ইহারা কি ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া যাইবে?

সাভারে ভবন ধসের ঘটনায় সারা জাতি আজ শোকবিহ্বল। এত দায়িত্বহীনতা, এত ফাঁকিজুঁকি, এত অবহেলা আমাদের মতো দেশেই বোধকরি সম্ভব কেবল! এখানে আর সব কিছুর মূল্য থাকিলেও মানুষের জীবনের বোধকরি কোন মূল্যই নাই। তাই মানুষের জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলিবার এতরকমের ব্যবস্থা নিত্যদিনই আমাদেরকে অসহায় নেত্রে দেখিতে হয় এবং মাথানত করিয়া মানিয়া লইতে হয়। সাভারের এই হিউম্যান ট্র্যাজিডিটি এই জাতীয় মর্মান্তিক ঘটনার প্রথম নিদর্শন নহে। ইতোপূর্বে এই সাভারেই কর্তৃপক্ষীয় ঔদাসীন্য ও গাফিলতিতে গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শতাধিক হতভাগ্য মানুষের প্রাণপ্রদীপ নিভিয়া গিয়াছে। ভবন ধসিয়াও প্রাণহানি ঘটিয়াছে অনেক। কিন্তু এইসব দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হইতে আমরা কিছুই শিখি নাই। আমরা এই ধরনের ঔদাসীন্য, অবজ্ঞা, উপেক্ষা বা অবহেলাকেই বরং শিরোধার্য জ্ঞান করিয়া ফিরিয়াছি। সাভারের ঘটনায় কর্তৃপক্ষের যে অমানবিকতা এবং মানুষের প্রতি যে চরম অমর্যাদা লক্ষ্য করা যায় উহার প্রতিকার কি? আমাদের দেশে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াইবার কেহ আছে কি? যুগের পর যুগ আমরা সাধারণের প্রতি অবহেলা, অযত্ন ও নিষ্ঠুরতা দেখিয়া আসিতেছি—সমাজ উহার প্রতিকার চাহিয়া অপরাধীকে বিচারার্থ সোপর্দের দাবি জানাইয়া ফিরিয়াছে, কিন্তু উহাতে কখনই কোন লাভ হইয়াছে কি? উন্নত দেশ হইলে সাভারের ভবন ধসের ঘটনার পর পরই ভবনটির মালিক গ্রেফতার হইয়া যাইতো। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যে ত্রুটি বা নকশাবিদ কিংবা প্রকৌশলীর অবহেলা ইত্যাদি থাকিলে এই সব বিষয় সর্বাধিক গুরুত্বই শুধু পাইতো না ইহাদের অবহেলার ব্যাপারে তাত্ক্ষণিক কিছু ব্যবস্থাদিও গৃহীত হইতো। আমাদের দেশে প্রায়ই লঞ্চ দুর্ঘটনায়, ভবন ধসিয়া কিংবা ভবনে বা বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে, সড়ক দুর্ঘটনায় বা অন্য কোন ধরনের দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয় অথচ এই সব নারকীয় ঘটনার জন্য যাহাদের অবহেলা, ঔদাসীন্য কিংবা অবিমৃষ্যকারিতা দায়ী তাহারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া যায়। কেননা, যে যখন ক্ষমতাসীন থাকে তখন সেই ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ কিছু বশংবদ তৈরি করে তাহাদেরকে নানাবিধ অবৈধ সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে। আর এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভকারীরা তাহাদের প্রভুদের পৃষ্ঠপোষকতা পাইয়া ধরাকে সরা জ্ঞান করিতে শেখে। প্রশাসন, পুলিশ মায় সকল কর্তৃপক্ষই ইহাদের দাপটে চোখ-কান বুঁজিয়া থাকিতে বাধ্য হয়। ফলে, অন্যায় অপরাধ করিয়াও বহাল তবিয়তে থাকিয়া যাইতে ইহাদের কখনই কোন অসুবিধা হয় না। ইহারা জানে যে, যত অপরাধই তাহারা করুক না কেন এ জন্য কখনই তাহাদের বিচার হইবে না। ক্ষমতায় থাকাকালে ক্ষমতার দাপট দেখাইয়া ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে একপ্রকার বশীভূত করিয়া যাহারা সজ্ঞানে মানুষের প্রতি সীমাহীন নিষ্ঠুরতা চালায় তাহাদের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন, বিচার-আচার সব কিছুকেই ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতে দেখিয়া প্রমাদ না গণিয়া পারা যায় কী! সাভারে রানা প্লাজা ধসিয়া পড়িল। উহাতে বিপজ্জনক ফাটল ধরিয়াছে সে কথা আগেভাগে জানা সত্ত্বেও নিরীহ শ্রমিকদেরকে সেই ভবনেই কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা ক্ষমাহীন অপরাধ বৈ নহে! দুই শতাধিক মানুষের লাশ উদ্ধার হইয়াছে, অগুণতি মানুষের মৃতদেহ সম্ভবত বিধ্বস্ত ভবনের ইট, খাম্বা, সিমেন্টের নিচে চাপা পড়িয়া রহিয়াছে। কত মানুষের প্রাণ এই ঘটনায় ঝরিয়া পড়িয়াছে উহার সঠিক সংখ্যা আদৌ জানা যাইবে কিনা কে জানে! হতভাগ্য অনেক মানুষ হয়তো চিরকালের জন্য ঐ ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মিশিয়া গিয়াছে। তাহাদের স্ত্রী-স্বামী-সন্তান-পিতা-মাতা কেহই আর কোনদিনই ঐ প্রিয়জনদেরকে কাছে পাইবে না। এই যে মর্মান্তিক ও হূদয়বিদারক বিষয় ইহা কি কোনদিনও ঐসব নিষ্ঠুর কর্তৃপক্ষের মনে সামান্যতম রেখাপাত করিবে না? তাহারা কি কোনদিনই তাহাদের দায়িত্ববোধ, কর্তব্যজ্ঞান এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করিবে না? আমাদের অভিজ্ঞতা বলে— না, করিবে না। কেননা, এই দেশে শতসহস্র জঘন্য অন্যায় করিয়াও অনায়াসে পার পাইয়া যাইবার সুবন্দোবস্ত রহিয়াছে যে! সুতরাং তাহাদের ঠেকায় কে? শাসকদের বশংবদ রূপে ও শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাহারা বীরদর্পে এই সকল অন্যায়-অবহেলা করিয়াই যাইবে আর মেহনতী মানুষ তাহাদের ঐ অন্যায়ের যাঁতাকলে নিষ্পিষ্টই হইতে থাকিবে। ইহাই বুঝি তাহাদের বিধিলিপি! কিন্তু শাসকেরা ভুলিয়া যায় যে, শাসিতরাও অনেক সময় ঘড়ির কাঁটা উল্টাইয়া দিবার সামর্থ্য রাখে, অন্তত ইতিহাসতো তাহাই বলে।