আলোকপাত

প্রসঙ্গ :সাভার ট্রাজেডি

‘বাঁচান! আমাদেরকে বাঁচান! আমরা পঁচিশ তিরিশ জন এখনও বাঁইচা আছি ভাই রে!’ ‘পানি! পানি দাও! অক্সিজেন দাও! ভেতরে অনেকে বাঁইচা আছে! ‘দুইটা গ্রীল কাইটা আমাদেরকে বাইর করছে! ঐ জানালার গ্রীল কাটুন! ওখানে তিরিশ জন আপু কাজ করছিল!’ ‘ও আল্লাহ্! চারিপাশে শুধু লাশ! আমার বোইনটারে আপনারা বাইর করেন!’ ‘অনেক মানুষ! মাইনষেরে জিন্দা আছে! ওগো বাঁচান! আল্লাহ্ রে! আমার বোন আর নাই রে!’ ‘আমার বউ কই ! পাঁচ মাস হইল আমার বিয়া হইছে ভাই! আমি কেন বাঁইচা আইলাম!’ ‘কামে আইতে চাই নাই ভাইগো! মালিকে কইছে কিস্সু হইব না! বাঁচা-মরা আল্লাহ্র হাতে!’ উপরোক্ত সংলাপ কোন গল্প, উপন্যাস, নাটক বা চলচ্চিত্রের নয়। নয় নতুনভাবে শোনা কোন আর্তনাদ বা আকুতি। আমরা এর আগেও শুনেছি বহুবার। আবারও শুনলাম একবার ২৪ এপ্রিল। তফাত্ হল এবারের ভয়াবহতা, বিভীষিকা, মৃতের সংখ্যা অতীতকে ছাড়িয়ে গেছে। পাঠক, ভবন ধসে, ভবন পুড়ে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিথর দেহ, ক্ষত-বিক্ষত দেহ, ছাই দেহ দেখবার অভ্যাস আমাদের হয়েছে, হচ্ছে আমাদের অচলায়তন রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। যার মাঝে অর্থলোভী পিশাচ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, দুর্নীতি, অপরাজনীতি, অপসংস্কৃতির বিকাশ ঘটে এবং এসব অপরিশুদ্ধ বিষয়গুলো আবার ক্ষমাযোগ্য হয়ে ওঠে দলীয় রাজনীতির উর্বরতায়। বেশ ক’বছর আগে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ধসে পড়ায় এমন এক বর্ণনাতীত নির্মম ঘটনায় একটি লেখা লিখেছিলাম, যার শিরোনাম ছিল, ‘ওরা শুধুই লাশ হয়’। আজ এই লেখার কোন শিরোনাম খুঁজে পেলাম না। স্তম্ভিত হয়ে পড়েছি! পুনরাবৃত্তির একটি বৈশিষ্ট্য হল ধীরে ধীরে তার সংবেদনশীলতা কমে যায়। হয়ত এভাবে একদিন আমরা আবেগ শূন্য জাতিতে পরিণত হব। ২৩ এপ্রিল বেশক’টি চ্যানেলে রানা প্লাজার দুরবস্থার সংবাদ প্রচারিত হয়। দেয়ালে ফাটল দেখায়, পিলার ধসে পড়ায় বের হবার সময় দু’জন আহত হয় সেই সংবাদও প্রচার হয়। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সরকার, প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সাধারণ মানুষ সকলেই সংবাদমুখী হয়ে থাকেন। কেউ এই সংবাদ জানেন না, শুনেননি এমন দায়সারা উত্তর দেবার কোন সুযোগ এখানে নেই। মর্মান্তিক, লোমহর্ষক, বিভীষিকাময় এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারে এমন আভাসতো সংবাদকর্মীরা জানিয়েছিল! গার্মেন্টস মালিকদের এসোসিয়েশন? শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগঠন, সংস্থা? নেতা? দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সম্ভাব্য দুর্ঘটনার পূর্বে আমরা কাউকে তত্পর হতে দেখিনি, দেখিনা। এদেশের ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায় হল শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষদের জীবন রক্ষার জন্য কোন পূর্ব প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনা, সতর্কতা, সাবধানতা থাকে না। যা থাকে তা হল মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পতিত হবার পর রাষ্ট্র, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষগুলোকে প্রদর্শনযোগ্য উদ্ধার কাজে লিপ্ত হওয়া। আবার কখনও চলে রাজনৈতিক ফায়দা লুটবার এক হীন প্রচেষ্টা ও প্রতিযোগিতা। চলে মৃতকে সুলভ দরে পুনর্বাসন করবার তত্পরতা! আর তাই শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকি রোধ নয়, বরং মৃত শ্রমিকের সত্কার তত্পরতাই এ দেশের এক উল্লেখযোগ্য ও নির্মম বাস্তবতা। এবারও তাই হল। সবাই ছুটে গেলেন আমরা দেখলাম। মন্ত্রী, প্রশাসন, কর্তৃপক্ষ সব্বাই অধীর, মর্মাহত এবং প্রতিবাদী! মন্ত্রীদের একজন দ্বিধাহীনভাবে বললেন, যে দলেরই হোক লোভী, পিশাচ ব্যবসায়িকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী কার উদ্দেশ্যে এ দাবি রাখলেন ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে। সাধারণ মানুষের কাছে কি, যারা সর্বপ্রথম উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে? প্রশ্ন জাগে, ফাটল ধরা ভবনে কিভাবে, কাদের নির্দেশে, কাদের উদাসীনতায় শ্রমিকেরা কাজ করতে শুরু করল! কেন শ্রমিকেরা বার বার পুড়ে ছাই হবে? কেন ভবন ধসে শ্রমিকেরা বীভত্স মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে বারংবার? কিংবা এমন ভবন নির্মাণের বৈধতা কিভাবে স্বীকৃত হয়? এ প্রশ্নের উত্তর বোধহয় কাউকেই রেহাই দেয় না। আর সে কারণে ‘দায়’ কাঁধে নেবার সত্ সাহস আমাদের হয় না। বিরোধী দল এই দুর্ঘটনায় শোকাভিভূত হয়ে দিবসের মধ্যাহ্নে তাদের হরতাল প্রত্যাহার করেছে। রাজনৈতিক এই দয়া প্রদর্শন আরেক ধরনের প্রহসন, পরিহাস মাত্র। হরতাল, অবরোধ, সভা-সমাবেশের মত রাজনৈতিক কর্মসূচির শিকার হন, ব্যবহূত হন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো। যারা জেগে ঘুমায় তাদের কেউ জাগাতে পারবে না। এখন সময় এসেছে সাধারণ মানুষের জেগে উঠার। লেখক :উন্নয়নকর্মী