রা জ নী তি
গভীর সংকটে আমাদের মাতৃভূমি
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫৭
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে যে কোন দেশপ্রেমিক নাগরিক বিচলিত না হয়ে পারে না। এ দেশ, এ রাষ্ট্র, এ সমাজ আমাদের সকলের, ষোল কোটি জনগণের। দেশের ভালো-মন্দের সাথে সকল মানুষের ভাগ্য জড়িত। দেশের অস্তিত্বের সাথে জড়িত দেশবাসীর অস্তিত্ব। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও জনকল্যাণকর রাষ্ট্রের অধিবাসীরা সকল নাগরিক অধিকার ভোগ করার কথা। রাষ্ট্র নাগরিকের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে এবং নাগরিকও রাষ্ট্রের প্রতি তার কর্তব্য ও করণীয় কর্ম সম্পাদন করে। রাষ্ট্রের প্রাথমিক এবং প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা, জানমাল রক্ষা করা, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। অর্থাত্ সকল নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ আধুনিক বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি মূল লক্ষ্য।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে দেশের সকল স্তরের, সকল শ্রেণি-পেশার জনগণ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য অনেক দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে ও অকাতরে জীবন বিসর্জন দেয়। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা এ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত রচনা করি। জাতি হিসেবে তাই আমরা গর্ব অনুভব করি। আমরা বীরের জাতি, কারণ যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা সভ্য জাতি, কারণ আমরা গণতন্ত্রপ্রিয় জাতি। আন্দোলন, সংগ্রাম এবং নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের এই অর্জনগুলো নিঃসন্দেহে এক বিশাল অর্জন। কিন্তু দেশে আজকের যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি (anarchic situation) তা আমাদের মতো কষ্টার্জিত স্বাধীন, গণতান্ত্রিক দেশে কিছুতেই কাম্য ছিল না। এদেশের জনগণের এটা প্রাপ্য ছিল না। মূলত বর্তমান সরকার ও কিছু অশুভ শক্তি জনগণের এই ভোগান্তি ও দুঃখ-কষ্টের জন্য দায়ী। আজকের যে সংকট তা মানবসৃষ্ট। সরকার ও স্বার্থান্বেষী মহল তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থের জন্য নৈরাজ্য ও সংকট সৃষ্টি করেছে। একে তো আমাদের দেশ দরিদ্র, তদুপরি জাতীয় সম্পদের ধ্বংসযজ্ঞ, সীমাহীন দুর্নীতি, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এ সকল কারণে দেশের সার্বিক অবস্থা শোচনীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে। জনগণের বিশাল অংশের দুঃখ-কষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
অতি সমপ্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও দুর্নীতি বাংলাদেশের মূল সমস্যা। প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জড়িত। দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরকারের লোকদের দায়মুক্তি এবং বাক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সরকারের বাধা সৃষ্টি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য, শ্রমিক অধিকারের দুর্বল অবস্থার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া স্বেচ্ছাচারীভাবে গ্রেফতার, আটকে রাখা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুও দেশটির মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা। দুর্বল বিচারিক ক্ষমতা এবং বিচারের পূর্বে দীর্ঘদিন আটক রাখার ঘটনা ঘটে চলেছে। নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটেছে। সভা-সমাবেশ ও বাক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সরকার বাধা সৃষ্টি করছে, সরকারের হয়রানির ভয়ে কিছু সাংবাদিক সমালোচনা করা থেকে ‘আত্মনিষেধাজ্ঞার’ পথ বেছে নিয়েছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতা ও সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এদিকে দেশের বেশ কিছুসংখ্যক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত নাগরিক সমাজ দিন দুয়েক আগে উল্লেখ করেছে যে, গত চার বছরে দেশে ৪৬২টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ সকল হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। এছাড়া এ সময়ে ১৫৬ জন নাগরিক গুম হয়েছেন। সংখ্যালঘু সমপ্রদায় ও আদিবাসীদের উপর বারবার হামলা করা হয়েছে। যে কোন আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের জীবনধারণের অধিকার (Right to life), মত প্রকাশের অধিকারকে মৌলিক অধিকার বলা হয় এবং এগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকারের। আমাদের সংবিধানেও এ সকল মৌলিক অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, এ সকল অধিকার আজ ভূলুণ্ঠিত। এ হলো আজকের দিনের বাংলাদেশের বাস্তবতা।
২০০৯ সালে বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসীন হন। কিন্তু চার বছরে সরকারের অর্জন তেমন কিছু নাই, আছে শুধু ব্যর্থতা, বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুম ও সীমাহীন দুর্নীতি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের মানুষ বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, শ্রমিক, কৃষক, ভূমিহীন, ক্ষেতমজুর আজ দিশেহারা। এর সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় খাদ্যে বিষ মিশানোর প্রক্রিয়া। ফরমালিনসহ অন্যান্য বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে মুনাফালোভীরা মুনাফার পাহাড় গড়তে থাকে; আর অসহায় দেশবাসী রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বের অন্য কোন দেশে এটা কল্পনাও করা যায় না। অথচ দেশের ‘মহাজোটের গণতান্ত্রিক সরকার’ এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্বিকার; লোক দেখানো সীমিত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে যে এটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় তা সরকারের না বুঝার কোন কারণ আছে বলে মনে হয় না।
চৌধুরী আলম ও ইলিয়াস আলীর অপহরণের মধ্য দিয়ে সরকারের নির্যাতনের নগ্নচিত্র দেশে-বিদেশে সকল মহলকে ব্যথিত করলেও সরকারের তাতে কিছু যায় আসে না। ভারাক্রান্ত হূদয়ে, কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইলিয়াস আলী এবং চৌধুরী আলমের স্ত্রী তাদের নিজ নিজ স্বামীর লাশ ফেরত চেয়েছিলেন; কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোন সাড়া মেলেনি। জানা যায়, এ পর্যন্ত শতাধিক বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মী অপহরণ ও গুম হয়েছেন। তাদের ভাগ্যে কি আছে কে জানে! সমপ্রতি “নিউইয়র্ক টাইমস”-এর এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যার সাথে সরকার জড়িত। অনুমান করা হয় সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যার সাথে উচ্চমহলের লোকেরা জড়িত ছিল বলেই আজ পর্যন্ত এ হত্যারহস্য উদঘাটন হয়নি এবং আজও কেউ গ্রেফতার হয়নি। আরও জানা যায় যে, তাদের ল্যাপটপে দুর্নীতির এমন সব তথ্য-প্রমাণ ছিল তা উদ্ধার করতে গিয়ে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শাসক শ্রেণির শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন, সীমাহীন দুর্নীতি, শেয়ারবাজার লুট, কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ প্রকল্প, পদ্মা সেতু প্রকল্প ও সর্বোপরি সরকারদলীয় পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক টাকা লুটের মাধ্যমে দেশকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে; যার ফলে এ দেশের জনগণের কপালে নেমে এসেছে অসহনীয় এবং অবর্ণনীয় দুর্ভোগ।
এ দেশেও সূর্য উঠে, দিন যায়, রাত হয়; সপ্তাহ, মাস ও বছর অতিক্রান্ত হয়, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পায় দুর্নীতির ঘটনা। বর্তমান শাসনামলে দুর্নীতি এ যাবত্কালের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এ আমলে দুর্নীতির সর্বশেষ ঘটনা হলমার্ক জালিয়াতি। সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকেই চার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে, আর দেশের অর্থমন্ত্রী বলেছেন এটা “তেমন কিছু নয়”। হায়রে দুর্ভাগা দেশ- চার হাজার কোটি টাকার “নিরাপদ চুরি”কে তেমন দুর্নীতি বলতে চান না দেশের অর্থমন্ত্রী। একজন সাধারণ ব্যাংক ঋণ গ্রহীতা পাঁচ হাজার টাকার ঋণের কিস্তি সময়মত পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাংক কর্মকর্তারা তার পিছু নেন এবং তা আদায়ে বিভিন্ন পন্থা গ্রহণ করতে তত্পর হয়ে উঠেন। এক হাজার টাকা চুরির দায়ে যে দেশে একজন পিয়ন বা কর্মচারীকে চাকরি হারাতে হয়, জেল-জরিমানা হয়; সে দেশে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসােক ‘তেমন কিছু নয়’ বলেন অর্থমন্ত্রী। এর কারণ কি? পাঠক বন্ধুরা একটু চিন্তা করলেই বিষয়টি বুঝতে পারবেন। কারা লুটের সাথে জড়িত? কি তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়? এ প্রশ্নের উত্তর পেলেই অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য বুঝতে কোন অসুবিধা হবে না।
এর আগে পদ্মা সেতু কেলেংকারির ঘটনা দেশের ভাবমূর্তি শুধু নষ্ট করেনি, এর নির্মাণে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সেতু নির্মাণ শুরুর আগেই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, আমলা ও দলীয় লোকেরা এমন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন যে, বিশ্ব ব্যাংক তাদের ঋণ সাহায্য বন্ধ করে দেয়। দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীর পদত্যাগেও শেষ রক্ষা হয়নি। দেশের এত বড় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, যার সাথে দেশের লক্ষ কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িত, তাকে নিয়ে এমন কাণ্ডে সরকারের কি লজ্জাও হয় না?
