উচ্চ মাধ্যমিকে কম্পিউটার শিক্ষা বাদ কার স্বার্থে?

সরকারি নির্দেশ মোতাবেক ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রণীত নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রবর্তন করা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের এক বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায় যে, ২০১৩ সাল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টি থাকছে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নামে ১০০ নম্বরের অন্য আরেকটি বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে সকল ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হচ্ছে। এজন্য ২০০-২২০ পাতার মধ্যে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করার জন্য লেখকদের কাছ থেকে পান্ডুলিপি আহবান করা হয়েছে, যা ২ বছরে পড়ানো হবে। তবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক সরবরাহকৃত সিলেবাসে এই বিষয়ে পৃথক কোন ব্যবহারিক পরীক্ষা থাকছে কিনা এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। বর্তমানে প্রচলিত কারিকুলাম অনুযায়ী উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ২০০ নম্বরের কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টি চালু আছে, যার প্রতি পত্রে তত্ত্বীয় অংশে ৬০ নম্বর ও ব্যবহারিক অংশে ৪০ নম্বর বরাদ্দ আছে। সকল শাখার শিক্ষার্থীরা আবশ্যিক বা ঐচ্ছিক হিসাবে এই বিষয়টি অধ্যয়ন করতে পারে। ২০১১-২০১২ সাল থেকে এই কম্পিউটার শিক্ষার নতুন সিলেবাস চালু করা হয়। নতুন সিলেবাস চালুর ২ বছর যেতে না যেতেই এ বিষয়টি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে, জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর ৩১ নং পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে “বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ের সঙ্গে কম্পিউটার বিষয় পড়াশুনার সুযোগ করে দেওয়া হবে।” অথচ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় জাতীয় শিক্ষানীতির তোয়াক্কা না করে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টি বিলুপ্ত করতে যাচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কম্পিউটার শিক্ষা/ বিজ্ঞান এক নয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপাত্ত/ তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, বিতরণ, ব্যবহার ও যোগাযোগের সাথে সংশ্লিষ্ট। পক্ষান্তরে কম্পিউটার শিক্ষা কম্পিউটিংয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট; এটি মূলত কম্পিউটার পরিচালনাসহ অ্যালগরিদম, ডেটা স্ট্রাকচার ও প্রোগ্রামিংকেন্দ্রিক। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বাস্তবায়নে কম্পিউটারের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর ৩১-৩২ নং পৃষ্ঠায় বর্ণিত কয়েকটি বাক্যাংশ দ্রষ্টব্য- “তথ্য প্রযুক্তিকে মোবাইল ফোন, রেডিও, টেলিভিশন, নেটওয়ার্কিং কিংবা সকল তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা”; “সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলামসহ কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ খোলা হবে”; “বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষার মান যুগোপযোগী করে শিক্ষার্থীদের স্বতন্ত্রভাবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার ব্যবস্থা করা হবে”; “তৃণমূল পর্যায়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা/ থানা পর্যায়ে তথ্য প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে”। এ সকল বাক্যাংশে কম্পিউটার বিজ্ঞান/শিক্ষা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি যে এক নয় তাই সমর্থিত হয়েছে। এই বিষয়ে আরও লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কম্পিউটার সায়েন্স/স্টাডিজ বিষয় যুগপত্ভাবে চালু আছে। এই বিষয় দুইটি যদি একই হতো তাহলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময়ে দুইটি বিষয় পাঠদানের প্রয়োজন হতো না। কাজেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কম্পিউটার শিক্ষা পরস্পর প্রতিস্থাপনযোগ্য বিষয় নয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক সরবরাহকৃত ২০১৩ সাল থেকে সকল শাখায় বাধ্যতামূলকভাবে চালু হতে যাওয়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সিলেবাসে বিশ্ব ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কমিউনিকেশন সিস্টেমস ও নেটওয়ার্কিং, নাম্বার সিস্টেম ও ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েব ডিজাইন ও এইচটিএমএল পরিচিতি, প্রোগ্রামিং (সি-প্রোগ্রামিং) ভাষা ও ডেটাবেজে ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সংক্ষিপ্তভাবে স্থান পেয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১৩ সালে যে সকল শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হবে সে সকল শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবনের কোন পর্যায়েই কম্পিউটার শিক্ষা কিংবা তথ্য প্রযুক্তি বাধ্যতামূলকভাবে পড়ে নাই। কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শ্রেণিতে কম্পিউটার শিক্ষা ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে অধ্যয়ন করলেও গ্রাম-গঞ্জ বা মফস্বলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই কম্পিউটার পরিচিতি, কম্পিউটার চালনা পদ্ধতি বা অপারেটিং সিস্টেম এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে অবগত নয়। কিন্তু এই সিলেবাসে যে সকল শিক্ষার্থী ইতিপূর্বে কম্পিউটার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সংজ্ঞা সম্পর্কে জানে না বা তা ব্যবহার করেনি তাদের হাতেখড়ি দেয়ার জন্য কম্পিউটার পরিচিতি, কম্পিউটার চালনা পদ্ধতি বা অপারেটিং সিস্টেমসহ টাইপিং পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে পাঠদানে শিক্ষকদের সমস্যা হবে। ক্লাসের সংখ্যা সীমিত হওয়ার কারণে শিক্ষকদের পক্ষে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে কম্পিউটারে হাতেখড়ি দেয়ার বিষয়গুলো পড়ানো সম্ভব হবে না। ফলে ক্লাসের মধ্যেই এক ধরনের ডিজিটাল ডিভাইড তৈরি হবে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়। সরকার সর্বাত্মকভাবে সকল পর্যায়ে এই ডিজিটাল ডিভাইড দূর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে “ডিজিটাল বাংলাদেশ” বাস্তবায়নের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কম্পিউটার শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। সরকার এ সত্যকে উপলব্ধি করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বাধ্যতামূলক করেছে এবং বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষার পাশাপাশি কম্পিউটার শিক্ষাকে উত্সাহিত করছে। কিন্তু সরকারের এহেন প্রশংসনীয় উদ্যোগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সিলেবাসে এমন সব বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা সকল শাখার শিক্ষার্থীদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ বা প্রয়োজন নেই। নাম্বার সিস্টেম, ডিজিটাল লজিক/ডিভাইস, সি-প্রোগ্রামিং ইত্যাদি কম্পিউটার শিক্ষা/বিজ্ঞানের বিষয়; কিন্তু ১০০ নম্বরের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে এ সকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বাদ পড়ে যাবে। ফলে সরকার যে উদ্দেশ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি বাধ্যতামূলক করছে তা ব্যাহত হবে। সরকারের বিভিন্ন নীতিমালায় যেখানে কম্পিউটার শিক্ষা/বিজ্ঞান উত্সাহিত করা হচ্ছে সেখানে কম্পিউটার শিক্ষাকে বিলুপ্ত করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার “ডিজিটাল বাংলাদেশ” বাস্তবায়ন করার যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কম্পিউটার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রাথমিক পরিচিতি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সাথে সাথে তার সিলেবাসেও উপযুক্ত প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তুর সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ মহল বা স্টেকহোল্ডারদের সাথে মতবিনিময়ের ভিত্তিতে সিলেবাসটি পুনঃ সংকলন না করে বর্তমান অবস্থায় চালু করা হলে এ শিক্ষার বিপর্যয় ডেকে আনবে, এর মান প্রশ্নবিদ্ধ হবে, সর্বোপরি সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। পাশাপাশি কম্পিউটার শিক্ষাকে বিলুপ্ত না করে বর্তমানে যেভাবে আছে সেভাবে পুনর্বহাল করতে হবে। তাহলে যে সকল শিক্ষার্থী এ বিষয়টি অধ্যয়ন করতে চায় তারা যেন আবশ্যিক বা ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে নিতে পারবে। লেখক :তথ্য প্রযুক্তিবিদ ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক