বেড়ানো

বিয়াসের মেলা

নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার দাহিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম বিয়াস। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এ গ্রামে চলে আসছে এক মেলা। জনশ্রুতি আছে বিয়াসের জমিদার গৌরচন্দ্র ঘোষের জমিদারিরও অনেক আগে এ মেলার প্রচলন। একসময় এ মেলার যৌবন ছিল। তবে দেশ বিভাগের পর জমিদার গৌরচন্দ্র ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে মেলাটি গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। ১৪ মে মেলাটি বসলেও মূলত ১৩ মে থেকেই জমজমাট হতে শুরু করে। দেশের বিভিন্ন জায়গা বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের সব জায়গা থেকেই নানান পণ্যের পসার নিয়ে এ মেলায় হাজির হন শত শত বিক্রেতা। তবে মেলার আগের দিনও এখানে বসে অন্য রকম এক মেলা। এটিকে মিষ্টি মেলা বললে ভুল হবে না। মিষ্টি কারবারিরা একদিন আগে এসেই নানান ধরনের মিষ্টান্ন তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হরেক মিষ্টি খেতে এদিনও দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই চলে আসেন এখানে। বিয়াসে নানান মজার মজার রীতিনীতি প্রচলিত আছে এ মেলাকে ঘিরে। এ মেলার আনন্দ অনেক সময় স্থানীয়দের কাছে ঈদ আনন্দকেও হার মানায়। এ রকম একটি হলো জামাই আদর। নতুন পুরোনো, সব জামাই-ই সপরিবারে আসেন শ্বশুরবাড়ি। মেলা থেকে সাধ্যমতো বাজার সদাই করে নিয়ে যাওয়াও একটি রেওয়াজ এখানে। শ্বশুরবাড়ি থেকেও নানান উপহার সামগ্রী বিশেষ করে মোটা অঙ্কের সালামীও পান। বিয়াসের মেলার অন্যতম একটি উপকরণ মাছ। মেলায় আসা জামাইদের জন্য মাছচাষিরা তাদের পুকুরে বছর ধরে বড় বড় মাছ জমিয়ে রাখে। মেলার আগের পূর্ণিমার রাতে তারা জাল ফেলে পুকুরে। পরদিন খুব সকালেই তাজা তাজা মাছ নিয়ে চলে আসেন মেলায়। সে মাছ জামাইদের হাত ঘুরে চলে যায় শ্বশুরবাড়ি। মেলার আরেকটি মজার রেওয়াজ হলো পরের দিনে জায়গাটিতে বসে বৌ মেলা। এদিন সকালবেলা মহিলাদের জন্যই বরাদ্দ মেলাটি। এ দিনে মেলার মূল উপকরণ মেয়েদের নানান সাজ সরঞ্জাম। মেলায় আসা দোকানিরাই এদিন তাদের পণ্যে পরিবর্তন আনেন। বাংলার আবহমান কালের সকল গ্রাম্য মেলার মতোই এ মেলায় নানান গ্রামীণ পণ্যের পসরা বসে। মাটি, কাঠ, বেত, বাঁশ আর লোহার সামগ্রীতে ভরপুর থাকে মেলা প্রাঙ্গণ। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধামা, ঝুড়ি, কুলা, বাটি, শাবল, দা, কোদাল, খোন্তা, ছুরি, মাটির পুতুল, খেলনা, মাটির তৈরি হাড়ি পাতিল, গৃহসজ্জা সামগ্রী, মুড়ি, মুড়কি, পিঠা, নানান মিষ্টান্ন। এ ছাড়া বিনোদনের জন্য থাকে নাগরদোলা, সার্কাস, পুতুল নাচ, সাপ খেলা, বানর খেলা ইত্যাদি। কীভাবে যাবেন বিয়াসের মেলায় যেতে প্রথমে যেতে হবে নাটোর জেলা সদরে। সেখান থেকে থেকে বাসে উপজেলা সদর সিংড়া, ভাড়া ১৫-২০ টাকা। সিংড়া থেকে আবার বেবি টেক্সিতে যেতে হবে বিয়াস। এ পথে বেবিটেক্সির লোকাল সার্ভিস আছে। রিজার্ভ নিয়ে গেলে খরচ পড়বে ১৫০-২০০ টাকা। ঢাকা থেকে নাটোরের বাসগুলো ছাড়ে সাধারণত কল্যাণপুর, গাবতলি থেকে। এ পথে গ্রিন লাইন পরিবহন, টি আর ট্রাভেলস ও ন্যাশনাল পরিবহনের এসি বাস চলাচল করে। ভাড়া ৬৫০-১০০০ টাকা। এ ছাড়া হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, ন্যাশনাল পরিবহন, বাবলু পরিবহন প্রভৃতি বাসে যাওয়া যায় নাটোর। এ ছাড়া ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেন একতা এক্সপ্রেস, লালমণি এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেসে নাটোর আসা যায়। এ ছাড়া খুলনা থেকে রূপসা ও সীমান্ত এক্সপ্রেসে নাটোর আসা যায়। কোথায় থাকবেন বিয়াসে থাকার জন্য ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই। মেলার আশপাশে নিরাপদ কোথাও ক্যাম্প করে থাকতে পারেন। অন্যথায় থাকতে হবে নাটোর শহরে। এখানে থাকার জন্য সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে। শহরের চকরামপুরে হোটেল ভিআইপি, মাদ্রাসা মোড়ে হোটেল উত্তরা, হোটেল মিল্লাত, কানাইখালীতে হোটেল আরপি ইত্যাদি। এসব হোটেলে ১০০-৫০০ টাকায় কক্ষ আছে। আলোকচিত্র :ইমদাদুল ইসলাম বিটু/বেঙ্গলপিক্স