একজন গৃহিণীর উদ্যোগ
প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৩, ১৯:৫৫
সরকারি কর্মকর্তাদের স্ত্রীরা সাধারণত একটু আয়েশি জীবনই পছন্দ করেন। কিন্তু এসএ জাহান ব্যতিক্রম। দেশের যেকোনো দুর্যোগ-দুঃসময়ে চেষ্টা করেন সাধ্যমতো এগিয়ে যেতে।
সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে সাভারের রানা প্লাজার কথাই মনে পড়বে সবার আগে। টিভি নিউজে রানা প্লাজার সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে মন কেঁদে উঠল তার। ভাবলেন সমবেদনা বা সহানুভূতি দেখানোর সময় এটা নয়। ছোট মেয়ে সুবাহকে নিয়ে পোস্টার লিখলেন। ইস্কাটন গার্ডেন অফিসার্স কোয়ার্টারে লাগিয়ে দিলেন সেই পোস্টার। কিন্তু নিচে যোগাযোগের ঠিকানা দিতে পারলেন না। যেহেতু তার দাফতরিক কোনো সংগঠন নেই। তাই পোস্টারে শুধু লিখলেন মানুষ মানুষের জন্য। আসুন রানা প্লাজায় দুর্গতের পাশে দাঁড়াই। মেয়ের বুদ্ধিতে সাথে যোগ করলেন একটি লাইন—‘ইস্কাটন গার্ডেন অফিসার্স কোয়ার্টার গৃহিণীর উদ্যোগ’।
তারপর শুরু হলো আসল যুদ্ধ। কোয়ার্টারের প্রতি ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটে তারা কড়া নাড়লেন। সাভারের ভবনধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা বোঝানোর চেষ্টা করলেন। পায়ে হেঁটে প্রায় পাঁচ শ’ পরিবারের কাছে তারা গেলেন। কেউ বুঝলেন, কেউ বুঝলেন না। কেউ কেউ আবার একটু বিরক্তও হলেন। এরই মধ্যে এসএ জাহানের সাথে যুক্ত হলেন তারই প্রতিবেশী আরও কিছু সাদা মনের মানুষ—শিউলি আক্তার, মুন্নি আক্তার, হাসিনা হক, মিসেস সুভাষ, মিসেস চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন। কোয়ার্টারের বাসাগুলো থেকেই কিছু কিছু করে তারা সাহায্য তুলতে শুরু করলেন। এ কাজটি করতে গিয়ে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন তারা। অভিজ্ঞতাগুলোতে উত্সাহ আর হতাশার ধোয়া মিলেমিশেই থাকে। কিন্তু এ উদ্যোগ থেমে থাকে না।
অভিযানের দ্বিতীয় দিন। এসএ জাহান তার দলবল নিয়ে হাজির হলেন এক অফিসারের বাসায়। তারা সাভারের মানুষের কষ্ট-দুর্দশার কথা বললেন। বাসার কর্ত্রীও মনোযোগ দিয়ে কাঁদো কাঁদো চেহারায় সব শুনলেন। তারপর প্রায় আধা ঘণ্টা বসিয়ে রেখে ১০২ টাকা দিয়ে তাদের প্রচেষ্টায় অংশ নিলেন। কিন্তু এ রকম ঘটনায় দমে যাননি তারা। অফিসার্স কোয়ার্টারের প্রতিটি ঘরে গেলেন।
এক বাসায় গিয়ে তো তারা সবাই অবাক হয়ে গেলেন। বাসার কলবেল চাপতেই কেউ গেট খুললেন। ভেতরে গিয়ে বসতেই বাসার কর্ত্রী এসে জড়িয়ে ধরলেন তাদের। বললেন, ‘ভাবী আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আমার স্বামী ১০ হাজার টাকা দিয়ে গেছেন আমার কাছে আপনাদের পোস্টার দেখে। বলেছেন, আপনারা যদি আসেন তাহলে তো ভালোই। যদি না আসেন তাহলে যেন আপনাদের সাথে যোগাযোগ করে টাকাটা দিই।’
নিজেদের অভিজ্ঞতাগুলো এভাবেই বর্ণনা করছিলেন এসএ জাহান। এভাবেই প্রায় দুই লাখ টাকা তারা তুলে ফেললেন কয়েক দিনে। তারপর সেই টাকা জমা দিলেন সাভার ট্র্যাজেডির জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। তাদের এই প্রচেষ্টার কথা শুনে সবাই প্রশংসা করলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও খুব অবাক হলেন, খুশি হলেন। তাদের উত্সাহিত করলেন। জানতে চাইলেন কয়েকজন গৃহিণী মিলে কীভাবে এত বড় একটা উদ্যোগ সফল করলেন।
নিজেদের অভিজ্ঞতা আর সফলতার গল্পগুলো এভাবেই মুগ্ধ চোখে বর্ণনা করছিলেন এসএ জাহান। নিজের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানকে পাত্তা না দিয়ে বিপদগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য মানুষের কাছে হাত পাততে তার একটুও দ্বিধা হয় না, বরং বুকভরা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেন মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে। তিনি বলেন, ‘আসলে সব সময়ই চাই নিজের পরিবারের বাইরে গিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে। আমার একার পক্ষে কতটুকুইবা সম্ভব। তাই ভেবেছি প্রতিবেশী ভাবীদের নিয়ে যদি সবার কাছে যাই তাহলে হয়তো একটু কিছু হলেও করা সম্ভব হবে। অংকের মাপকাঠিতে টাকার এই অংক হয়তো তেমন কিছুই নয়; কিন্তু কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের বাইরে যেটুকু করতে পেরেছি তাতেই আমরা অনুপ্রাণিত। আমার ছোট মেয়ে সুবাহ আমাদের এই কার্যক্রমের একটা সুন্দর নাম দিয়েছে— অফিসার্স কোয়ার্টার গৃহিণীর উদ্যোগ। আমরা এখনও চেষ্টা করছি আরও কিছু সাহায্য করার। যারা সাভার ট্র্যাজেডিতে পঙ্গু হয়েছেন, তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া যেন থমকে না যায়—এ বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করব। মেধাবী সন্তানদের একটা তালিকা করারও চেষ্টা করছি আমরা। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই, যাতে আমরা সমাজের জন্য কিছু করতে পারি। তবে আমাদের গৃহিণীর উদ্যোগকে কোনো দাফতরিক রূপ বা রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার ইচ্ছে আমাদের নেই। আমরা গৃহিণীরা একেবারেই নিজেদের মতো করে মানুষের জন্য ও সমাজের জন্য কিছু কাজ করে যেতে চাই।’
এসএ জাহানের সহকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা গত শীতেও নিজেদের মতো করে টাকা তুলে শীতার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আশপাশের মাঠ, রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্নতা অভিযানও তারা করেছেন বেশ কয়েকবার। আর এ সব কিছুর উদ্যোগ নেন গৃহিণীর উদ্যোগের মধ্যমণি এসএ জাহান। আমাদের চারপাশের গৃহিণীদের কাছে আইকন হতে পারেন একজন এসএ জাহান ও তার গৃহিণীর উদ্যোগ। খোলা চোখে এই প্রয়াসগুলোকে ছোট মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে মায়া-মমতা আর দেশপ্রেমের এক শক্তিশালী বন্ধন। ইস্কাটন গার্ডেন অফিসার্স কোয়ার্টারের অরুণিমা ৮-এ বসে এসএ জাহানের কাছে তার অভিজ্ঞতা আর পরিকল্পনার গল্প শুনতে শুনতে অদ্ভুত এক মায়ার ইন্দ্রজালে হারিয়ে যেতে হয়। এই ইন্দ্রজালের ঘোর কাটতে না কাটতেই চারতলার সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকি নিচে। একটি করে সিঁড়ি ভাঙছি আর যেন মনে হচ্ছে ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছি। একেবারেই পুরুষতান্ত্রিক একটা ভাবনা থেকে নিজেকে কেমন যেন ছোট আর অসহায় লাগছে। সাভারের রানা প্লাজার সেই দুর্গত মানুষের জন্য কত কিছুই না করার ছিল আমাদের, চাইলে কত কিছুই না করতে পারতাম আমরা। কিন্তু তার কতটুকুই বা করতে পেরেছি। অনেক প্রশ্ন মাথার ভেতর জট পাকিয়ে যাচ্ছে। জট পাকানো মাথায় হেলমেট জড়িয়ে বাইক স্টার্ট করলাম। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজে বাংলামোটর মোড়ে এসে থামল আমার বাইক। হঠাত্ মনে পড়ল আমরা যেসব পুরুষ নারী প্রসঙ্গ এলেই তার সাথে পরচর্চা, সাজগোজ আর স্টার প্লাস, স্টার জলসার বস্তাপচা সিরিয়াল জুড়ে দিই; তাদের পক্ষ থেকে একটা স্যরি তো অন্তত বলে আসা উচিত ছিল। কারণ এই কয়েকজন গৃহিণী তো অন্তত করে দেখিয়েছেন দেশের জন্য, সমাজের জন্য তারাও অনেক কিছু করতে পারেন। পরচর্চা, সাজগোজ আর বস্তাপচা ভারতীয় সিরিয়াল তাদের দেশপ্রেম আর মমত্ববোধের কাছে প্রতিদিন হেরে যায় কয়েক শ’ বার।
মাদার তেরেসা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন কয়েক বছর আগে। নতুন প্রজন্মের কারোরই হয়তো তাকে আর সামনাসামনি দেখার সুযোগ হবে না। কিন্তু আপনাদের এই মমতায় বেঁচে থাকবেন তিনি। আপনাদের চেষ্টা আর সংগ্রামে আমাদের বারবার মনে পড়বে একজন মাদার তেরেসাকে। আপনারা আপনাদের মতো করেই এগিয়ে যান ড্রয়িংরুমে বসে রিমোট চেপে চেপে দেশ উদ্ধার করা পুরুষ অথবা পরচর্চা আর সিরিয়াল নিয়ে ব্যস্ত থাকা নারী, কারোরই পোশাকি ‘স্যরি’ শুনে সময় নষ্ট করার মতো সময় আপনাদের হাতে নেই।