প্র জ ন্মে র আ ই ক ন

অগ্রজের পথ ধরে

দারুণ বইয়ের পোকা তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতিতে পড়ার সময়ই অনুধাবন করেছিলেন, অটবির দায়িত্ব একসময় তার উপরেই বর্তাবে। এই ভাবনা, সেই সাথে নিজের প্রচুর আগ্রহ, সব মিলিয়েই তিনি ডুবে থাকতেন বইয়ের জগতে। সময় পেলে চোখ বুলিয়ে নিতেন আর্কিটেকচারে, কখনও বা শিল্পের ইতিহাস। ব্যবসার নানা দিকেও আগ্রহ সেই সময় থেকেই। যদিও অটবি পুরোদস্তুর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, বিস্তৃত একটি পরিবার। এই পরিবারের নেতৃত্বে আছেন অনিমেষ কুন্ডু, শুনছিলেন তার কথা। দেশবরেণ্য ভাস্কর ও অটবির প্রতিষ্ঠাতা নিতুন কুন্ডুর উত্তরসূরি হয়ে দক্ষতার সাথে হাল ধরেছেন বৃহত্ এই শিল্পপরিবারের। প্রজন্মের সাথে কথোপকথনে তিনি শুনিয়েছেন অটবির সাথে তার পথচলার গল্প, জানিয়েছেন তার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনাও। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু যুক্তরাষ্ট্র থেকে তার ফিরে আসা ২০০১ সালে। গ্র্যাজুয়েশন করা ফুরফুরে মনের এক তরুণ তিনি তখন। বাবা সে সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। ধরেই নিয়েছিলেন, এর দায়িত্ব তার উপরই বর্তাবে। কিন্তু বাবা আর প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিলে তাকে শুরুতেই হর্তাকর্তার আসনে বসাতে চাইলেন না। বিদেশি ডিগ্রি নিয়েও ছুটলেন তিনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা অটবির আউটলেটগুলোতে। সেলসের একজন এক্সিকিউটিভের মতোই তার কর্মজীবন শুরু হলো। তারপর ধাপে ধাপে কাজ করেছেন সবগুলো বিভাগে। এভাবেই বাবার প্রয়াণের পর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আসীন হওয়া। অনিমেষ কুন্ডুর এগিয়ে যাওয়ার গল্পটা এমনই। অনিমেষ কুন্ডুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, নিজের প্রস্তুতিটা কেমন ছিল এমন একটা প্রতিষ্ঠানে যোগদানের আগে? তিনি বলেন, ‘কাগজে কলমে পড়াশোনার বাইরেও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষাটা কিন্তু অনেক জরুরি। বিশেষত বইয়ে উন্নত দেশগুলোর আদর্শ বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করা হয়। আসলে এসব কিন্তু আমাদের এখানে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। শুধু আমাদের এখানেই নয়, কোনো দেশেই এভাবে সম্ভব হয় না। এই চিন্তা থেকেই আমি তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু করেছি। তা ছাড়াও এর পাশাপাশি বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নিতাম। অন্য কোম্পানিদের নির্বাহীদের কাছ থেকেও শিখেছি তাদের কাজের ধরন। শিখেছি বলার চেয়ে বলা দরকার কাজের অভিজ্ঞতাগুলো জানা থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়।’ অনিমেষ কুন্ডু প্রচুর বই পড়েন, সেটা পাঠকদের আগেই জানিয়েছি। সেই বইয়েরও কোনো বাধাধরা নিয়মকানুন নেই। বইগুলো তার কাছে যেমন প্রিয়, তার পথচলায় সহায়কও বটে। ‘গুড টু গ্রেট’ বইয়ের কথা ধরে তিনি শোনালেন ব্যবসায়ের এক ভিন্নতর দিক সম্পর্কে। কোম্পানি দু রকম হতে পারে, ভালো আর মহত্। ভালো কোম্পানি হওয়া হয়তো খুব সহজ, মহত্ কোম্পানি হওয়া ততটা নয়। কোম্পানির কিন্তু নিজস্ব একটা গতিধারা থাকে, সে সেই মাফিকই এগিয়ে যায়। এই পথটা তৈরি করে দিতে হয় শীর্ষ পর্যায়ের কর্তাদের। অনিমেষ কুন্ডু কীভাবে পরিচালনা করেন এতবড় প্রতিষ্ঠান? তিনি জানালেন, সব সময়ই চাই এখানে সবাই তার নিজের মতামত দেওয়ার সুযোগ পায়। যে এখানে কাজ করছে, সে কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তার নিজের ভেবে কাজ করছে, তাই তার যে চিন্তা-ভাবনা, সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত সব সময়। লিডারশিপের প্রথম শর্তই হচ্ছে, আপনার অন্য লিডারদেরকেও সেভাবে বাছাই করে নিতে হবে। তাদেরকে সেইভাবে ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করতে হয়। কাজের পরিবেশটাও দিতে হবে সেরকম। অনিমেষ কুন্ডু জানালেন, তিনি কাজের জন্য দক্ষ জনবল প্রত্যাশা করেন। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তার কাছে এই দক্ষতার সংজ্ঞাটি কী? তিনি বলেন, ‘প্রথমেই একজনের মাঝে সততা থাকা দরকার, সততা ছাড়া আসলে কাজ করা সম্ভব নয়। এরপর নিজের প্রাতিষ্ঠানিক যে যোগ্যতা সেটা থাকা দরকার। তারপর বলব নিজের পেশাদারিত্বটা তৈরি করতে হবে নিজের মাঝেই। সবারই নিজের যৌক্তিক মতামত থাকতে পারে, শুধুই উপরের কর্মকর্তাকে খুশি করার কথা ভেবে কাজ করা উচিত নয়, এর ফলে কিন্তু কোম্পানিরও ক্ষতি হয়। সবকিছু মিলিয়েই কাজের পরিবেশটা খাপ খাইয়ে নেওয়া দরকার। আর নেতৃত্বের গুণাবলি সবার মাঝে তৈরি করা দরকার। শুধুই কথা বলতে পারাটা নেতৃত্ব নয়, এর পেছনে অনেক যোগ্যতারও দরকার রয়েছে। একজন তখনই কথা বলে কাউকে মুগ্ধ করতে পারবে, যখন কথার পেছনে ভিত্তি থাকবে। নিজের যোগ্যতা বা অযোগ্যতা যেটাই থাকুক সেটাকে আড়াল করার কিছু নেই। দুর্বল দিক থাকতেই পারে, সেটাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়াটাই জরুরি। এতকিছুর পরেও অটবি কর্মী নিয়োগে অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। এখানে কাজ করতে করতেই অনেকে উপরিপদে আসীন হয়েছেন।’ অটবির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অনিমেষ কুন্ডু বলেন, ‘এই মুহূর্তে দেশের প্রায় প্রতিটি থানা পর্যায়ে অটবির শোরুম রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে আমাদের ফার্নিচার পৌঁছে দিতে। ফার্নিচার শুধু বিলাসীদের পণ্য তা নয়, সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এর চাহিদা আছে। আমরা সেই মানের ফার্নিচার তৈরি করার চেষ্টা করছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষটির আয়ের সঙ্গে যে চাহিদা তৈরি হয় তা আমরা মূল্যায়ন করার চেষ্টা করছি। সেভাবেই আমরা নকশা এবং দাম নির্ধারণ করি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশে অটবির পণ্য রপ্তানি করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আমরা বেশ সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছি। বাংলাদেশি কোনো ব্র্যান্ড বাইরে গিয়ে এমন অবস্থান তৈরি করেছে এটা অবশ্যই একটা বিরল ঘটনা। ভারতে বর্তমানে ২৫টি পয়েন্টে আমাদের প্রোডাক্ট সবাই চেনে। ভারতের অনেকেই প্রথম দিকে অটবিকে বাংলাদেশি পণ্য বলতে চাননি। তারা মনে করেছিল এটি উন্নত কোনো দেশের প্রোডাক্ট। তাদের ধারণা ছিল, বাংলাদেশের