বাতলাইয়া দিতে অকুতোভয়ে আগাইয়া গিয়াছে। স্বাধিকার হইতে স্বায়ত্তশাসন এবং স্বায়ত্তশাসন হইতে স্বাধীনতায় উত্তরণের পথে পথে যত রকম প্রতিবন্ধকতা বিছানো ছিল ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা উহার সবকয়টিকেই গণমানুষের কাফেলা রচনা করিয়া একের পর এক উপড়াইয়া ফেলিয়াছে। এই সংগ্রামশীলতা, আত্মত্যাগ এবং জাতিকে বাঁচানোর সংকল্পবোধ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠানটিকে মহত্ ও মহান করিয়া তুলিয়াছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এই সংগঠনের নেতা-কর্মীরাই শিক্ষা আন্দোলন, বাংলা ভাষা প্রচলন সপ্তাহ পালন, ছয় দফা আন্দোলন এবং সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনকে সফলতার দুয়ারে পৌঁছাইয়া দিতে এমন বীরত্বগাথা রচনা করিয়াছে এবং এমন সাহসিকতার স্বাক্ষর রাখিয়াছে যাহা বিশ্ব-ইতিহাসে বিরল। অথচ সেই গৌরববাহী প্রতিষ্ঠানটি গুটিকয় ছাত্র নামধারী সদস্যের উচ্ছৃংখলতা ও বেপরোয়া কাণ্ডকীর্তির জন্য আজ নিন্দিত ও ধিকৃত হইতেছে—ইহা ভাবিতেও বিস্ময় জাগে। আমরা মনে করি কোন অপশক্তির প্ররোচনায় ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠানটির অতীত গৌরব ও মহিমাকে নস্যাত্ করিবার চক্রান্তস্বরূপ এইসব কাণ্ড সুপরিকল্পিতভাবে করা হইতেছে কিনা উহা এক্ষুণি খতাইয়া দেখা দরকার। মনে-প্রাণে কেহ ছাত্রলীগের সদস্য হইয়া থাকিলে এই জাতীয় সামান্যতম অপকর্মের সহিত তাহার সম্পৃক্ত থাকিবার কথা নহে। সুতরাং এই দুষ্কৃতকারীরা আদৌ ছাত্রলীগের আদর্শে উজ্জীবত, নাকি কোন কুচক্রীদের দ্বারা সংগঠনে অনুপ্রবেশ করিতে সক্ষম হইয়াছে উহার তত্ত্ব-তালাশ নেওয়া দরকার। এইসব দুষ্কৃতকারীর ব্যাকগ্রাউন্ড কি উহা গোয়েন্দাদের দ্বারা সন্ধান করিয়া দেখা একান্তই আবশ্যক। ছাত্রলীগের সুনাম বিনাশী এই তত্পরতা যাহারা করিতেছে তাহারা যে ছাত্রলীগের হইতেই পারে না সংগঠনটির সুদীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করিয়া এই কথা তারস্বরে বলা চলে। প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমরা অনুরোধ জানাইব বিষয়টি অতিসত্বর তলাইয়া দেখার ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে। ছাত্রলীগের ও সরকারের সুনাম ধ্বংস করিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংগঠন অভ্যন্তরে এইসব ছদ্মবেশী দুষ্কৃতকারী কাহাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বাড়িয়া উঠিতেছে উহা তলাইয়া দেখুন।