স্মরণ

নাসরিন হক :অবহেলিত ক্ষেত্রগুলোতে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন

আজ মনে পড়ছে ২০০৬-এর ২৬ এপ্রিলের এক সকালের কথা। ধানমণ্ডির একতলার বাসার সামনে বিশাল উঠোন, থই থই করছে মানুষে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এরা। ঘরের মাঝখানে খাটিয়ায় রাখা একটি নীরব-নিথর দেহ। ক্রন্দনরত আপনজন ঘিরে আছে তাকে। সেদিনের খাটিয়ায় রাখা চিরতরে নীরব হয়ে যাওয়া ঐ মানুষটি রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক জগতের কর্মকাণ্ডে তেমনভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না— তবে যথেষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি সচেতন ছিলেন। তিনি ২৪ এপ্রিল আকস্মিক দুর্ঘটনায় প্রয়াত দেশের একজন নিবেদিত প্রাণ উন্নয়নকর্মী, মানবাধিকার কর্মী, নারী অধিকার যোদ্ধা, এ্যাকশন এইডের তত্কালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর স্বনামখ্যাত নাসরিন হক। যিনি সচেতন ও আন্তরিকভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এদেশের অসহায়-নির্যাতিত নারী ও অন্য প্রান্তিক মানুষদের আইনগত অধিকার, নাগরিক ও স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়াই করে গেছেন। ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক, ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স-এর মত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষ করে নাসরিন বিদেশে অবস্থান না করে দেশে ফিরে এসেছিলেন শুধুমাত্র দেশের অসহায়, সুযোগবঞ্চিত, নির্যাতিত নারী-পুরুষের কথা ভেবে। এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আইন তৈরি এবং এসিড আক্রান্তদের সাংগঠনিক এবং ব্যক্তিগতভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের তেল-গ্যাস জ্বালানি রক্ষা আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। দেশের স্বার্থে তার দৃঢ় অবস্থান ছিল বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে। এসব ক্ষেত্রে তার কমিটমেন্ট এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে আজো। আমরা তার গভীর উদ্বেগ লক্ষ্য করেছি তেজগাঁও ফিনিক্স এবং সাভারের স্পেক্ট্রাম গার্মেন্টস ধসে পড়ার পর। তিনি এই সময়ের উদ্ধার কাজে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। উদ্ধার তত্পরতা চালানোর উপযোগী যন্ত্রপাতি না থাকায় তিনি তার সংগঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দুবাই থেকে আনার ব্যবস্থাও করেছিলেন। তার আরো কিছু উল্লেখযোগ্য কাজের প্রতি এই মুহূর্তে আলোকপাত না করলে তাকে জানাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ এবং নারী স্বাস্থ্য ও প্রজনন অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেসাথে এই সংশোধনীর প্রভাবে অন্য ধর্মের মানুষের নিজ দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে যাবার বিষয়টির কথা। তিনি সে বছরই বিজয় দিবসকে সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধে হারানো স্বজনদের স্মরণে শহীদ মিনারে ‘আলোর স্মরণে কাটুক আঁধার’ শিরোনামে মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি প্রবর্তন করেছিলেন। যা এখনও চলছে। নাসরিন হকের মৃত্যুর পর আমি বিভিন্নভাবে নির্যাতিত একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য অনেকের সাথে কথা বলেছিলাম। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে দুর্বার নেটওয়ার্কের করুণা সমাদ্দারের কথা। তিনি বলেছিলেন, নাসরিন আপা আমার জীবনে আলোর দিশারী। আমার যা কিছু অর্জন সবই তার প্রেরণায়। ১৯৯১ সালে যৌনকর্মীদের উচ্ছেদের সময় তিনি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের কাউন্সিলর মেহরুবা মুক্তি বলেছিলেন, ১৯৯৬ সালে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হবার পর তার সহযোগিতা আমার জীবনটা বদলে দিয়েছিল। শুধু আমার নয়, এসিডে আক্রান্ত আমার ছোট বোনের জীবনটাও। সবকিছু ভুলে উঠে দাঁড়িয়েছি আমরা দু’বোন। দুর্বৃত্তরা আমাদের থামাতে পারেনি। যে লাঠিতে ভর দিয়ে আমরা উঠে দাঁড়িয়েছি সেই লাঠি নাসরিন হক আজ হারিয়ে গেছেন কিন্তু লাঠিছাড়া হাঁটার সাহস তিনিই আমাদের দিয়ে গেছেন। নিঃসন্দেহে বলা যায় বহুজনকে বেঁচে থাকার পথ দেখানো নাসরিন হক বেঁচে আছেন এবং থাকবেন তার কাজের জন্য। বেঁচে থাকবেন- জীবন ফিরে পাওয়া, উঠে দাঁড়ানো নির্যাতিত বহু মানুষের মনে। লেখক :সাংবাদিক