প্রজন্মের গাইনোকোলজিস্ট
প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৩, ১৯:৫৫
ডা. রাহনুমা হাসান
বিভাগীয় প্রধান (গাইনি)
বাংলাদেশ নৌবাহিনী হাসপাতাল, চট্টগ্রাম
শৈশবে কতই না স্বপ্নে বিভোর হই আমরা। কখনও হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার হতে ইচ্ছে করে, কখনও বিশাল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রকৌশলী ভেবে নিয়ে গর্বে বুক ফুলানো। ছোট পিয়ার এসবের কিছুতেই আগ্রহ নেই। সবাই স্লেটে অ-আ-ক-খ লিখতে শুরু করেছেন তো তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে বসে থাকেন। বন্ধুরা যখন সুর করে করে ছড়া মুখস্থ করেন, পিয়া তখন সা-রে-গা-মা’র সুর খুঁজে ফিরেন। মায়ের তো চিন্তার কমতি নেই, এই মেয়ে গান ছাড়া কিছুই তো বোঝে না! মায়ের সেদিনের ধারণা ভুল প্রমাণ করে সেই পিয়া আজ একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। পরিচিতজনদের কাছে পিয়া নামে সমাদৃত এই গাইনোকোলজিস্ট রাহনুমা হাসান প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনী হাসাপাতাল চট্টগ্রামে। স্বামীর আগ্রহেই তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন, তারপর থেকেই সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজের ও সংস্থার আগ্রহেই তিনি পরবর্তীতে গাইনোকোলজিতে উচ্চশিক্ষা নেন। পাঠকদের জানিয়ে দিই, মেডিকেলের ভীষণ পড়াশোনার চাপেও তিনি গান ছাড়েননি। অ্যানাটোমি বইয়ের পাতার মতো সুরের সব ধারা তিনি ধারণ করে রেখেছেন নিজের মাঝে। পছন্দের রবীন্দ্রসংগীতগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তার অ্যালবাম।
তরুণপ্রজন্মকে স্বাগত জানিয়ে রাহনুমা বলেন, ‘চিকিত্সা পেশা অন্যান্য পেশার মতো নিছক একটি পেশা নয়। দরদ, ভালোবাসা, কর্তব্যবোধ, পেশাগত দক্ষতা ও নিষ্ঠা এ পেশার মূল ভিত্তি। প্রায়ই নিজের স্বার্থ বা প্রয়োজনকে বিসর্জন দিয়ে জীবন বাঁচাতে রোগীর সেবা প্রদান করাকে অগ্রাধিকার দিতে হয় যেটা অন্য অনেক পেশার চেয়ে চিকিত্সা পেশাকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। তাই ভবিষত্যের সম্ভাব্য সব চিকিত্সকের জন্য এটাই বলব যে, শুধু তাদেরই এ পেশায় আসা উচিত যারা সেবা ধর্মকে হূদয়ে ধারণ করে নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে পারবে।’ রাহনুমা জানালেন, সেবা যখন অঙ্গীকারে রূপান্তরিত হয়, তখন সে কাজে থাকে ভালোবাসা। এই ভালোবাসার পেছনে ছুটতে গিয়ে ভাবী চিকিত্সকেরা ভারী ভারী বইয়ে মুখ গুঁজে থাকতে পারেন, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তারা হয়ে উঠতে চান দক্ষ থেকে দক্ষতর। চিকিত্সক জোসেফ হেনরি গ্রিনের মতো, যিনি মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তেও নিজের পালস মাপলেন। আশপাশের সবার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে বললেন, ‘ওটা থেমে গেছে।’ বড় আক্ষেপ তার। তিনি চাইলেও আর পারবেন না মানুষের পালস দেখে চিকিত্সা শুরু করতে। সবাই হেনরি গ্রিনের মতো নিবেদিত হোক, চিকিত্সক দেবী শেঠীর হূদয় দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হূদয়ালয়-এর মতো পুরো পৃথিবীটাই হয়ে উঠুক একটি হূদয়ালয়। এমনটাই স্বপ্ন দেখেন তিনি। রাহনুমা হাসানের বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই, প্রথমে হলিক্রসে ভর্তি হয়েও পরে শাহীন কলেজ থেকে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অতঃপর হলিক্রস থেকেই এইচএসসি শেষ করেন। নিবেদিত ছিলেন বলেই চান্স পেয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। তারপর সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিমের মাধ্যমে তার চিকিত্সাসেবায় যাত্রা শুরু। তার নানা মোহাম্মেদ মোদাব্বের ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, সেই আদর্শে তার মা শিরীন বেগম তাকে বড় করেছেন। যে যাত্রায় বাবা হোসেন জামালের অবদানও কম ছিল না। এখন স্বামী ডা. মাহবুব কামাল আর দুই সন্তানকে নিয়েই তার সুখের দিনলিপি। ছেলে তাহমিদ কামালও চিকিত্সা পেশায় যাত্রা শুরু করছেন, মেয়ে তাসমিয়া কামাল প্রমা পড়ছেন আর্কিটেকচারে। রাহনুমা স্বপ্ন দেখেন আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে আর সেই পথ ধরে বহির্বিশ্বে তৈরি হবে আমাদের নতুন পরিচয়। সেই সাথে তার পরিবারের মানুষগুলোকে নিয়ে সুখে দিন কাটাতে চান তিনি। সেই পথচলায় তার জন্য শুভকামনা আমাদের।
ছবি :দীপঙ্কর দীপু
রাহনুমা হাসান
ডাকনাম :পিয়া
জন্মতারিখ ও স্থান :৭ মে, ঢাকা
মায়ের নাম :শিরীন বেগম
বাবার নাম :হোসেন জামাল
প্রথম স্কুল :হলিক্রস স্কুল
প্রিয় উক্তি :মনেরে আজ কহো যে, ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যরে লও সহজে!
প্রিয় মানুষ :আমার নানা, মোহাম্মদ মোদাব্বের
প্রিয় পোশাক :শাড়ি
অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, বই পড়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :যে কাজ করে নিজে সন্তুষ্ট হতে পারা যায়!
===
ডা. মুনা সালিমা জাহান
সহকারী অধ্যাপক
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, ঢাকা
মুক্তিযোদ্ধা বাবা বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। সেই সুবাদে তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে কুর্মিটোলায়। বাবা স্বপ্ন দেখাতেন মেয়ে একদিন ডাক্তার হবে আর গৃহিণী মা জোর দিতেন সত্ মানুষ হওয়ার প্রতি। পিঠাপিঠি চার ভাইবোনের মধ্যে তিনিই সবার বড় ছিলেন। পরিবারের সবাই তাকে ডাকত ‘চিনি’ নামে, সেই ‘চিনি’ই আজকের মুনা সালিমা জাহান, এই সময়ের একজন গাইনোকোলজিস্ট হিসেবে কাজ করছেন সুনামের সাথে। মেডিক্যালে পড়াশোনার আগ্রহটা কীভাবে এলো, জানতে চাইলে মুনা সালিমা জাহান বলেন, ‘বুঝতে শেখার পর থেকেই জানি যে আমাকে ডাক্তার হতে হবে। এইচএসসির পর শুধুমাত্র মেডিক্যালেই ভর্তি পরীক্ষা দিই। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়। ইচ্ছে ছিল সার্জন হব কিন্তু ইন্টার্নশিপের সময় তখনকার বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আনোয়ারা বেগমকে দেখে অনেকটা সম্মোহিতের মতো ট্র্যাক বদলে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়ার পথে পা বাড়াই। একসময় মনে হলো ঠিকই করেছি, যে দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী এবং সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতিদিন যেখানে অনেক মা মৃত্যুবরণ করছে, সেখানে ভালো প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন অনেক বেশি।’
এখন এই চিকিত্সক যেহেতু মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক, তাই রোগীদের চিকিত্সা সেবা প্রদানের পাশাপাশি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ক্লিনিক্যাল ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো। পড়াতে তার ভীষণ ভালো লাগে, চিকিত্সক না হলে তিনি বোধহয় শিক্ষকই হতেন। আমাদের দেশে মহিলা ইউরোলজিস্ট ছিল না, এই বিষয়টা লক্ষ করার পর দেশে তিনিই প্রথম ইউরোগাইনিতে তাইওয়ান থেকে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন। তিনি এ বিষয়ে সেবা দেওয়া ও জনসচেতনতা বাড়াতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া গবেষণার প্রতি রয়েছে তার বিশেষ আগ্রহ। যখন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ছিলেন তখন থেকেই নিয়মিত পত্র-পত্রিকায় স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রবন্ধ লিখতেন। এখনও লিখছেন। স্বাস্থ্যবিষয়ক তার দুটি বইও রয়েছে। আগামী বই মেলার জন্য এখন লিখছেন। মুনা সালিমা জাহান বলেন, ‘চিকিত্সা পেশায় এসেছি ভালোলাগা থেকে। আমার জন্মই যেন চিকিত্সক হওয়ার জন্য। তাই আমি অসুস্থ নারী, গর্ভবতী মায়েদের পেশাগত সেবা দিতে চেষ্টা করি আমার সব ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে।’এ সময়ে চিকিত্সা পেশাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মুনা সালিমা জাহান বলেন, ‘আমাদের দেশে বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় চিকিত্সকের সংখ্যা কম। পুরো জনগোষ্ঠীকে যথাযথ স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে হলে দেশে আরও অনেক চিকিত্সক প্রয়োজন। প্রতিনিয়ত যেভাবে চিকিত্সা বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে আর নতুন নতুন বিশেষায়িত শাখা উন্মোচিত হচ্ছে, তাতে এ পেশায় ভালো করার অনেক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশ থেকে আগে অনেক বেশি রোগী নানা রকম জটিল রোগের চিকিত্সার জন্য বিভিন্ন উন্নত দেশে যেতেন বা এখনও যান। কিন্তু সময়ের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে দেশেও এখন নতুন নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি হচ্ছে। সুতরাং সেবার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জিং কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।’
সবশেষে মুনা ইত্তেফাককে বলেন, ‘তিনি বাংলাদেশের চিকিত্সা শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনে কাজ করে যেতে চান। মেনোপজ পরবর্তী নারীদের জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য একটা মেনোপজ ক্লিনিক করার ইচ্ছে আছে তার। একমাত্র মেয়ে রানিয়া শেহিরশ এবার ‘ও’ লেভেল দিচ্ছে, তাকে নিয়েও অনেক স্বপ্ন মায়ের। সব স্বপন পূরণ করে সেও একদিন মায়ের মতোই হবে—এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ছবি :দীপঙ্কর দীপু
ডা. মুনা সালিমা জাহান
ডাকনাম :চিনি
জন্মতারিখ ও স্থান :১৪ ডিসেম্বর, করাচি
মায়ের নাম :মোমেনা বেগম
বাবার নাম :মাহ্মুদ উল্ল্যাহ্
প্রথম স্কুল :বিএএফ শাহীন স্কুল, কুর্মিটোলা
প্রিয় মানুষ :বাবা
প্রিয় উক্তি :যে মুর্হূতে শুয়োপোকা ভাবল তার জীবন শেষ সে মুর্হূতে শুরু হলো প্রজাপতির রঙিন জীবন।
প্রিয় পোশাক :শাড়ি
অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, ইংরেজি মুভি দেখে, অথবা প্রকৃতির আশ্রয় খুঁজে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :একটার পর একটা ধাপ পেরিয়ে লক্ষ্য অর্জনের পর মনে হওয়া, ইস্ এর জন্য এত কষ্ট!!
==
ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস
সহযোগী অধ্যাপক (গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ভাবুনতো একটিবার, মেয়ের বয়স তিন বছর। বাবার স্বপ্ন মেয়ে বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। শুধু কি তাই? এই ভাবনায় বাবা বাড়ি বানানোর সময় নিচতলায় মেয়ের জন্য চেম্বারের জায়গাও রেখে দিলেন। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছে আজ মেয়েটি। আজ তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস। বাবা-মা আদর করে তাকে জোনাকী নামে ডাকতেন।
শতব্যস্ততার মাঝেও জান্নাতুল ফেরদৌস তার ক্যারিয়ার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন সবসময়, কারণ তিনি সব আনন্দই খুঁজে পান কাজের মাঝে। অনেক সময় রাত-বিরাতে তাকে ছুটে যেতে হয় হাসপাতালে, কিন্তু কিছুই তাকে ক্লান্ত করতে পারে না শুধুমাত্র অসীম একাগ্রতা থাকার কারণে। ‘রোগীদের কাছ থেকে আরোগ্য লাভের কথা শোনার পর আর কোনো কষ্টই অনুভূত হয় না চিকিত্সকদের’, এমনই সরল অভিব্যক্তি এ প্রজন্মের মেধাবী এই চিকিত্সকের। তিনি এখন নারীদের ক্যান্সার নিয়েও কাজ করছেন। অসহায় ও দরিদ্র নারীদের ক্যান্সারবিষয়ক সব সহায়তা দিয়ে থাকেন তিনি।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমি নতুনদের গুণমুগ্ধ ভক্ত। আমি যখনই তাদের দেখি আমার উপলব্ধি হলো আমার সময়ে ওদের মতো এত সুযোগ ছিল না। শুধু একটা পরামর্শ দেবো, নতুনদের প্রাপ্তি নিয়ে চিন্তা করা যাবে না, প্রাপ্তি সেটা আর্থিক অথবা সম্মান যাই হোক না কেন, সেটা আসবেই। আমি বিশ্বাস করি যোগ্যতা অনুযায়ী প্রাপ্য অবশ্যই মিলে যায়। তাই কাজের প্রতি সততা এবং সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিশ্চিত করাই নতুনদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।’
প্রজন্মের এই গাইনোকোলজিস্ট মনে করেন, দেশকে ভালোবাসার জন্য প্রত্যেকের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, এমনটা ঠিক নয়, বরং প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন থাকলে দেশটাকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। প্রজন্মের এই চিকিত্সক আরও জানান, সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে সেবা করার জন্য এই পেশার বিকল্প নেই। এ কাজে চিকিত্সকরা স্বেচ্ছাশ্রম নিয়েও এগিয়ে আসতে পারেন বলে মন্তব্য তার। জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘রোগ নিরূপণ ও উপশম করাই একজন ডাক্তারের প্রধান কাজ। একজন ডাক্তার হিসেবে আমাদের অগণিত দরিদ্র রোগীর মধ্যে কিছু রোগীকে যদি আমি আমার সেবাদানের মাধ্যমে উপকৃত করতে পারি, আমি মনে করব আমার এই পেশার মাধ্যমে দেশকে কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারলাম।’ জান্নাতুল ফেরদৌসের মতে, ‘এ পেশায় বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ, সম্মান, মানুষের ভালোবাসা, অর্থ—সবকিছুই একটা সুষম পরিমাণে অর্জন করা সম্ভব। মাহাথির মোহাম্মদ, মালয়েশীয়দের স্বপ্নের সিঁড়ির এই স্থপতি ছিলেন তার এলাকার মানুষের প্রিয় এক চিকিত্সক, ভালোবেসে লোকে তাকে ডাকত ডাক্তার উমনো। নবীন চিকিত্সকেরা এই মহান মানুষটির মতো স্বপ্ন দেখেন, তারাও চান বাংলাদেশ নামের দেশটিতে যেন বিনা চিকিত্সায় একজন মানুষেরও মৃত্যু না হয়। স্বপ্নটি হয়তো এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে, কিন্তু কোনো একদিন তা বাস্তবে পরিণত হবে না কে বলতে পারে!’ বাবা-মা আর চার ভাইবোনের ভালোবাসার বন্ধনে বড় হয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস। অন্য ভাইবোনেরাও যার যার জায়গাতে সুপ্রতিষ্ঠিত। তার স্বামী ডা. মনিরুজ্জামান খানও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। দুই সন্তানকে নিয়েই এখন তার সময় কাটে। বড় ছেলে মাহরুজ পড়ছে ক্লাস নাইনে, মেয়ে মাহিরা এবার টুতে। ভবিষ্যতে এই পেশায় যেকোনো প্রকারের অবদান রাখার মাধ্যমে পেশার প্রতি, সমাজের প্রতি ডাক্তার হিসেবে তাদের যে দায়িত্ব তা যেন পূরণ করে যেতে পারেন—এটাই তার স্বপ্ন।
জান্নাতুল ফেরদৌস
ডাকনাম :জোনাকী
জন্মতারিখ ও স্থান :২ সেপ্টেম্বর, ঢাকা
মায়ের নাম :লুত্ফা আক্তার
বাবার নাম :হাবিবুর রহমান
প্রথম স্কুল :টি অ্যান্ড টি হাই স্কুল
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা-মা
প্রিয় উক্তি :গুটিয়ে নয় চুটিয়ে বাচো
প্রিয় পোশাক :সালোয়ার কামিজ
অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, বই পড়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :বিষয়টা আপেক্ষিক।
===
ডা. হাসিনা আক্তার
রেজিস্ট্রার, ফার্টিলিটি সেন্টার
এ্যাপোলো হাসপাতাল, ঢাকা
