আলোকপাত
সাভার ট্রাজেডি :এরকম যেন আর না ঘটে
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০১৩, ২০:৪৭
সাভারে রানা প্লাজা ধসে প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা দেখে অশ্রু সংবরণ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। অনবরত মস্তিষ্কের অনুভবে শিহরিত হয়ে উঠছি। আমাদের অস্তিত্বে ও শিকড়ে একটি বড় টান অনুভব করছি। আমরা কী হারালাম, কেন হারালাম, কতটুকু হারালাম—এই কথাগুলো হূদয়ে তোলপাড় করে তুলছে। দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত মানুষের প্রতি সমবেদনা জানাবার ভাষা জানা নেই। পুরো জাতি যখন এই শোকে বিহ্বল তখন এক শ্রেণির রাজনীতিবিদ ফায়দা লোটার ধান্দায় নিমগ্ন। এই সংকীর্ণ মন-মানসিকতা থেকে জাতি কবে কলঙ্কমুক্ত হবে কেউ বলতে পারে না। একজন প্রসিদ্ধ মন্ত্রী বললেন, স্তম্ভ ধরে ঝাঁকুনি দেয়ায় ভবন ধসে পড়েছে। কী দুর্ভাগা আমাদের এই দেশ। আর একজন নাকি বললেন সোহেল রানা লীগের কেউ নন। আমরা তো এসব সার্টিফিকেট চাই না। আমরা চাই ইমারতটি ধসের পিছনে যারা দায়ী তাদের উপযুক্ত শাস্তি হোক; এমন শাস্তি হোক যেন ভবিষ্যতে কেউ আর এ ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হয়। হতে পারেন তিনি প্রকৌশলী, হতে পারেন তিনি স্থপতি, হতে পারেন তিনি ভবন মালিক কিংবা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া এই ঘটনা তো দেশে এই প্রথম নয়, গত কয়েক বছরে এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে এবং হতাহতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় কোন ঘটনাতেই কারো টনক নড়ে না। কয়েকটা তদন্ত কমিটি গঠন ছাড়া আর কোন ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন কখনোই দেখতে পাইনি।
আমরা আসলে আস্থা হারিয়ে ফেলেছি নাকি আস্থা রাখার স্থান হারিয়ে ফেলেছি বুঝতে পারি না। দেশের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ ও বর্জনের বিষয়টি এখন সর্বজনবিদিত। বিরোধীদলের নেতারাও এমন বিবৃতি দিচ্ছেন যেন সরকার এই ঘটনা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটিয়েছে। মূলত সরকারের সঠিক সমালোচনা করতে তারা বারবারই ব্যর্থ। আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বলতে পারি, যেখানে সেনাবাহিনী, র্যাব সদস্য, পুলিশ সদস্য, ফায়ার ব্রিগেড সদস্যসহ প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের লোকজন উদ্ধার তত্পরতায় নিয়োজিত আছেন এবং তাদের উদ্ধার তত্পরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু কেন রাতের বেলা সরকারকে জনগণের উদ্দেশ্যে বলতে হয়, আপনারা টর্চ লাইট নিয়ে আসুন। দিন ফুরোলে রাত হবে, রাতেও উদ্ধার তত্পরতা চালাতে হবে—এই সাধারণ বিষয়টিও কি সরকারকে মনে করিয়ে দিতে হবে? শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ আলোকিত করার দায়িত্ব সরকার নিতে পারে আর এখানে দু’ একটি জেনারেটর স্থাপন করার ক্ষমতাও কি নেই? টিভিতে সরাসরি দেখলাম সাধারণ জনগণ ধসে পড়া ভবনের ভেতর থেকে লাশ অথবা জীবিত মানুষকে উদ্ধার করে এনে সেনাসদস্য বা ফায়ার ব্রিগেডের হাতে তুলে দিচ্ছে, তারা এম্বুলেন্সে উঠিয়ে পাঠাচ্ছে। একটি দৃশ্য দেখে ভীষণ কেঁদেছি, সেটা এখানে তুলে ধরছি। উদ্ধারকারীরা ভেতর থেকে একজন মহিলাকে জীবিত উদ্ধার করে এনে দিলে মহিলাটি আশ্রয় বা অবলম্বন হিসেবে একজন সিভিল পোশাকধারী অফিসারের হাত জাপটে ধরে ফেলেন, অফিসারটিও তার হাত ধরেন। এভাবে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকেন— একসিঁড়িতে অফিসারটি ও সঙ্গীরা এবং অন্য সিঁড়িতে মহিলাটি ও উদ্ধারকর্মীরা। এক পর্যায় এসে অফিসারটির সিঁড়ি দিয়ে আর নামার সুযোগ নেই কিন্তু আহত মহিলাটি তার হাত ছাড়ছেন না। এই অবলম্বন যে কী কষ্টের, কী দুঃখের তা বুঝা গেল যখন অন্য আরেকজন এসে মহিলাটির হাত ছাড়িয়ে নিজের হাতে ধরিয়ে দিলেন। এখানেই পরিচয় মিলল মানুষ আর মানবতার। আমরা এই মানবতার কথাই বলতে চাই, আমরা এই মানবতাকেই স্যালুট জানাই। কোন রাজনীতি যেন এই মানবতাকে বিপন্ন না করে, এই মানবতাকে ধ্বংস না করে।
লেখক :শিশুসাহিত্যিক