প্রোডাক্ট এত উন্নত হয় কী করে? আমরা প্রথম যখন ভারতে গিয়েছি তখন সেখানকার লোকজন বাংলাদেশি পণ্য বলে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। এখন কিন্তু সেই মনোভাব আর নেই। গত চার-পাঁচ বছরের ব্যবধানে ভারতের বড় ধরনের বাজার ধরতে সক্ষম হয়েছি। এখন আর অটবির কোয়ালিটি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেন না। এটি তো আমাদের জন্য বড় পাওয়া। এই মুহূর্তে আমরা চিন্তা করছি ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং সার্কভুক্ত কয়েকটি দেশে আমাদের পণ্য রফতানি করব।’ অটবি গ্রাহক পর্যায়ে সরাসরি সম্পর্ক রাখতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। অনিমেষ কুন্ডু মনে করেন, গ্রাহকদের সাথে এই সম্পর্ক রাখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ক্রেতাদের অনেক তথ্য আমাদের কাছে থাকে। এর বাইরে মাঝে মাঝে বিভিন্ন পণ্য সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতেও তারা তাদের সাথে যোগাযোগ করেন। আর অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অটবি সব সময়ই ভিন্ন কিছু করার কথা ভেবে থাকে। সেজন্য গ্রাহকরাও আলাদা একটা নির্ভরতা পায় এখানে। নতুন উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে তিনি অটবির অ্যাপার্টমেন্ট কনসেপ্টের কথা বলেন। শুধুই ফার্নিচার নয়, আনুষাঙ্গিক সবকিছুতেই পরামর্শ দিয়ে থাকে অটবি। সবশেষে অনিমেষ কুন্ডুর কাছে প্রশ্ন ছিল, এই প্রজন্ম কেমন লাগছে তার কাছে? তিনি বলেন, ‘যুগের সাথে সবকিছু পালটে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। ভালো-খারাপ মিলিয়ে অনেক রকম অভিজ্ঞতাই রয়েছে। তবে দু-একটা বিষয় নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও যারা নিজেকে এগোনোর তারা কিন্তু নিজেকে এগিয়ে নিচ্ছে ঠিকই। বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাস অনেক দীর্ঘ নয়। এই স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দেশের ইন্ডাস্ট্রি অনেক ডেভেলপ করেছে। এর মানে হচ্ছে বাঙালিরা অনেক সাহসী এবং উদ্যমী। সাহসই উদ্যোক্তা হওয়ার প্রথম শর্ত। শতভাগ জেনে এগোতে পারা প্রথমবার কোনোভাবেই সম্ভব না। পুরোপুরি না জেনে বাঙালিরা যে পরিমাণ সাহস দেখাতে পারে তার জন্য কিন্তু অবশ্যই সাধুবাদ দেওয়া উচিত। বাংলাদেশে জিডিপির যে বৃদ্ধি তা কিন্তু এই বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কারণেই। যেমন, বাংলাদেশের গার্মেন্টস আজ যতটুকু উন্নয়ন করেছে তার জন্য কিন্তু উদ্যেক্তাদের সাহসটাই বড় বিষয় ছিল। কাজে নেমেই তো শিখতে হয়। স্থানীয় যে সমস্যা তা প্রশাসনের মোকাবেলা করা দরকার। অপ্রত্যাশিত হলেও সত্য যে প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়। কিন্তু এর জন্য হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে তো আর চলবে না। বাংলাদেশের চিত্র তো এমনই, তবুও পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ বিবেচনায় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আশাব্যঞ্জক। আর উন্নয়নশীল দেশ হওয়াতে অনেক কিছু করার সুযোগ আমাদের রয়েছে। নতুন প্রজন্ম সেই পথ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে।