[ রা ষ্ট্র চি ন্তা ]

শাসনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা ও ‘তোতা পাখির মতো’ রিমান্ড আদেশ

একটু ভাবিলেই কাহারও পক্ষে বুঝিতে কষ্ট হইবে না যে, কেবলমাত্র নির্বাচনভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে গিয়া শুধু যে জাতির জন্য চরম দুর্ভোগ ডাকিয়া আনা হইয়াছে তাহা নহে, নেতাদেরকেও কম মূল্য দিতে হয় নাই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভয়াবহ দিকটি যাহাতে উপেক্ষিত না হয় সেইজন্য গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র মানিয়া চলা নেতাদের জন্যও শ্রেয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় হরেক রকম তাল না থাকিলে বিরোধী দলের হরতালের রাজনীতি চলিতে পারিত না। সুবিবেচনার খাতিরে ইহা আমাদের স্বীকার করিতে হইবে যে, আমাদের দেশে যে ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিদ্যমান সেই নেতৃত্বকে সঠিক পরামর্শ না দিয়া যদি তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে, তাহাদের কারণে বাংলাদেশে গণতন্ত্র কাজ করিতে পারিতেছে না, তবে সেই কথার দ্বারা সম্পূর্ণ সত্য বলা হইবে না। ইহার সহজবোধ্য কারণ হইতেছে গণতন্ত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা নহে। ক্ষমতাসীনদের নিকট নতজানু থাকার রাজনীতিও নয়। একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার যাহা কিছু করে উহার সবকিছুর দায়-দায়িত্ব বহন করিতে হয় স্বয়ং একনায়ককে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সফল করিতে প্রয়োজন সকলের সহযোগিতা। শুধু নির্বাচনই গণতন্ত্র নহে। বিষয়টি সহজে উপলব্ধি করিবার জন্য এই তথ্যই যথেষ্ট যে, গণতান্ত্রিক পন্থায় দেশ পরিচালনার জন্য একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র থাকিতে হয়। নিজের দোষক্রটির কথা বিস্মৃত হইয়া সরকার সঠিকভাবেই ইহা স্মরণ করাইয়া দিয়াছে যে, শাসনতন্ত্রের প্রতি সশ্রদ্ধ থাকিবার বাধ্যবাধকতা সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং শাসনতন্ত্র নির্দেশিত কর্তব্যকর্ম সম্পাদন আমাদের সকলের জন্য বাধ্যতামূলক। ইহাই জনগণের সার্বভৌম ঘোষণা। এইভাবে আমাদের গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের কর্তৃত্ব জনগণ হইতে আসিয়াছে এবং আমাদের প্রত্যেকের উপর শাসনতন্ত্র মানিয়া সকল রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পাদন করিবার দায়িত্ব বর্তাইয়াছে। শাসনতন্ত্রের অনুশাসন মানিয়া আমরা সম্মিলিতভাবে নিজেদের ব্যক্তিসত্তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা সংরক্ষণ করিবার পাশাপাশি নিশ্চিত করিয়া থাকি সামষ্টিক সুশাসন। একটি স্বাধীন দেশে এই প্রক্রিয়ায় শাসনতন্ত্র প্রতিটি নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে জনগণের সেবায় সম্পৃক্ত করিয়া থাকে। প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা হইল প্রত্যেককে শাসনতন্ত্র মানিয়া কাজ করিতে হইবে এবং কেহই শাসনতন্ত্রের ঊর্ধ্বে নহে। নির্বাচিত বিরোধী সংসদ সদস্যরা যখন সংসদ বর্জন করেন এবং বিরত থাকেন জনগণের পক্ষে তাহাদের দায়িত্ব পালন হইতে, তখন তাহারা শাসনতন্ত্র লঙ্ঘন করেন। তেমনি সরকার যখন দলীয় লোকদের বিচারক নিয়োগ করিয়া বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করিতে দিতে অনীহা প্রকাশ করেন তখন সরকারকে শাসনতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলা চলে না। সরকার যখন শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের নির্বাচনে নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি করে তখন সরকার শাসনতন্ত্র অমান্য করে। কারণ নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন গণতন্ত্র রক্ষার চাবিকাঠি। দলীয় নয় এমন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যেমন গণমাধ্যম, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ইত্যাদিতে রাজনীতিকরণ চালু করা হইলে গণতন্ত্র আর কাজ করিতে পারে না। এইসব প্রতিষ্ঠানের নিকট হইতে নির্দলীয় স্বাধীন ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয়। কোন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই উহার নির্ধারিত ভূমিকা স্বাধীনভাবে পালন করিতে পারে না যদি সেই প্রতিষ্ঠানে দলীয় এক্টিভিস্টদের ঢুকানো হয়। এইভাবে দলীয় সুবিধাভোগীদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, জনগণের শাসন বিদায় গ্রহণ করে। গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের দাবি হইতেছে জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। আমাদের শাসনতন্ত্রের ২১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের যে মৌলিক নীতি ঘোষণা করা হইয়াছে সেখানে বলা হইয়াছে ঃ ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য’। সহজ কথা হইল, গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র কার্যকর না থাকিলে গণতন্ত্র কাজ করিতে পারে না। গণতন্ত্রকে কার্যকর করিতে কাহারা সরকার গঠন করিবেন উহা পছন্দ করিবার জন্য শাসনতন্ত্র অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে নির্বাচন। তাহারা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হন শাসনতন্ত্র মানিয়া চলার ওয়াদার ভিত্তিতে। যিনি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র মানিয়া চলেন কেবল তিনি নিজেকে গণতান্ত্রিক বলিয়া দাবি করিতে পারেন। সত্যিকার জনপ্রতিনিধিত্ব করিতেছেন দাবি করিতে পারেন। শাসনতন্ত্রে যেসব মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হইয়াছে সেইসবের প্রতি সকলের শ্রদ্ধাশীল থাকিতে হইবে। কিন্তু দেখা যাইতেছে চাপে পড়িয়া কিংবা দীর্ঘদিনের খারাপ অনুশীলনের কারণে আদালত অভিযুক্তকে অতি সহজেই পুলিশ রিমান্ডে পাঠায়। যাহাকে হাইকোর্ট ডিভিশন তোতা পাখির মতো আচরণ বলিয়া অভিহিত করিয়াছে। সর্বাপেক্ষা নৈরাশ্যজনক হইল, পুলিশ রিমান্ডে নিয়া নির্যাতন করাটাকে সাধারণভাবে কোন অন্যায় বলিয়া দেখা হইতেছে না। একজনকে পুলিশ রিমান্ডে পাঠানো বাস্তবে তাহাকে পুলিশি রাষ্ট্রে নির্বাসিত করা। অর্থাত্ তাহাকে সম্পূর্ণভাবে পুলিশের নিকট অসহায় করা। ভাবিতেও অবাক লাগে কোর্ট কিভাবে একজনকে ১৩ দিনের জন্য পুলিশ রিমান্ডে পাঠায়। আইন যেখানে ব্যক্তিবিশেষকে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতারের ২৪ ঘন্টার মধ্যে কোর্টে হাজির করিতে বাধ্য করে। যখন কোন অভিযুক্তকে তাহার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তথ্যাদি উদ্ঘাটনের জন্য পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া হয় তখন তাহার উপর নির্যাতন করা এক ধরনের নিয়মে পরিণত হইয়াছে। কিন্তু শাসনতন্ত্রের ৩৫ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা হইয়াছে যে, কোন অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তাহার নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদানে বাধ্য করা যাইবে না। এ ব্যাপারে আমাদের শাসনতন্ত্রে জোর খাটানো কিংবা নির্যাতন করাকে জোরালোভাবে নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। উক্ত রায়ে হাইকোর্ট ডিভিশন ব্যাখ্যা দিতে গিয়া বলিয়াছে, যদি