বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা

মহীয়সী বেগম রোকেয়ার নামে তাঁহার জন্মস্থান রংপুরে প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টির পথচলা শুরু হয় ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর। সেই হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি বয়সে নবীন। কিন্তু ইহার মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়া সুধী মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়াছে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় এইখানেও নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে। দীর্ঘদিন ধরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিরাজ করিতেছে অচলাবস্থা। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করিয়া যাইতেছেন। তাহাদের প্রধান অভিযোগ এই যে, প্রশাসনিক দুর্নীতি মাত্রা ছাড়াইয়া গিয়াছে। তাহাদের এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করিয়া বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা কমিটির নামে আরেকটি মহলও বেশ সক্রিয় রহিয়াছে। আসলে এইখানে সরকারি ও বিরোধী দলই নানাভাবে তত্পরতা দেখাইতেছে ও কলকাঠি নাড়িতেছে। দেশব্যাপী চলা অস্বস্তিকর ও বিভক্তির রাজনীতির প্রতিচ্ছায়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও পরিলক্ষিত হইতেছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় নূতন বিশ্ববিদ্যালয়টিও ইহার খপ্পর হইতে পরিত্রাণ পায় নাই। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি বিরোধী মঞ্চের ১২ শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বাদী হইয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। তাহাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনধিকার প্রবেশ, ভাঙচুর, ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও ৩০ লক্ষ টাকা মূল্যের সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিসাধনসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনয়ন করা হয়। তবে অভিযুক্তদের দাবি, উপাচার্যের দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপকর্ম ঢাকিতেই এই মিথ্যা মামলা দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। উল্লেখ্য, ইহার আগে ভিসি বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করিয়া গত ১৮ এপ্রিল চারজন শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ইহাছাড়া ২০ এপ্রিল পুলিশ ও বিবদমান দুইটি গ্রুপের সঙ্গে ত্রিমুখি সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। ইহার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই হইতে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা কাটিতেছে না। তাহাদের অভিভাবকরাও যারপরনাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। প্রকৃতপক্ষে বুয়েটের ঘটনার মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি চলিতেছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের অনেক আন্দোলন, ত্যাগ স্বীকার ও দেন-দরবার করিতে হয়। পোড়াইতে হয় অনেক কাঠ-খড়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা অনেক কঠিন। আমরা কোনকিছু চাহিবার ক্ষেত্রে কোমর বাঁধিয়া আন্দোলন করিতে পারি বটে, কিন্তু রক্ষা ও পরিচালনা করিতে জানি বলিয়া মনে হয় না। সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এই কথা ধ্রুবতারার ন্যায় সত্য হইয়া উঠিতেছে। ইহা বড়ই পরিতাপের বিষয়। আমরা দেশ স্বাধীন করিয়াছি বুকের রক্ত দিয়া, কিন্তু সেই স্বাধীনতাও সর্বাঙ্গীনভাবে অর্থবহ করিতে পারিতেছি না। ফলে অনৈক্য, অবিশ্বাস ও অনর্থক দলাদলিই সার হইতেছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সমাজ হইতে বিচ্ছিন্ন কোন দ্বীপ নহে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নেতিবাচক অভিঘাত আসিয়া পড়িতেছে ক্যাম্পাসেও। বিভাজনের রাজনীতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকেও দুর্বলতর করিয়া তুলিতেছে। ইহা হইতে আমরা কখন পরিত্রাণ পাইব তাহা আমাদের জানা নাই। তবে আমরা কায়মনোবাক্যে কামনা করি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিরতার অবসান হউক। শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞানের দরজা সর্বদাই অবারিত থাকুক। তাই আমরা বেগম রোকেয়া বিশ্ববদ্যালয়ের সংকটের সমাধান করিয়া অনতিবিলম্বে তাহা খুলিয়া দেওয়ার জোর দাবি জানাই।