তথ্যপ্রযুক্তি খাত :এখনও সম্ভাবনার হাতছানি
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৩
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতটির সম্ভাবনার কথা বহুদিন ধরিয়াই শোনা যাইতেছে। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচিও তাহার সহায়ক উদ্যোগ হিসাবে আবির্ভূত হইয়াছে। কিন্তু এই খাত হইতে এখনও আশানুরূপ অর্থনৈতিক অনুরণন দেখা যায় নাই। কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প, শ্রমবাজার হইতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এখনও অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতটি সম্ভাবনা লইয়া এখনও আশা দেখাইতেছে। ইহার মধ্যে সফটওয়্যার ও আউটসোর্সিং আজ কেবল সম্ভাবনাই নহে, কিছুটা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখিয়া চলিতেছে অর্থনীতিতে। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হইলো জনগোষ্ঠীর মধ্যকার বৈষম্য বা ডিজিটাল ডিভাইড আর স্বল্প গতির ইন্টারনেট।
বিলম্বে হইলেও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে সফটওয়্যার খাতটিতে ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিয়াছে দক্ষ জনশক্তি ও সচেতনতা। সৃজনশীল মেধা ও কারিগরি জ্ঞানের সমন্বয় ঘটে সফটওয়্যার শিল্পে। এ শিল্পের জন্য বিরাট কারখানা, দামি যন্ত্রপাতি ইত্যাদির কিছুই প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় দক্ষ জনশক্তি ও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা। দেশে সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে কপিরাইট আইন হইয়াছে, কিন্তু ইহার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত হয় নাই। ইহাতে মেধার মূল্যায়ন হইতছে না এবং এই শিল্পে জড়িত ব্যক্তিবর্গ ক্ষতির মুখে পড়িতেছেন। ইহাতে উদ্যোক্তারা উত্সাহ হারাইয়া ফেলিতে পারেন। পাইরেসির সংক্রমণ এই শিল্পকে ধ্বংস করিয়া দিতে পারে। তাই কপিরাইট আইনের সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে সবচাইতে আলোচিত খাত হইলো আউটসোর্সিং। উন্নত বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজগুলি যাহারা করেন তাহাদের পারিশ্রমিক উচ্চ হওয়ায়, কাজগুলি অপেক্ষাকৃত কম পারিশ্রমিকের উন্নয়নশীল দেশে চলিয়া আসিতেছে। আউটসোর্সিংয়ের অধীনে রহিয়াছে বিবিধ কার্যাবলী এবং দিন যত যাইতেছে নূতন নূতন কার্যক্ষেত্র তৈরি হইতেছে। ডাটা এন্ট্রি, মেডিকেল ট্রান্সক্রিপশনের পর এখন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, আইপি অ্যাপ্লিকেশন, মোবাইল কনটেন্ট, কার্টুন, প্রি-প্রেস, গ্রাফিক ডিজাইন, ডকুমেন্ট প্রসেসিং, টু-ডি ও থ্রি-ডি অ্যানিমেশন এবং স্থাপত্যকলার নানান কাজ আসিতেছে বাংলাদেশে। আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা হইলো সঠিক যোগাযোগের অভাব এবং ইংরেজিতে দুর্বলতা। আর প্রতিবন্ধকতা হইলো আমাদের ইন্টারনেট স্পিড দুর্বল। এত দুর্বল ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি দিয়া আউটসোর্সিংয়ের কাজ করা কঠিন। বিদ্যুত্ সরবরাহের অপ্রতুলতা আরেকটি সীমাবদ্ধতা। ক্রেডিট কার্ডের সীমিত ব্যবহারও একটি সমস্যা, যেই ক্ষেত্রে বৈদেশিক লেনদেন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেই হইয়া থাকে। এই খাতে সরকারি-বেসরকারি সব মহলকে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হইবে। একসময় ভারত আউটসোর্সিংয়ের কাজে প্রাধ্যান্য বিস্তার করিয়াছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান শ্রমমূল্যের কারণে এখন কাজগুলি অন্যান্য দেশে সরিয়া আসিতেছে। এই কাজগুলির কিছু বাংলাদেশে আসিতেছে এবং সঠিক উদ্যোগ নিলে আরও আসিবে এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা দেশে জমা হইবে।
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাত হইতে অধিক অর্থনৈতিক লাভালাভ অর্জন করিতে হইলে গ্রাম ও শহরের সাথে ডিজিটাল ডিভাইড কমাইয়া আনিতে হইবে। এমনকি ঢাকার সহিত মফস্বল শহরের প্রযুক্তি ব্যবহারের ফারাক অনেক। দেশের সর্বত্রই কম্পিউটার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং কম্পিউটারভিত্তিক কাজের সুযোগ সমভাবে বিস্তার করিতে হইবে। তাহা হইলে এই খাতে অধিক মানবসম্পদ নিযুক্ত হইতে পারিবে। সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের যেই ঘাটতি রহিয়াছে, তাহাকে অবশ্যই কমাইয়া আনিতে হইবে। আর পুরুষের পাশাপাশি নারী সমাজকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সঠিকভাবে কাজে লাগাইতে হইবে। অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে তথ্যপ্রযুক্তি খাত হইতে দূরে রাখিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন প্রায় অসম্ভব এক কল্পনা।