কিছু জানিবার সীমিত উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করিবার প্রয়োজন হয় তবে উহা অভিযুক্ত ব্যক্তি জেল হাজতে থাকাকালীন সময়ে করা যাইতে পারে। মাননীয় আদালত পুলিশ হেফাজতে ডিটেনশন দেওয়াকে তোতা পাখির আচরণ হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছে। সুবিচারের দাবি হইতেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি ইচ্ছা করে তবে তাহাকে তাহার আইনজীবীর উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করিতে হইবে যাহাতে সে অপরাধের সহিত সম্পৃক্ততার হাত হইতে সুরক্ষা পাইতে পারে। এই নীতি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলেও অনুসরণ করা হইত। আমরা যদি বিচার ব্যবস্থার এই ঐতিহ্য রক্ষা করিতে না পারি, যেমনটি গণতন্ত্রের অধীনে হওয়া বাঞ্ছনীয়, তাহা হইলে আমরা নিজেদের প্রতি কিংবা শাসনতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দাবি করিতে পারি না। এই ক্ষেত্রে আইনজীবীরা এবং বিচারকরা যে শাসনতন্ত্র ও শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থার অনুকূলে কাজ করিতে পারিতেছেন না, ইহা আমাদের সকলের নিকট দুশ্চিন্তার বিষয়। স্বাধীন দেশে মানুষ স্বাধীনভাবে বিচার পাইবে না তাহা হইতে পারে না। আইনের শাসন থাকিবার অর্থ সুবিচার থাকা। পুলিশি রাষ্ট্রের মতো আইন প্রয়োগকে আইনের শাসন বলে না। বলা হইয়া থাকে, কোর্ট হইতে যদি বিচার না পাওয়া যায় তাহা হইলে বন্দুকের নল হইতে উহা পাইতে হইবে। কিন্তু সেই বিচার তো প্রতিহিংসামূলক। হতাশার সহিত লক্ষ্য করিতেছি যে, আমাদের পুলিশ নিয়মিত রিমান্ড প্রার্থনা করিতেছে এবং আমাদের আদালত সহজেই উহা মঞ্জুর করিয়া যাইতেছে। শাসনতন্ত্রের বিধি-বিধানের সার্বিক উপলব্ধি ও উহা মানিয়া চলিবার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যতীত গণতন্ত্রকে কার্যকর করা সম্ভব নহে। স্বাধীনচেতা ভিন্ন কাহারও পক্ষে স্বাধীনতা ভোগ করা সম্ভব নহে। আমার ভুল হইতে পারে কিন্তু স্মরণ করিতে পারিতেছি না যে, পাকিস্তানি স্বৈরশাসনামলেও কোন রাজনীতিবিদ কিংবা সাংবাদিককে পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া হইয়াছে। সন্দেহ নাই তাহাদের জেলে ডিটেনশনের নির্যাতন সহ্য করিতে হইয়াছে। অন্য সবাই শাসনতন্ত্র মানিতেছেন কিনা ইহা জিজ্ঞাসা করিবার পূর্বে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী নেতৃবৃন্দ নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করুন তাহারা শাসনতন্ত্রের প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধাশীল। তাহারা উভয়ে মিলিয়াই শাসনতান্ত্রিক সুশাসন অসম্ভব করিয়া গণতন্ত্র অচল করিয়া তুলিয়াছেন। নির্বাচন হইল ক্ষমতায় যাইবার বাহন। আর গণতন্ত্র হইল গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের বাস্তবায়ন। আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব হইতেছে শাসনতন্ত্র মানিয়া কার্যক্রম পরিচালনা করা। চরম দুঃখজনক ব্যাপার হইতেছে সবাই আমরা একত্রে গণতন্ত্র ধ্বংস করিতেছি। অসত্ ও দুর্নীতিপরায়ণদের রাজত্ব সৃষ্টি করিয়াছি। যাহাদের নিকট দেশের ধ্বংস সাধন কোন উদ্বেগের বিষয় নহে। আমাদের অনেকেই অসুবিধা দেখিলে বিদেশে চলিয়া যাইবেন এবং সেইখানে গচ্ছিত রাখা সম্পদে বিলাসী জীবন-যাপন করিবেন। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার সুরক্ষা ও সুশাসন উপভোগ করিতে চাহিলে আমাদেরকে সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করিতে হইবে যে, আমরা নতজানু নই। লেখক : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও আইনজ্ঞ