[ রা জ নী তি ]

রাজনৈতিক সংকট :দূরে যা দেখছি

শে চলছে রাজনৈতিক সংকট। এই সংকটের ফলে বাড়ছে জনগণের ভোগান্তি। প্রায়শই হরতাল রূপ নিচ্ছে সহিংসতায়। ধ্বংস হচ্ছে সম্পদ, মরছে মানুষ, অঙ্গহানি হচ্ছে নিরীহ শিশুর আর ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাজীবন হচ্ছে ব্যাহত। দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হবে, না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে—এ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। আওয়ামী লীগ চায় আগামী নির্বাচন সংবিধানের ১২৩ এর ৩(ক) ধারা অনুসারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অর্থাত্ বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত করতে, অন্যদিকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন মেনে নেবে না। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের অনমনীয় অবস্থানকে টলাতে বিএনপি হরতাল দিচ্ছে। আর এই হরতালে বিরোধী দলের সহিংস আচরণের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকার চলমান রাজনৈতিক সংকটকে একটি আইন-শৃংখলার সমস্যা হিসেবে দেখছে বলেই ধারণা করছি। বিএনপির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার এই ধারণারই একটি প্রমাণ। এই অবস্থায় দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী এবং ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ দ্রুত রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলকে সংকট নিরসনে আলোচনায় বসতে বার বার অনুরোধ করছেন। ইতোমধ্যেই টিআইবি সংকট সমাধানের জন্য একটি ফর্মূলাও প্রস্তাব করেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই প্রস্তাবকে আমলে নেয়নি। সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সেই পাকিস্তান আমল থেকেই সফলতার মুখ দেখেনি। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে পূর্ব বাংলার ৬-দফা কেন্দ্রিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায় আইয়ুব খানের অনমনীয়তার কারণে ভেস্তে যায়। আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের অধীনে এককভাবেই পূর্ব পাকিস্তান সংকটের সমাধান করতে চেয়েছিলেন। তার এই প্রচেষ্টা ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত সফল হলেও তা পরিপূর্ণতা লাভ করেনি। কারণ, ঐ নির্বাচনের পর পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক জান্তা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা প্রকাশ করে। ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে ১৯৭১-এর মার্চে মুজিব-ভুট্টোর ঢাকা সংলাপ ব্যর্থ হয় মূলত ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে ভুট্টোর অনমনীয় অবস্থানের কারণে। ভুট্টো চেয়েছিলেন যেহেতু তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা তাই তিনি হবেন পশ্চিম-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আর শেখ মুজিব হবেন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। ভুট্টোর এই প্রস্তাব ছিলো সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিবিরুদ্ধ। তাই শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে এই প্রস্তাব মানা কোনক্রমেই সম্ভব ছিলো না। যাহোক, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও সংলাপ হয়েছে। কিন্তু এই সংলাপ দেশের রাজনৈতিক উন্নয়নে কোন ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে (১৯৮২-৯০), সামরিক শাসন থেকে বেসামরিক শাসনে উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ হয়েছিল। কিন্তু ঐ সংলাপ এরশাদের সময়ে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক উন্নয়নে তেমন কোন গুণগত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। গণতান্ত্রিক শাসনামলে (১৯৯১-২০০৬) তিনটি সংলাপ হয়। প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৪ সালে। কমনওয়েলথ মহাসচিবের প্রতিনিধি নিনিয়ান স্টিফেনের মধ্যস্থতায় বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে ৫-দফা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সরকার এবং বিরোধী জোট দু’পক্ষই এই সংলাপ গুরুত্বের সাথে নিলেও তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবেও বিরোধী জোট মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় এই সংলাপটিও ব্যর্থ হয়। ১৯৯৫ সালে ৫জন বুদ্ধিজীবী কর্তৃক G-5 এর বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সাথে চার দফা সংলাপ ব্যর্থ হয়। যদিও G-5 এর সাথে আলোচনায় খালেদা জিয়া ব্যক্তিগতভাবে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে আলোচনায় রাজি হন, কিন্তু পরবর্তীতে দলের কট্টরপন্থিদের চাপে তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে ২০০৬ সালে দু’টি দলের সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে সংলাপ হয়। এই সংলাপের মূল লক্ষ্য ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি কে এম হাসানকে সরিয়ে অন্য কাউকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ করা। আওয়ামী লীগ বিচারপতি হাসানকে বিএনপি পন্থি হিসেবে আখ্যায়িত করে তার নিয়োগের বিষয়ে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সংলাপের ফল হিসেবে না হলেও, বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্যান্য ফোরাম থেকেও বিচারপতি হাসানকে দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশে বাধ্য করে। চাপের মুখে হাসান অপারগতা প্রকাশ করেন। সংলাপের এই প্রেক্ষাপটটি চলমান রাজনৈতিক সংকট ও তার সমাধানে সংলাপের বাস্তবতা উপলব্ধিতে সহায়তা করবে। চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপের সম্ভাবনা নেই বললে অত্যুক্তি হবে না, তবে যদি সংলাপ হয়ও তা সফল হবে না প্রধানত নিম্নোক্ত কারণে। প্রথমত. সংলাপের বিষয়ে সরকারের দিক থেকে কোন আন্তরিকতা নেই; দ্বিতীয়ত. দু’টি দলের মধ্যে সন্দেহ/অবিশ্বাস আগের যে কোন সময়ের তুলনায় আরও প্রবল হয়েছে; তৃতীয়ত.বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির বিরুদ্ধে সরকারের অপরিবর্তনীয় অবস্থান; চতুর্থত.পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি সংবিধানে বাতিল করা হয়েছে। পঞ্চমত. এখন পর্যন্ত দু’দলের মধ্যস্থতা করতে কেউ এগিয়ে আসেনি। যদিও বিএনপির দাবি অনুযায়ী সুপ্রীম কোর্টের রায় অনুসারে আগামী দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার বিষয়ে জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ বলছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর পর এটির আর সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ কেনই বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপর জোর দিচ্ছে। প্রথমত. এটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া; দ্বিতীয়ত. ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন করা; তৃতীয়ত. ক্ষমতাসীন দল হিসেবে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার একটা চেষ্টা করা। এটি নিশ্চিতভাবেই কাজ করবে, তা বলা যায় না। কারণ, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্রশাসন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাত থেকে বাঁচার জন্য কোন দলের পক্ষে কাজ নাও করতে পারে। বিএনপির সামনে এখন আন্দোলন ছাড়া আর কোন বিকল্প রাস্তা নেই। তবে তৃতীয় কোন পক্ষ (যেমন: সেনাবাহিনী) যদি এ দু’দলের উপর সমঝোতার জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে—সেক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর কোন সম্ভাবনা দেখছি না। বিএনপির আন্দোলনের একটি দুর্বল দিক হচ্ছে— তারা বর্তমান প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে—এর সপক্ষে শক্তিশালী জনমত গড়ে তুলতে পেরেছে বলে মনে হয় না। বিএনপির আন্দোলনের জন্য আর সময় আছে মাত্র পাঁচ মাস অর্থাত্ সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। মাঝখানে রমজান মাস এবং ঈদের কারণে এক থেকে দেড়মাস চলে যাবে। সামনে থাকবে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা। এছাড়াও সামনে আছে আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টি—যা আন্দোলনের চেতনাকে অনেকটাই দুর্বল করতে পারে। সব মিলে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিএনপির পক্ষে আন্দোলন শক্তিশালী করা সম্ভব হবে না। যদি সেপ্টেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগকে টলানো না যায়, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই দলটি সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিবে। নির্বাচনকালীন সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ নতুন মাত্রা পেতে পারে। বিএনপির জন্য এই সময়টা হবে আরও চ্যালেঞ্জিং। পুরো দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখা, খালেদা জিয়ার জন্য হবে অগ্নিপরীক্ষা। নির্বাচন বয়কট করলে বিএনপির তৃণমূলের নেতারা কী বসে থাকবে? সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। আমার ধারণা বিএনপির একটি অংশ জাতীয় পার্টি বা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে যাবেই। তবে আমি খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছি না। খালেদা জিয়া তার নিজ পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ এবং দলের সাংগঠনিক শক্তি বিবেচনা করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সম্ভাবনা অধিকতর প্রবল। তখন আওয়ামী লীগের জন্য হবে উল্টো অস্বস্তির ব্যাপার। আওয়ামী লীগ তখন তার নির্বাচনী রাজনীতিকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। আওয়ামী লীগ তার দলসহ জাতীয় পার্টির সাথে প্রকাশ্য সমঝোতা ছাড়া আর কোন রাস্তা থাকবে না। যদিও রাজনৈতিক প্রপাগাণ্ডা, এর জন্য আওয়ামী লীগকে অনেক মূল্য দিতে হবে। বিএনপি যদি নির্বাচনে যায়, সেক্ষেত্রে বিএনপির সাথে ইসলামী দলগুলোর নির্বাচনী জোট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিএনপির পক্ষে নির্বাচনে যাওয়ার আরেকটি ইতিবাচক দিক হবে যদি জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়। এতে করে জামায়াতের ভোট বিএনপিতে আসবে। তবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করলে নির্বাচনী রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াত জোট বজায় থাকবে। বিএনপি যদি নির্বাচন বয়কট করে—যা হওয়ার সম্ভাবনা আমার দৃষ্টিতে এখনও কম—তাহলে আওয়ামী লীগ ১৪ দলের বাইরেও সকল দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে উত্সাহিত করবে। আর নির্বাচনী রাজনীতিতে যত দলকে নির্বাচনে আনা যাবে, রাজনৈতিকভাবে নির্বাচনটি ততই গ্রহণযোগ্য হবে আর নির্বাচনী আইন-কানুন যদি সকলের জন্য সমতল ক্ষেত্র তৈরির নিশ্চয়তা দেয়—সেক্ষেত্রে নির্বাচনটিকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করতে বিএনপি সফল নাও হতে পারে। আইনগতভাবে অবশ্যই নির্বাচনটি বৈধ। বিএনপি যদি অসহযোগ আন্দোলন বা হরতালের মাধ্যমে সহিংস আচরণ করে, তাতে বিএনপির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা Email: ahmed.sabbir24@yahoo.com