লোকটা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার মোড়েই। ডিভাইডারের ঠিক মাথায়। একটা সাইনবোর্ডের নিচে। শতচ্ছিন্ন জোড়াতালি দেওয়া ফতুয়া গায়ে। পরনের লুঙ্গিটিও তেমনি যেন প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখাতে উদগ্রীব। ন্যূব্জদেহ তাল সামলাচ্ছে এক হাতে ধরা একটা লাঠি দিয়ে। আরেক হাতে দুমড়ানো টিনের থালা। পিচুটি চোখদুটো কুঁচকে ঘ্যানঘ্যান আওয়াজে সে মাত্র কয়েকটি শব্দই আওড়ে যাচ্ছে। চলতি পথে শব্দগুলো বোঝা কষ্টকর। তবে কান পাতলেই কথা বোঝা যায় : আল্লার দীন-মিসকিনরে কিছু খয়রাত দিয়ে এই অধমরে রহম করুন।
কথা না শুনেও তার পরিচয় সম্পর্কে কারো কোনো দ্বিধা নেই। পথচারীদের মধ্যে দয়াবান লোকের কমতি নাই। তাদের মধ্যে কেউ কেউ টিনের থালায় করুণা বর্ষণ করে যাচ্ছে।
এক পথচারী ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়েছিল গাড়ির অপেক্ষায়। তার নজর যায় লোকটির দিকে। কৌতূহল হয়। এগিয়ে যায় লোকটির কাছে। পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, এখানে কী করছেন?
লোকটি ভুরু কুঁচকে তাকায় পথচারীর দিকে। সন্দেহের দৃষ্টিতে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় টেনে টেনে বলে, বাবাগো, আল্লার ওয়াস্তে চারটে খয়রাত দ্যান। দশ টাকা লাখ টাকা আনবে আখিরাতে!
পথচারী জিজ্ঞেস করল, আপনার পাশে একটা সাইনবোর্ড আছে, দেখেছেন?
— এত বড় শহরে কতোই তো সাইনবোর্ড আছে, কোনটা রেখে কোনটা দেখব?
— যে সাইনবোর্ডের স্ট্যান্ডে আপনি হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এই সাইনবোর্ডে কী লেখা, আপনার জানা আছে?
লোকটা মাথা উঁচু করে সাইনবোর্ডের দিকে তাকাল। নির্বিকার কণ্ঠে বলল, আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। লেখাপড়া জানি নাকি! আবার চোখেও আন্ধার দেখি।
— আমিই পড়ে দিচ্ছি। সাইনবোর্ডে লেখা আছে— ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা।
লোকটি নির্বিকারে বলল, অ।
পথচারী বলল, আর এই সাইনবোর্ডের নিচে দাঁড়িয়েই আপনি ভিক্ষা করছেন?
— ভিক্ষা করছি না তো, খয়রাত চাইছি। আমাকে ভিক্ষুক মনে করেছেন নাকি? আমি তো ফকির।
এদিকে এগিয়ে আসা এক পুলিশকে দেখিয়ে পথচারী বলল, আপনি ভিক্ষুক না ফকির, ভিক্ষা করছেন না খয়রাত কালেকশন করছেন, সেটা ঐ পুলিশ সাহেবকে বুঝিয়ে বলবেন।
— আল্লার এই আজব দুনিয়ায় কত কী যে আজিব কারবার চলে।
বলেই লোকটি উলটো দিকে হনহন হাঁটা দিল। মুহূর্তে পাশের গলিতে হারিয়ে গেল।
সেই লোকটিকে পথচারী আবার দেখতে পেল ক’দিন পর। একই জায়গায়। মোড়ের ডিভাইডারের মাথায় সাইনবোর্ডটির নিচে। এবার তার ভোল পালটে গিয়েছে পুরোপুরি। সাদা ধবধবে ইস্তিরির ভাঁজ ভাঙা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরনে। পরিচ্ছন্ন চেহারা। থুতনির দাড়িগোছাও পরিপাটি। মাথায় বাহারি টুপি। কাঁধে ঝোলানো কোনো এক একাডেমির নামাঙ্কিত কাপড়ের ব্যাগ। দেখেই ভক্তির ভাব তৈরি হয়।
পথচারী কৌতূহল চাপতে না পেরে এগিয়ে গেল লোকটির দিকে। সবিস্ময়ে বলল, আবার আপনি! এই বেশে!
লোকটি নির্বিকার, কেন? এখানে আসা নিষেধ?
— আবার ভিক্ষে করবেন নাকি?
লোকটি পথচারীর চোখে চোখে রাখল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, আমি ভিক্ষা চাইতে আসি নাই। এবার এসেছি দান করতে। অন্ধ নগরবাসীকে আমি পথ দেখাব। আখেরাতের মুক্তির পথ। তাদেরকে প্রথম দান করব। জ্ঞান দেব। কীভাবে লাখো লাখো সওয়াব হাসিল করা যায়, তার শিক্ষাদান করব। দুস্থকে সাহায্য করার মাঝেই তো লাখো নেকি।
কোনো কিছু বুঝতে না পেরে পথচারী লোকটির দিকে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে রইল।