আসলে ছোটবেলা থেকেই এই পেশাটার প্রতি একটা দুর্নিবার আকর্ষণ কাজ করত। সাদা অ্যাপ্রোন আর গলায় স্টেথো ঝুলানো কাউকে দেখলেই তার মনে হতো ইস্ আমিও যদি একদিন এ রকম হতে পারতাম। ডাক্তারী পেশাটা আর দশটা পেশা থেকে অনেকটাই আলাদা। মানবিক গুণাবলি আর মানব সেবার সমন্বয়ে একজন ডাক্তার হতে পারেন সমাজের আদর্শ। পেশার এই মর্যাদার কারণেই এই পেশায় আসার তাড়না জাগে তার মাঝে। তারপর বাবা-মায়ের ইচ্ছেটাও তাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে এই পেশায় আসার জন্য। বলছিলাম হাসিনা আক্তারের কথা, তিনি এ্যাপোলো ফার্টিলিটি সেন্টারের রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এখন। কেন এই পেশা বেছে নেওয়া আর কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? জানতে চাইলে হাসিনা বলেন, ‘আপনি যেই কাজ উপভোগ করবেন পেশা হিসেবে সেটাকে বেছে নেওয়াটাই হবে সর্বোত্তম। ডাক্তারী পেশায় আমি আমার মেধা ও সেবার সমন্বয়ে কাজ করতে পারি দেখে এই পেশাটা আমি প্রচণ্ড উপভোগ করি। আর সে কারণেই ডাক্তারী পেশায় আসা। আর আপনি যদি কোনো কাজ উপভোগ করেন, আর সেটা যদি হয় আপনার পেশা তাহলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ এমনিতেই চলে আসে। সততা, নিষ্ঠা আর পেশাদারী মনোভাব নিয়ে কাজ করি দেখে এই পেশাতে আমি পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’ নতুনদের শানিত মেধা নিয়ে চিকিত্সা পেশায় আসার আহ্বান জানিয়ে হাসিনা বলেন, ‘যতই তারা এগিয়ে আসবে ততই সমৃদ্ধ হবে এই ক্ষেত্র। আর সেটা যথেষ্টই লক্ষ করা যাচ্ছে। তরুণদের পড়াশোনায় খুব আগ্রহ, তারা স্নাতক সম্পন্ন করেই উচ্চশিক্ষার জন্য পড়াশোনা শুরু করে। সেই সাথে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যেন তারা পড়াশোনার সাথে সাথে কাজেরও ভালো সুযোগ পায়। আমাদের দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন স্বাস্থ্যসেবার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, সে তুলনায় অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। আপামর জনসাধারণের একদম কাছে গিয়ে সেবা করার জন্য এই পেশার বিকল্প নেই।’ আর তাই কাজের চাপ বা ব্যস্ততা থাকলেও উপভোগ করেন তিনি সবকিছু। আরেকটা বিষয় উল্লেখ করলেন হাসিনা, তা হলো, শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা চেষ্টা করেন সাধ্যমতো সেবা করার। হাসিনার স্বামী ডা. মোস্তফা ফারুক জালাল ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের প্রভাষক হিসেবে কাজ করছেন। দুই সন্তানকে নিয়েই কাটে তার সুখের সময়। ছেলে আরাফ পড়ছে ক্লাস ওয়ানে, মেয়ে আলিশার বয়স তিন বছর। ব্যক্তিজীবনে অসাধারণ বন্ধুবত্সল এই মানুষটি পরিবারের সবার সাথে সুখে সময় কাটানোর স্বপ্ন দেখেন, সেই সাথে নিজের কর্ম দিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চান, হ্রাস করতে চান মৃত্যুর হার। আমাদের দেশে এখন যে সংখ্যক চিকিত্সক আছেন, তাদের একটা বড় অংশই রয়ে গেছেন শহরকেন্দ্রিক। দরিদ্র অসহায় মানুষ একটু সেবা, একটু সহযোগিতার আশায় পথ চেয়ে আছেন। পথ চেয়ে আছেন তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষের জন্য। বিনিময়ে তারা তাকে দেবে সম্মান আর ভালোবাসা। সেই পথ ধরে কাজ করে যাবেন হাসিনা, তার জন্য শুভকামনা।
ছবি :দীপঙ্কর দীপু
হাসিনা আক্তার
ডাকনাম :পিয়া
জন্মতারিখ ও স্থান :৬ সেপ্টেম্বর, কিশোরগঞ্জ
মায়ের নাম :হালিমা খাতুন
বাবার নাম :আব্দুল হামিদ মিয়া
প্রথম স্কুল :মুরাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা-মা
প্রিয় উক্তি :সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
প্রিয় পোশাক :সালোয়ার-কামিজ
অবসর কাটে যেভাবে :পরিবারের সাথে
সাফল্যের সংজ্ঞা :আত্মতৃপ্তিই সফলতা।