বিদ্যুত্ উত্পাদনের নামে “কুইক রেন্টাল” প্রকল্প চালুর মাধ্যমে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। একজন বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন যে, “এতে বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি তো হয়ইনি, বরঞ্চ বিদ্যুত্ খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে”। তারও আগে শেয়ারবাজার কেলেংকারির মাধ্যমে দেশের লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। সর্বস্ব হারিয়ে তারা বারবার রাস্তায় নেমেছে, পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছে, রাস্তায় শুয়ে থেকেছে, আত্মহত্যা করেছে। টেলিভিশনে দেখেছি তাদের কান্না, তাদের আর্তনাদ, তাদের অসহায় চিত্কার। কিন্তু এ চিত্কার অর্থমন্ত্রী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেছে বলে মনে হয় না। সরকার দায়সারা গোছের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তদন্তের সুপারিশ কোন কাজে লাগেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা শেয়ারবাজার থেকে লুট করেছে, যার বেশিরভাগ বিদেশে পাচার হয়েছে। লুটেরারা, আত্মসাত্কারীরা রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। বারবার বিচারের দাবি উঠলেও কিছুই করেনি সরকার।
লুটপাটের এ চিত্রের সাথে যোগ হয়েছে দলীয়করণের অসংখ্য ও অবর্ণনীয় ঘটনা। সবক্ষেত্রে দলীয়কণের সঠিক তথ্য না জানলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয়করণের এমন নগ্ন চিত্র আর কখনো দেখা যায়নি। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষা কার্যক্রম। অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের কাছে শিক্ষকগণ ও শিক্ষার্থিগণ জিম্মি। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই একাডেমিক পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না । অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আজ এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের অবাধ চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মারামরি, হানাহানি, অন্তঃকলহে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আজ সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত। দলীয় উপাচার্য, প্রশাসন ও দলীয় ছাত্র-ক্যাডারদের যৌথ আক্রমণের শিকার বিরোধীদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে দখল না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বর্তমান সরকারকে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারেও অনড়। নানা অজুহাতে ড. ইউনূসকে অসম্মান করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। কালো আইন প্রণয়ন করে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্তৃত্ব গ্রহণ করার সকল কাজ সরকার ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে। এতে গ্রামীণ ব্যাংকের এতদিনের অর্জন ব্যর্থ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সরকার খুবই তত্পর। এ দেশের প্রায় সব মানুষই যুদ্ধাপরাধীর বিচার চায়। আমিও চাই। কিন্তু তা হতে হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং দলমত নির্বিশেষে সব যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। দ্রুত বিচার শেষ না করে ভোটের স্বার্থে বিচারকে দীর্ঘায়িত করে খুব কি লাভ হবে? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা দৃঢ় ও স্পষ্ট নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তারা এ বিচার দীর্ঘায়িত করতে চায়, ঝুলিয়ে রাখতে চায়, যেন আগামী নির্বাচনে এটাকে ইস্যু করতে পারে। সরকার মনে করেছেন এতে তাদের ভোট বাড়বে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভোট। কিন্তু এ মুলা ঝোলানোর ফল উল্টোও হতে পারে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মভীরু; কিন্তু গোঁড়া নয়। তাই এ দেশে মৌলবাদের উত্থানের কোন সম্ভাবনা আমি দেখি না। অতএব একে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে ফায়দা লুটা সম্ভব হবে না।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধিশালী শোষণ-বঞ্চনাহীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েম করা। কিন্তু আমাদের সে উদ্দেশ্য আজও পূরণ হয়নি । দেশ আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। হত্যা, গুম, খুন গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না। গণতান্ত্রিক সমাজে এটি কল্পনাও করা যায় না। তাহলে গণতন্ত্রের সাথে ফ্যাসিবাদের কি পার্থক্য? অথচ আজকের বাংলাদেশে হত্যা, গুম, খুনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। সংকীর্ণতা নয়, মনের উদারতা, পরম সহিষ্ণুতা, ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, আমাদের রাজনীতিবিদরা এগুলো ধারণ করেন না অথবা এসব মূল্যবোধ আপাতত পরিহার করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কবলে দেশ; রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করাই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। জাতির জন্য এহেন অবস্থা মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই রাজনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে এর থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে হবে এবং এ ভয়াবহ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এই মুহূর্তে প্রয়োজন সংলাপ, সমঝোতা, উদারতা, সহনশীলতা ইত্যাদি। আর এ সমঝোতা হতে হবে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে। একদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও মহাজোট, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও আঠারো দলীয় জোটের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছার লক্ষ্যে দুই পক্ষকেই প্রয়োজনীয় ছাড় দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সমঝোতা ছাড়া কোন বিকল্প নাই। ব্যবস্থা নিতে হবে আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের। নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে। অবশ্যই সে নির্বাচন হতে হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অবাধ, সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। এ ধরনের সমঝোতা আপাতত এ জাতিকে ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, সাবেক
রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী