[ অ র্থ নী তি ]
সংকটের আবর্তে অর্থনীতি
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২৩
উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিনিয়োগে শ্লথগতি ও বেকারত্ব আমাদের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার কারণে এ সমস্যাগুলোর নিবিড়তা বাড়ছে। ঘনীভূত হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকট। কলে-কারখানায় উত্পাদন হ্রাস পাচ্ছে। রফতানি বিঘ্নিত হচ্ছে। বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে মানুষ। তাতে স্থবির হয়ে পড়ছে দেশের অর্থনীতি। বিভিন্ন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ধারণা এবার জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। ভোগান্তি বাড়বে সাধারণ মানুষের। গত ১০ বছর ধরে আমরা গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছি। তাতে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে দ্রুত হারে। এখনো দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে আমাদের দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। বেকারত্বও আছে উচ্চতর পর্যায়ে। এর মাঝে চলতি অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পাচ্ছে বলে আশংকা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বলছে এবার দেশজ উত্পাদনে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৫.৮ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এর অনুমান তারচেয়েও কিছুটা কম। এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। গত বছর আমাদের অর্জিত প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৩ শতাংশ।
রূপকল্প ২০২১ তথা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২১ এর মূল কথা হলো গতিশীল ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে একটি মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১৩ সালে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে এবং ২০১৭ সালে এই হার ১০ শতাংশে উন্নীত করে ২০২১ সাল পর্যন্ত তা ধরে রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-১৫) প্রণীত হয়েছে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। এ পরিকল্পনা মেয়াদে বছরে গড়ে ৭.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়ার কথা। শেষ দুটো বছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার দেখানো হয়েছে ৮ শতাংশ। চলতি আট বছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ। কিন্তু কৃষি খাতে কাংক্ষিত হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত না হওয়া, রফতানি, দেশজ ভোগ ও বিনিয়োগের চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, অবকাঠামো উন্নয়নের মন্থরতা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেবাখাত মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কোন কোন গবেষকের মতে এবার প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে সর্বোচ্চ ৫.৫ শতাংশ। তাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কর্মসংস্থান কম হবে প্রায় ৮ লক্ষ। অর্ধ বেকারত্ব ও ছদ্ম বেকারত্বের হার বাড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দারিদ্র্য হ্রাসের উপর। বর্তমানে এ দেশে পূর্ণ বেকারত্বের হার শতকরা ৫.১ ভাগ। এর সঙ্গে আছে আংশিক ও ছদ্ম বেকারত্ব। সব মিলে এ দেশে বেকার মানুষের হার শতকরা প্রায় ৩৩ ভাগ। প্রতিবছর দেশে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরো ১৩ লাখ কর্মসংস্থান প্রত্যাশী মানুষ। শিল্প খাতের বন্ধ্যাত্ম এবং সেবা খাতের বাধাসমূহ কাটিয়ে উঠতে না পারলে এতো বেশি নতুন কর্মসংস্থান সম্ভবপর হবে না কিছুতেই। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি মারাত্মক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে আরো একটি কারণে। সেটি হলো বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিক প্রেরণের সংখ্যা হ্রাস। ২০০৭ সালে শ্রমশক্তি রফতানির সংখ্যা ছিল ৮ লক্ষ ৩২ হাজার ৬০৯ জন। ২০১০ সালে তা হ্রাস পায় ৩ লক্ষ ৯০ হাজার ৭০২ জনে। সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক রফতানির সংখ্যা হ্রাস পাওয়াই এর মূল কারণ। সম্প্রতি বৈশ্বিক মন্দা কিছুটা শিথিল হয়ে আসছে। তাতে বাংলাদেশি শ্রমশক্তি রফতানির সুযোগ প্রসারিত হচ্ছে। গত দুই বছরে আমাদের শ্রমশক্তি রফতানির সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। ইদানীং বাংলাদেশ থেকে ৪ লক্ষ শ্রমিক আমদানির জন্য চুক্তি করেছে মালয়েশিয়া। তাছাড়া হংকং-এর সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ১ লক্ষ মহিলা শ্রমিক রফতানির জন্য। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এ অভিগমন প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করছে।
দেশের অভ্যন্তরে শ্রম শক্তি নিয়োগের প্রধান খাত হচ্ছে বস্ত্র ও গার্মেন্টস খাত। কর্মজীবী মহিলাদের অধিকাংশই এই খাতে নিয়োজিত। এ খাতে মজুরির হার বিশ্বের সবচেয়ে নিম্নতম। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতা বেশি। বর্তমানে এ খাতের অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ ও অন্তর্ঘাত উত্পাদন ব্যাহত করছে। ঘন ঘন হরতালের কারণে সময়মতো প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদেশি ক্রেতারা তাতে উত্সাহ হারাচ্ছে। ফলে এ খাতের সম্প্রসারণ বিঘ্নিত হচ্ছে। তাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধির উপর। দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্নীতি, দুর্বল অবকাঠামো, অপ্রতুল গ্যাস ও বিদ্যুত্ সরবরাহ আমাদের পুরো শিল্পখাতের বিকাশকেই বিঘ্নিত করছে। বিনিয়োগ হচ্ছে নিরুত্সাহিত।
আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে বিনিয়োগের হার হওয়া উচিত জিডিপির ন্যূনপক্ষে ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে বিনিয়োগ করা হচ্ছে জিডিপির মাত্র ২৫.৪ শতাংশ। এর ৬.১ শতাংশ বিনিয়োগ হচ্ছে সরকারি খাতে এবং ১৯.১ শতাংশ বিনিয়োগ হচ্ছে বেসরকারি খাতে। চলতি বছর তা আরো হ্রাস পেতে পারে। আমাদের দেশে বিনিয়োগ কম হওয়ার একটি প্রধান কারণ ছিল বিদ্যুত্ সরবরাহের অনিশ্চয়তা। তবে গত ২ বছরে তার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তার অনেকটাই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রের গোলক ধাঁধায় বাঁধা। যেখানে আছে স্বচ্ছতার অভাব, দুর্নীতির অভিযোগ। বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার ছিল রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রের ওপর থেকে দ্রুত নির্ভরতা কমিয়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কয়লাভিত্তিক বৃহত্ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন ও তার উত্পাদনের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি করা। এ লক্ষ্যে আমাদের অর্জন হয়েছে খুব সামান্যই। গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে যথেষ্ট। সর্বোপরি আছে আমাদের ক্ষয়িষ্ণু ভাবমূর্তি। হরতাল, রাজনৈতিক হানাহানি ও দুর্বৃত্তয়ানকে রহিত করা সম্ভব না হলে আমাদের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করা যাবে না। তাতে আকৃষ্ট হবে না বিদেশি বিনিয়োগ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদান দারুণভাবে হ্রাস পেয়েছে বাংলাদেশে।রাজনৈতিক অস্থিরতা ছাড়াও সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অদক্ষতা ও অকর্মন্যতা এর জন্য দায়ী হতে পারে। অতিসম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পর পর তিন জন বাংলাদেশি বিকল্প পরিচালকের পদায়ন আমরা লক্ষ্য করেছি। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির কোন সফলতা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। অবশেষে যারা জনপ্রশাসন থেকে বহিঃসম্পদ বিভাগে এবং সেখান থেকে বিশ্বব্যাংকের সদর দফতরে গিয়ে নিয়োজিত হলেন, ব্যক্তিজীবনে তাদের অনেক চমক থাকলেও পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে তাদের কারিশমা কোন কাজে লাগাতে পারলেন না। এখন প্রশ্ন জাগে, প্রথাগত ব্যুরক্রেসি দিয়ে অর্থনৈতিক কূটনীতির কাজটি করানো সঠিক কি না? নাকি এর জন্য ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির জ্ঞানজাগতিক লোক দরকার?
ইতিমধ্যেই সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নেই নির্মাণ করা হবে পদ্মা সেতু। এটি একটি সাহসিক কাজ। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন যে কোন নাগরিক সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাবে। চলতি অর্থবছর এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১ হাজার ৫শত কোটি টাকা। আগামী আট বছরে এ বরাদ্দ হবে ৬ হাজার ৮শত ২৫ কোটি টাকা। এটা হবে মোট বাজেটের প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ। অনুত্পাদনশীল খাতের বরাদ্দ ও ভর্তুকি কমিয়ে এবং চুরি-চামারি হ্রাস করে অনায়াসেই এ পরিমাণ অর্থের সংস্থান করা সম্ভব। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, পদ্মা সেতুর বরাদ্দ বৃদ্ধির অজুহাতে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ কাট-ছাঁট করা না হয়। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রত্যাশা সফল হবে না। স্বাচ্ছন্দ্য আসবে না মানুষের জীবনে।
আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য খাত হচ্ছে কৃষিখাত। ভাল আবহওয়ার কারণে গত চার বছর ফসলের উত্পাদন বেশ ভাল হয়েছে। প্রবৃদ্ধির হার ছিল মোটামুটি ভাল। শহরকেন্দ্রিক সেবা ও শিল্পখাতে রাজনৈতিক অস্থিরতা যত বেশি নীতিবাচক প্রভাব ফেলে, কৃষিখাতে তত বেশি পরিলক্ষিত হয় না। তবে হরতাল হলে সার, বিজ ও তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। পানি সেচ বাধাগ্রস্ত হয়। কৃষিপণ্যের বাজার হয়ে পড়ে স্পর্শকাতর। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অদূরদর্শী হলে বেড়ে যায় উপকরণ মূল্য, কিন্তু সে তুলনায় উত্পাদিত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি না পেলে কৃষকের মুনাফা হ্রাস পায়।
উত্পাদনে উত্সাহ হারায় কৃষক। এরূপ একটা লক্ষণ দেখা গেছে চলতি মৌসুমের বোরো ধান উত্পাদনে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসেব অনুসারে গত বছরের তুলনায় বোরো ধান চাষের এলাকা ২৮ হাজার হেক্টর কমে গেছে। এর মূল কারণ গত আমন মৌসুমে ধানের ন্যায়সংগত মূল্য না পাওয়া এবং ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেচের খরচ বৃদ্ধি পাওয়া। গত আমন মৌসুমে কেজিপ্রতি আমন চালের সংগ্রহ-মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৬ টাকা। এ সংগ্রহ-মূল্য ছিল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক নিচে। এর আগে ২০১০-১১ সালের আমন মৌসুমে সরকার প্রতিকেজি ধানের মূল্য নির্ধারণ করেছিল ২৯ টাকা। এরপর ২০১১-১২ সালে তা নির্ধারণ করা হয় ২৮ টাকা। এবার তা ২ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৬ টাকা। পক্ষান্তরে, এ সময় কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে। বেড়েছে তেলের দাম ও শ্রমিকের মূল্য। তাতে বেড়েছে ধানের উত্পাদন খরচ। কিন্তু সে তুলনায় ধানের দাম না পাওয়ায় অনেক লোকসান দিয়েছে কৃষক। এর পর পানি সেচের জন্য ব্যবহূত ডিজেলের মূল্য আরো এক ধাপ বেড়েছে। তাতে নিরোত্সাহিত হয়ে সেচ নির্ভর বোরো ধানের আবাদ কমিয়ে দিয়েছে কৃষক।
গত বছর বোরো ধানের অধীনে আবাদকৃত জমির পরিমাণ ছিল ৪৭.৮০ লাখ হেক্টর। এবার তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭.৫২ লাখ হেক্টরে। বৃষ্টির অভাব ও সেচের পানির অপ্রতুলতায় এবার বোরোর ফলনও আশানুরূপ হবে বলে মনে হচ্ছে না। ইতিমধ্যে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিশ্বের খাদ্যোত্পাদন প্রায় পৌনে তিন শতাংশ কমে গেছে। বিশ্ববাজারে বেড়ে গেছে চাল ও গমের দাম। বর্তমানে টনপ্রতি চালের দাম ৫৬৫ ও গমের দাম ৩২২ মার্কিন ডলার। এর প্রভাব এসে পড়েছে আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে। সরকারি গুদামগুলোতে এখন প্রায় ১২ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজারে চাল ও গমের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগতভাবে। গ্রামাঞ্চলে এখন মোটা ও মাঝারি চাল বিক্রি হচ্ছে ১২ থেকে ১৩ শত টাকা মণ। এরই মাঝে সরকার বোরো চালের সংগ্রহ-মূল্য নির্ধারণ ধরে দিয়েছেন কেজি প্রতি ২৯ টাকায়। গত বছর তা নির্ধারিত ছিল প্রতিকেজি ২৮ টাকা। এবার ডিজেলের মূল্য বেড়েছে ১১.