আলোকপাত

শুভ চিন্তার উদয় হোক

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের বর্তমান অবস্থা ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই ক্ষমতায় আরোহণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের দাবি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। এদিকে সরকার এই প্রস্তাব মানতে রাজি না হয়ে তাদের অধীনেই নির্বাচন দিতে চায়। তাই বিরোধী দল হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। হরতালের সাথে ঘটছে গাড়ি ভাংচুর, সম্পদে আগুন ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক ও জ্বালাও-পোড়াও কর্মকাণ্ড ও মানুষের প্রাণহানি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বড় দুই দলের অহেতুক সংঘাতময় আচরণের কারণে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এটাতো জনগণের কাম্য ছিল না। দেশে চলছে সংঘাত, সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি। কোন কোন রাজনীতিবিদের পরোক্ষ সহায়তায় দেশে দুর্নীতি, লুট, অর্থ পাচার প্রকট আকার ধারণ করেছে। শেয়ার বাজার কেলেংকারি এবং হলমার্ক, ডেসটিনি, পদ্মাসেতু দুর্নীতি ইত্যাদি তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। অনবরত সংঘটিত হরতাল, ধর্মঘট, বিক্ষোভ, অবরোধের মত কথিত রাজপথের হাতিয়ারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ও তাণ্ডব সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। দেশে এখন জনসাধারণের জানমালের কোন নিরাপত্তা নেই। মানুষ অহরহ হরতালের বিভীষিকাময় আতংকে ভুগছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত। দেশে ঘন ঘন হরতাল ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতি ধ্বংসের পথে। রপ্তানিমুখী শিল্প, ব্যাংক, বীমা, পরিবহন, মানবসম্পদসহ সকল ক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা। রপ্তানিখাতের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তৈরি পোশাক শিল্প। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী কয়েকমাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের রপ্তানিযোগ্য পোশাক আটকে গেছে। তা’ছাড়া, বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করছে। কিছুদিন পূর্বে রাশিয়া থেকে আগত কয়েকজন ক্রেতা হরতাল-বিক্ষোভের কারণে বিমানবন্দর থেকে ফেরত চলে যায়। নিরাপত্তার অভাবে আতংকগ্রস্ত হয়ে বিদেশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা ফিরে যাচ্ছেন। কিন্তু সরকার বা বিরোধী কোন দলেরই এতে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। তাদের চাই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ ও ক্ষমতা দখলের প্রয়াস। সরকার ও বিরোধী দুই দলের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্টি হয়েছে শাহবাগ জাগরণ মঞ্চের ও তাদের ছয় দফা আন্দোলনের কর্মসূচি। এর পাল্টাপাল্টি আবির্ভূত হয়েছে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন ও তের দফা দাবির কর্মসূচি। শাহবাগ চত্বরের গণজাগরণের বিপরীতে জন্ম নিল শাপলা চত্বরের জমায়েত- ক্রিয়ার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া। সর্বশেষ জেগে উঠেছে আহালে সুন্নী নামে আরও একদল নব কর্মসূচি নিয়ে। এভাবে সংঘাত চলতে থাকলে দেশের ভবিষ্যত্ কি হবে- তা সহজেই অনুমেয়। দেশে চলমান আন্দোলনের মূল ইস্যু বিরোধী দলের দাবি আগামী জাতীয় নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু ক্ষমতাশীন দল কোন অবস্থাতেই তাতে রাজী নয়। এতদুদ্দেশ্যে সংসদে আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হলো আদালতের রায়ের অজুহাত দেখিয়ে। কিন্তু আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ে এটাও বলেছিলেন যে, আগামী দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারবে। সরকার তাদের জন্য রায়ের সুবিধাজনক অংশটুকুর সদ্ব্যবহার করে সংসদে আইন পাস করে নিলেন এবং রায়ের অন্য বিকল্প কথাটা সযত্নে উপেক্ষা করে গেলেন। যাহোক, উদ্ভূত কঠিন পরিস্থিতিতে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক্ষণে সরকার ও বিরোধীদল উভয়পক্ষের সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় উপনীত হওয়াটাই সংকট উত্তরণের একমাত্র উপায়। ইতিমধ্যে টি আই বি নির্বাচনকালীন সরকারের এক রূপরেখা উপস্থাপন করেছে। দেশের বিশিষ্টজন/বুদ্ধিজীবীরাও সংকট উত্তরণের ব্যাপারে কিছু ফর্মূলা দিয়েছেন। চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে সংলাপের উপর গুরুত্ব আরোপ করে সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক কিংবা অন্তর্বর্তী- যে নামেই হোক না কেন নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। বিশিষ্টজনেরা অভিমত প্রকাশ করেছেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ নির্দলীয় সরকারের পক্ষে। তাই অবিলম্বে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে দেশের অবস্থা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এমতাবস্থায় যদি সরকার ও বিরোধীদল দু’পক্ষই জেদের বশবর্তী হয়ে আপোষহীন মনোভাব নিয়ে অটল থাকে- তবে জনগণই ঠিক করবে কোন প্রক্রিয়ায় তাদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এজন্য গণভোট অপরিহার্য বলে আমি মনে করি। লেখক :ভাষাসৈনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ই-মেইল :lnshamsulhuda@gmail.com