সোহেল রানার গ্রেফতার স্বস্তিদায়ক

সাভারের ধসিয়া পড়া ভবনের মালিক সোহেল রানা ধরা পড়িয়াছে। গতকাল রবিবার বিকালে বেনাপোল সীমান্ত হইতে র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা তাহাকে গ্রেফতার করে। বেলা সোয়া তিনটার দিকে সাভার ট্রাজেডির উদ্ধার কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হইতে ঘোষণা দেওয়া হয়, ‘যে মানুষরূপী পশুটি এইখানে মরণ ফাঁদ তৈরি করেছিল, দেশ ছেড়ে পালানোর সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষমাণ স্বজনহারা মানুষ, উদ্ধারকর্মী এবং উপস্থিত বিক্ষুব্ধ জনসাধারণ ফাঁসি ফাঁসি বলিয়া শ্লোগান দিতে শুরু করে। এই খলনায়ক সম্পর্কে মানুষের যে ঘৃণা ও ক্ষোভ জমিয়া উঠিয়াছে, ইহা যে তাহারই বহিঃপ্রকাশ তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। রানা প্লাজা ধসিয়া পড়িবার মধ্য দিয়া যে মর্মবিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে, দেশ জুড়িয়া যে শোকসন্তাপ চলিতেছে তাহা কাহারও অজানা নহে, তাহা ভাষায় প্রকাশ করিবার অযোগ্য। এই পর্যন্ত প্রায় চারশত নারী ও পুরুষের মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হইয়াছে বলিয়া জানা গিয়াছে। সংখ্যাটি আরও বাড়িতে পারে। উদ্ধারকর্মীদের প্রাণান্তকর এবং রুদ্ধশ্বাস তত্পরতায় প্রায় তিন হাজার নারী ও পুরুষকে উদ্ধার করা সম্ভবপর হইয়াছে। সেই অন্ধকার মৃত্যুপুরী হইতে যাহারা প্রাণে বাঁচিয়া ফিরিয়াছেন তাহাদের অনেকের অবস্থা সংকটাপন্ন। তাহারা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়িয়া চলিয়াছেন। হাত-পা হারাইয়া সারা জীবনের জন্য অনেকের কর্মক্ষমতা লোপ পাইয়াছে। এই মৃত্যু, এই শোক, স্বজনহারা মানুষের আহাজারিতে বাতাস ভারি হইয়া উঠিয়াছে দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রাম-জনপদে। মর্মবিদারক এই মানবিক বিপর্যয়ের জন্য প্রায় সকল মহলই প্রধানতম দায়ী বলিয়া মনে করেন সোহেল রানাকে। রানা প্লাজার মালিক সাভারের স্থানীয় যুবলীগের নেতা সোহেল রানা । তাহার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ। ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ তো আছেই। তদুপরি ভবনে ফাটল দেখা দিবার পরও এই লোকটিই নাকি বিভিন্ন তলায় অবস্থিত গার্মেন্টস খোলা রাখিতে প্ররোচিত করিয়াছে। কেহ কেহ বলেন, এই ভয়ংকর ক্ষমতাবান ভিলেনের চাপ উপেক্ষা করা সম্ভবপর হয় নাই। ইহাছাড়াও তাহার বিরুদ্ধে আরও বহু অভিযোগ রহিয়াছে। সাভার ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পর হইতেই সোহেল রানা, গার্মেন্টস মালিক ও অন্য দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল হইতে। টেলিভিশনের টক শো এবং সংবাদপত্রের পাতায় এই দাবির পাশাপাশি নানা সংশয়-সন্দেহের কথা বলা হইতেছিল। কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক ও সাভার পৌরসভার দুই ইঞ্জিনিয়ার গ্রেফতার হওয়ার পরও সাধারণ্যে এই ধারণা তৈয়ার হইয়া গিয়াছিল যে, সোহেল রানা থাকিয়া যাইবে ধরাছোঁয়ার বাহিরে। তাহার কেশাগ্রও স্পর্শ করা হইবে না হয়তো। এমনই বলা হইয়াছে যে, এই রানাকে সরকার বিদেশে পাড়ি জমাইবার সুযোগ করিয়া দিয়াছে, অথবা সেরূপ সুযোগ করিয়া দেওয়া হইবে। এইরূপ সংশয়-সন্দেহ দেখা দিবার পেছনে যে কোনো কারণ নাই, তাহা অবশ্য নয়। ইতিপূর্বে সংঘটিত অনেক হত্যাকান্ড এবং মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিচার না হইবার দৃষ্টান্ত এই দেশে বিরল নয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত পরিস্থিতির চাপেই হউক বা আইনের স্বাভাবিক পথেই হউক সোহেল রানা গ্রেফতার হইয়াছে। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, সরকার নির্বিকার বসিয়া নাই। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এই ক্ষেত্রে তাহাদের কর্তব্য পালন করিয়াছেন। বিষয়টি স্বস্তিদায়ক নিঃসন্দেহে। সোহেল রানা এবং সাভার ট্র্যাজেডির জন্য যাহাদের দায়ী করা হইতেছে তাহাদের কি শাস্তি প্রাপ্য, সে বিষয়ে আমাদের মন্তব্য করিবার কিছু নাই। আমরা চাই আইন তাহার নিজস্ব গতিতে চলুক। অপরাধী শাস্তি পাক- ইহাই আমাদের প্রত্যাশা।