৪৭ শতাংশ। সে তুলনায় সরকার নির্ধারিত বোরো চালের সংগ্রহ-মূল্য বৃদ্ধির হার অনেক কম। এটা কৃষকের জন্য চাষাবাদে অনাগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাধাগ্রস্ত করতে পারে কৃষির প্রবৃদ্ধি তথা জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধিকে। এতদিন আমাদের মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা প্রশমিত ছিল। এখন তা বাড়তে শুরু করেছে। গত মার্চ মাসে তা ৭.৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পণ্য বিপণনে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ও বিশ্বমন্দার কারণে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা নমনীয় থাকায় বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে। এখন যারা বিশ্বের মূল্যস্ফীতির গড় হার ৪.২ শতাংশ। উন্নত বিশ্বে তা ২.২ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে তা ৫.৫ শতাংশ। সে তুলনায় বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার বেশি। এখন ঘন ঘন হরতালের কারণে তা আরো বাড়তে পারে। এতে অর্থনৈতিক সংকট আরো ঘনীভূত হবে।
গত মার্চ ও চলতি এপ্রিল মাসে ঘন ঘন হরতাল ও অবরোধের কারণে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। বাধাগ্রস্ত হয়েছে পণ্য পরিবহন, কৃষি ও শিল্পের উত্পাদন ও রফতানি। মুখ থুবড়ে পড়েছে নির্মাণ ও সেবাখাত। এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন হরতালে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। সেসঙ্গে কাজের সুযোগ হারাচ্ছে অসংখ্য দিনমজুর মোটে ও পরিবহন শ্রমিক। অনুষ্ঠানিক পাঠ গ্রহণ ও পরীক্ষা দান থেকে বিরত থাকছে লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রী। এ নিয়ে তুখোড় আলোচনা হচ্ছে সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে। পর পর বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এখনো কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পক্ষান্তরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। সমঝোতার পরিবর্তে বিভেদ বাড়ছে। ক্রমেই দুটো বিবদমান শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ছে দেশের অধিকাংশ মানুষ।
সাম্প্রতিক শেয়ার মার্কেটে ধস, লুটপাট ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট, উচ্চ সুদের হার ও আর্থিক কেলেংকারী আমাদের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক সংকট ও দুর্বৃত্তায়নজনিত আমাদের ক্ষয়ীষ্ণু ভাবমূর্তির কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমতাবস্থায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। যদিও চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫.৫ থেকে ৬ শতাংশ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য তা মোটেও যথেষ্ট নয়। চলতি অর্থবছরে এশীয় দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধির হার ৬.৬ শতাংশ, ভারতের ৬.৫ শতাংশ এবং চীনের ৮.২ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সে তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হ্রাস সম্পর্কে ইদানীং যে পূর্বাভাস আসছে তা হতাশাব্যঞ্জক। এর প্রতিকার হিসেবে সর্বাগ্রে রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান দরকার। রাজনৈতিক অস্থিরতাজনিত উত্কণ্ঠার একটা স্থায়ী পরিসমাপ্তি টানা দরকার। মানুষ যাতে তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা দরকার। এ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার দায়িত্ব দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের।
লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও প্রাবন্ধিক