অর্থনীতিতে মুদ্রানীতির ক্রমবিকাশ ও প্রভাব

একটি দেশের অর্থনীতি পরিচালনায় দুই ধরনের নীতি যুগপত্ কাজ করে—ক. রাজস্ব নীতি (যা মূলত সরকারের আয় ও ব্যয়কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়), এবং খ. মুদ্রা নীতি (যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ ব্যবস্থাপনার কাজ করে থাকে)। এ দুটো নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক কী হবে সেটি পুরাপুরি নির্ভর করে একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর।

ইতিহাস বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ব্রেটন উডস পদ্ধতিভিত্তিক যে মুদ্রা নীতি চালু হয়েছিল তা মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এর বিভিন্ন পরামর্শেই পরিচালিত হতো। অনেকাংশে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ করাই প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তবে ১৯৮০-এর দশক থেকে ধনী দেশসমূহের মুদ্রানীতি সেসব দেশের মোট উত্পাদনকে প্রভাবিত করার অন্যতম কৌশল হয়ে ওঠে। সেসব দেশের আর্থিক বাজার মোট দেশজ উত্পাদনের চেয়ে অনেক গুণ বেশি হওয়ায় সার্বিকভাবে মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করেই অর্থনীতি এগিয়ে চলছে। ১৯৩০-এর মহামন্দার সময় সম্প্রসারণশীল রাজস্ব নীতি প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বাঁচানো হলেও পরবর্তী সময়ে ধ্রুপদী ধারার অর্থনীতিবিদগণ (যারা মনিটারিস্ট স্কুলেরও সমর্থক) মনে করেন মহামন্দার একটা মুদ্রা নীতিভিত্তিক সমাধানও ছিল।

সাধারণত দেখা যায়, উন্নত বিশ্বের দেশসমূহ স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও কর্তৃত্বপূর্ণ মুদ্রানীতি দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। অপরদিকে, অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশসমূহ সাধারণত রাজস্ব নীতিভিত্তিক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে। এর সুনির্দিষ্ট দুইটি কারণ রয়েছে। এক. স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মুদ্রানীতি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবেন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো সে পরিমাণ ক্ষমতা দিতে পারবে কি না সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুই. অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহে রাজস্ব নীতিকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবার সম্ভাব্যতা বেশি থাকে যাকে fiscal space বলে। ফলে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি অনুন্নত দেশসমূহের জন্য অনেকাংশেই যৌক্তিক। কারণ সেসব দেশে এখানো অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অনেকাংশেই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

জিডিপি পরিমাপের ব্যয়ভিত্তিক যে পদ্ধতি রয়েছে যেখানে সরকারের ব্যয় একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সরকারের ব্যয়ে পরিবর্তন করে মোট জাতীয় উত্পাদন পরিবর্তন করা সম্ভব। যদিও তা একেক অর্থনীতির জন্য একেক রকম হবে। প্রশ্ন হলো, রাজস্ব নীতির সঙ্গে মুদ্রানীতি কীভাবে সমন্বয় করে থাকে? ধরা যাক, সরকার তার ব্যয় ১০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এবং সরকার বলছে এর ফলে মোট দেশজ উত্পাদন ১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। এ পর্যায়ে মুদ্রানীতির কাজ হলো সরকারের ১০ শতাংশ ব্যয় বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করা। যদি সরকারের এ অতিরিক্ত ব্যয় অপরিকল্পিত ও অগ্রহণযোগ্য হয় এবং কোনোভাবেই জাতীয় উত্পাদন বাড়াবে না বলে প্রতীয়মান হয়। তবে যেসব দেশে স্বাধীন মুদ্রানীতি রয়েছে, তারা এ ব্যয়কে সমর্থন করবে না। সে প্রেক্ষাপটে উন্নত দেশসমূহে স্বাধীন মুদ্রানীতি অনুসরণের মাধ্যমে সরকারকে অনেক বেশি দায়ী করার সুযোগ রয়েছে। পক্ষান্তরে, যে সব দেশের মুদ্রানীতি পুরাপুরি রাজস্ব নীতির উপর ভিত্তি করে পরিচালনা করা হয়, সেসব দেশে অতিরিক্ত অর্থ জোগান দেওয়া ব্যতীত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কিছু করার থাকে না। অর্থাত্, এক্ষেত্রে সরকারকে ব্যয় না বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবার সুযোগ নেই। সুতরাং, সরকারকে তার ব্যয় পরিবর্তনের বিষয়ে আরো দায়িত্বশীল করতে স্বাধীন মুদ্রানীতির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

বলা বাহুল্য, সরকারকে অর্থনীতির সব সেক্টরেই কাজ করতে হয়; কিন্তু যেহেতু সম্পদ সীমিত তাই এর একটি অগ্রাধিকার তালিকা থাকা আবশ্যক। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ধরা যাক, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০০ ডলারের প্রকল্প নেওয়া দরকার কিন্তু মাত্র ১০০ ডলার সংস্থান করা সম্ভব হয়েছে। মোট বরাদ্দ ১০০ ডলারের বিপরীতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রাস্তাঘাট, মানবসম্পদ উন্নয়ন কোন খাতে ব্যয় করা হবে তা আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় মঞ্জুর করাই শ্রেয়, যদিও অনেকক্ষেত্রে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে কর্মসূচি নিয়ে থাকে।

আর্থিক বাজারের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির ফলে মুদ্রানীতির ধরনও ক্রমশ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। শুধু, রেপো/রিভার্স রেপো কিংবা ব্যাংক রেইট পরিবর্তন করে অর্থের যোগান বাড়ানো-কমানোর মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে, উন্নত দেশসমূহ অনেকক্ষেত্রেই প্রচলিত মুদ্রা নীতির বাইরে গিয়ে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অনেক দেশই এখন ‘শূন্য’ এমনকি ‘ঋণাত্মক’ সুদের হার প্রয়োগ করছে যা দেশের বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি মোট উত্পাদন বাড়াবে। মূলত বিনিয়োগকে উত্সাহিত করার জন্যই এ ধরনের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে জাপান, সুইজারল্যান্ড, সুইডেনসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অনেক দেশ আমানতের উপর শূন্য সুদের হার ঘোষণা করেছে— যা আজ থেকে এক দশক পূর্বে চিন্তা করাও অবাস্তব ছিল। সুদের হার শূন্য শতাংশ মানে আজকের ১০০ ডলার একবছর পর ১০০ ডলারই। আবার ব্যাংকে রেখে দিলে বিভিন্ন ফিস কেটে নিয়ে তা ১০০ ডলারের কমও হয়ে যেতে পারে।

মুদ্রা নীতির কার্যকারিতা নিয়ে কেইনসিয়ান ও ধ্রুপদীধারার অর্থনীতিবিদগণের মধ্যে বৈপরীত্য থাকলেও সরকারকে অনেক বেশি দায়িত্বশীল করতে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে সুদৃঢ় কাঠামোতে নিয়ে আসতে একটি স্বাধীন ও কর্তৃত্বপূর্ণ মুদ্রানীতি খুবই জরুরি।

n লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক

murshed.info@gmail.com