আ ন্ত র্জা তি ক
মার্গারেট থ্যাচার
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২৯
১৯৯০ সালে মিসেস মার্গারেট থ্যাচারের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত্ ঘটে। তখন আমি লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনার। এ সময়কালে তিনি তার অর্জনাদি নিয়ে ভাবছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ভাবনা ছিল শীতল যুদ্ধ জয়লাভ সম্পর্কিত। কম্যুনিস্ট আদর্শ পরাভূত করতে সাফল্যের কারণে আমি তাকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি বললেন, কম্যুনিজমের চেয়েও বড় শত্রুকে তিনি পরাভূত করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি ইসলামের নাম করলেন। প্রায় ঐ সময়ই আমি জানতাম যে, প্রধানমন্ত্রী থ্যাচার তার পদ হারাচ্ছেন। কেননা তার দলের লোকদের একটি অংশ সে প্রেক্ষাপট পূর্ণতার দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। দলে তার যে ব্যাপক শত্রু ছিল একথা কারো অজানা ছিল না। মিসেস থ্যাচারের বরাবরই ছিল ন্যায়পরায়ণতা ও একটা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। তার রুচি ও বিশেষ গুণাবলীও তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাবু করে রেখেছিল।
সত্যি বলতে কী ‘সমগ্র’ থ্যাচারের সামনে তার প্রবল প্রতাপান্বিত বিশিষ্ট নেতারা নিজেদের নস্যি ভাবতে শুরু করেছিলেন। এদের মধ্যে অনেকেই যত শিগগির সম্ভব মিসেস থ্যাচারের মূলোত্পাটন চাইছিলেন। কিন্তু এই বিরোধীরা থ্যাচারের অতিকায় ইমেজের কাছে ছিলেন তুচ্ছ। নিরঙ্কুশ বিজয়ের জন্য মিসেস থ্যাচারের আরো শতকরা ১৫ ভাগ ভোট প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তিনি ৫ ভোটে নির্বাচনে হেরে যান। এর নেপথ্যের কারণ ভারতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি নির্বাচনের মতই অস্পষ্ট বা রহস্যময়। মিসেস থ্যাচারের দলীয় কোন লোকই তাকে সতর্ক করেননি। একটি হেরে যাওয়া যুদ্ধে যে জিততে চাইছেন মিসেস থ্যাচার তা তিনি অবহিত ছিলেন না। অবশেষে গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে নিশ্চিত হয়ে তিনি তার পদত্যাগপত্র দাখিল করেছিলেন। এ ব্যাপারে মিসেস থ্যাচারের কনজারভেটিভ পার্টির এক সদস্যের সাথে আমার কথা হয়েছিল। ঐ ভদ্রলোক পরে প্রধানমন্ত্রী জন মেজরের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। তার ভাষ্য ছিল দলীয় অখণ্ডতা বজায় রাখতেই তারা চাইছিলেন যে, মার্গারেট থ্যাচার পূর্বাহ্নে বিদায় নেবেন। সত্যি বলতে কী, তার দলীয় লোকরাই মিসেস থ্যাচারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এক মন্ত্রী আমার কাছে সে কথা স্বীকারও করেছেন।
বৃটেনের অর্থনীতি স্থির বা নিশ্চল হয়ে পড়ার বেশ কতগুলো কারণ ছিল। বেসরকারিকরণ নিয়ে বাড়াবাড়ি, ট্রেড ইউনিয়নের সাথে সম্মুখ সমর, এমনিতরো বেশ কিছু কারণ ছিল। কিন্তু এজন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল বৃটেনকে। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়েছিল। মোট কথা উল্লেখিত কারণে বৃটিশ জাতি ঐ সময় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ১৯৮৭ সালের পর তিনি পর পর তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে এসে মনে হয়েছে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর ক্ষেত্রেও ১৯৬২ সালে এমনটি মনে হয়েছিল। এ বছরই চীনের হাতে ভারতের চরম বিপর্যয় ঘটেছিল। মিসেস থ্যাচারের উচিত ছিল জনমত জরিপের ফলাফলকে গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা। কনজারভেটিভ পার্টি পরাজয়ের ক্ষেত্রে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। প্রকৃতপক্ষে ক্ষয়িষ্ণু নেতাকে কেউ পৃষ্ঠপোষকতা করে না। অতীতে তার কী অবদান রয়েছে একথা কেউ ভাবতে চায় না। এক্ষেত্রে চার্চিলের নামটি স্মরণে আনা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই মহানায়ককেও পরাজয়ের গ্লানি মোকাবেলা করতে হয়েছিল।
বৃটেনে আসার পরপরই আমি প্রথম যে রাজনৈতিক রিপোর্টটি ভারতে পাঠাই সেটি ছিল স্টাকোর্ডশায়ারের একটি উপ-নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির পরাজয় বিষয়ক। আমার তখন মনে হয়েছিল এই পরাজয় এলাহাবাদের উপ-নির্বাচনে রাজীব গান্ধীর দলের পরাজয়ের সাথে তুলনীয়। এ সময় ভিপি সিং গং তরতড়িয়ে এগিয়ে আসছিলেন এবং ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস (আই) সরকারের পতন হয়েছিল। আমি যদিও আশা করেছিলাম যে, বৃটেনে আমার হাইকমিশনার থাকাকালে মিসেস থ্যাচারের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ সরকারের পতন ঘটবে না। কিন্তু আমি লন্ডন ছাড়ার কিছুদিনের মধ্যেই মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান।
আমি অবশ্যই স্বীকার করব যে, আমি যখন তার সাথে প্রথম সাক্ষাত্ করি সেটি ছিল গভীর উষ্ণতায় পূর্ণ। আমি তার সম্পর্কে কী লিখেছিলাম তা লৌহমানবী তা ভুলে গিয়েছিলেন। লন্ডনে থাকাকালে কয়েকটি বিষয় আমাকে নাড়া দিয়েছিল। আমি লক্ষ্য করলাম, এখানকার কূটনীতিকরা প্রকাশ্যে রাণীর সাথে মিসেস থ্যাচারের টানাপোড়েন নিয়ে কথা বলছেন। মিসেস থ্যাচার রাণী হওয়ার ভাব ধরছেন এমন কথাও চালু ছিল। বিষয়টি অনেকে অশোভন, বেমানান, পদের সাথে অসংগতিপূর্ণ এবং একটি পবিত্র বিষয়কে অপবিত্র করে ফেলার মত অনেকে বিবেচনা করতে থাকেন। একথা সত্যি যে, রাণী ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক মোটেই সুখকর ছিল না।
একটি ঘটনার কথা বলি। এক অনুষ্ঠানে রাণী ও প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার একই ধরনের পোশাক পরেছিলেন। এই ঘটনার পর মিসেস থ্যাচারের ব্যক্তিগত সহকারী রাজপা্রসাদে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি আসন্ন একটি পার্টিতে রাণী কী ধরনের পোশাক পরবেন তা জানতে চান। এটি জানতে চাওয়ার কারণ হল আসন্ন ঐ পার্টিতে তাদের পোশাক যেন একই রকমের না হয়। রাণী এর উত্তরে জানান, এ নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নেই। এমনকি মিসেস থ্যাচার পূর্বেকার পার্টিতে কি পোশাক পরেছিলেন তার দিকে তিনি একবারও দৃষ্টি নিবদ্ধ করেননি।
ভারতীয় প্রেসিডেন্ট ভেঙকটরমনের যুক্তরাজ্য সফরকালে মিসেস থ্যাচারের সাথে আমার আরেকবার ঘনিষ্ঠভাবে সাক্ষাত্ ও আলাপ হয়েছিল। মিসেস থ্যাচারের পাশেই আমি বসেছিলাম। সত্যিই এ সময় নানা বিষয়ে প্রায় দু’ঘন্টা আমরা কথা বলেছিলাম। মিসেস থ্যাচার আমাকে জানালেন যে, তিনি অনেকবার গুরুদুয়ারা পরিদর্শনের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। কিন্তু একবারও যাননি। মিসেস থ্যাচার বলেন, ঐ লোকগুলোই ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করেছে। কী ধরনের লোক তারা। মার্গারেট থ্যাচার পাঞ্জাবের সহিংসতাকে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির (আইআরএ) সহিংসতার সাথে তুলনা করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, পাঞ্জাবের সহিংসতা বড় আকারে সংঘটিত হয়েছিল। যদিও কাশ্মীর প্রসঙ্গে তিনি খুব কম কথাই বলেছেন। তবে একথা বলেছেন যে, ভারতের ঐক্য ও মর্যাদার প্রশ্নে কোন আপোষ নেই।
আমি মিসেস থ্যাচারকে বললাম যে, ভারতের রাজনীতিকদের নৈতিক মান খুব নেমে গেছে। রাজনীতিকরা প্রতিপক্ষকে একের পর এক আঘাত করে চলেছেন। আর এই আঘাত সমানে করছেন বেল্টের নিচে। এর প্রেক্ষিতে মিসেস থাচার বললেন যে, বৃটেনের অবস্থা আরও খারাপ। তার ভাষ্য, কোন রাজনীতিক পতনোন্মুখ অবস্থায় গেলেও এই আক্রমণ বন্ধ হয় না। আক্রমণ চলতেই থাকে।
মিসেস থ্যাচার ইন্দিরা গান্ধীকে খুব পছন্দ করতেন। আর তাদের দু’জনার আন্তরিকতার কথা তিনি উল্লেখও করলেন। মিসেস থ্যাচার বললেন, কোন বিষয়ে আমরা অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে ব্যর্থ হলেও আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হয়নি।
আমাদের আলোচনা যত এগুচ্ছিল আমি ততই লৌহমানবী মিসেস থ্যাচারের কোমল অন্তঃকরণের পরিচয় আবিষ্কার করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে তিনি তার ছেলের প্রসঙ্গ তুললেন। বললেন, তার ছেলে দেশ ছেড়ে আমেরিকা চলে গেছে। কেননা তার ছেলের বিরুদ্ধেও বিরুদ্ধবাদীরা সরব। তার ছেলের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে যে, তার মায়ের ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে সরকার থেকে নানা সুযোগ-সুবিধে নিচ্ছে। মিসেস থ্যাচার বললেন, তার ছেলে আমেরিকা চলে যাওয়ায় তার নাতি-নাতনীদের চোখের দেখাও দেখতে পারছেন না। মিসেস থ্যাচার বললেন, রাজনীতিতে আসার কারণেই তাকে এই মূল্য দিতে হচ্ছে। তিনি নিজেকে একজন কমিটেড রাজনীতিক হিসেবে উল্লেখ করলেন।
তবে একথা স্বীকার করতে হবে যে, মার্গারেট থ্যাচারের আমলেই বৃটেন ‘ক্লিক’ করেছিল।
ভাষান্তর: কায়কোবাদ মিলন
লেখক : উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক