কথায় কথায় বাজি

হয়তো মাঠে খেলা চলছে, আমরা হুট করে বাজি ধরে ফেলি, কে জিতবে, কে হারবে। অনেক সময় আরও সূক্ষ্ম বাজিও ধরতে দেখি, এই ওভারে উইকেট পড়বে কি না? অথবা কত রান হবে? এ-তো গেল খেলার মাঠে। আমাদের নিত্যদিনের জীবনেও কি আমরা তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে বাজি ধরি না? আর এই বাজি ধরাটা কি নেহাতই শখের বশে? না কি নেশা হয়ে যাচ্ছে? এইসব আলোচনা নিয়েই আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু সাকিব :আজ তোদের খাওয়াব চল, বাজি ধরে এক হাজার টাকা জিতেছি। ইস্ আরেকটু হলে সিফাতের কাছেও জিতে যেতাম, যদি না আজ বাংলাদেশ হেরে যেত। স্বাধীন :থাম থাম... তুই আবার বাজি ধরেছিস? সেদিন না কার কাছে অনেক টাকা হারলি? আমার এইসব একদম পছন্দ হয় না। যা ফলাফল হওয়ার তা হবেই। তাতে তোর আমার ভূমিকা কতটুকু থাকে? তাহলে এই বাজি ধরা কেন? মাঝখান থেকে টাকাগুলোর অপচয় হয়। শিমুল :আরে, দুইজন দেখি ঝগড়া বাধিয়ে দিলি। বাজিতে জিতেছিস ভালো কথা, এবার আমাদের খাওয়াতে নিয়ে চল। আর শোন, যদি না খাওয়াস, তুই কিন্তু সামনের বাজিতে হারবি। এইটা তোর সাথে আমার বাজি থাকল। হারলে কত দিবি বল? সাকিব :দেখ, তোরা কিন্তু আমাকে শুধু শুধু রাগিয়ে দিচ্ছিস। আমি খাওয়াব বলেছি তো। কিন্তু এমন কথা বললি কেন, যে সামনের বাজিতে হেরে যাব! হেরে গেলে কিন্তু তোর দোষ। শিমুল :কিন্তু এটা তোর অভ্যাস খারাপ করে দিচ্ছে। দেখ সাকিব, মজা করার জন্য বন্ধুরা মিলে বাজি ধরবি, সেটা আলাদা কথা। কিন্তু এভাবে বাইরের লোকের সাথে টাকা দিয়ে বাজি ধরতে যাস কেন? টাকা দিয়ে বাজি ধরা তো জুয়া খেলা। টাকার জন্য ওরা তো তোর ক্ষতিও করতে পারে। সাকিব :তোর জ্ঞানী প্যাঁচাল থামাবি? আমি মোটেও জুয়া খেলতে যাই না। আর দেখিস না? খেলার সময় কত নামিদামি বাজিকর বের হয়। ইস্ একবার তাদের সাথে বাজি ধরতে পারলে কত বড়লোকই না হয়ে যেতাম! স্বাধীন :আর মিডিয়ায় বড় বড় করে তোর ছবি ছাপা হতো! উপরের কথাগুলো নিছকই একটি আড্ডায় হলেও আমরা অনেকেই দৈনন্দিন জীবনেও এমনই হরহামেশাই বাজি ধরি। অনেকের কাছে বাজি ধরাটা একটা নেশার মতো। অনেকেই কথায় কথায় বলে বসে ‘১০০ টাকা বেট’। এটা হয়তো শুরুর দিকে মনে হতে পারে দুষ্টামি, স্রেফ মজা। কিন্তু এই প্রবণতা একসময় নেশা হয়ে পড়ে। নেতিবাচক আত্মবিশ্বাসের ফলাফলই হচ্ছে বাজি ধরা। গবেষকরা জানিয়েছেন, বাজি ধরার বিষয়টিও আমাদের জিনগত। আমাদের নিউরনের মধ্যেই খেলে বেড়ায় বাজি ধরার মতো নেতিবাচক কাজের উপলক্ষ। গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, বানরেরাও বাজি ধরতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামান্য জুস পাওয়ার আশায় তারা তাদের হাতের কাছে থাকা ভালো খাবার ছেড়ে দিতে প্রস্তুত থাকে। নিউরন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাথার ভেতরকার জিতে নেওয়া সম্পর্কিত সার্কিট কোনো কিছু জিতে নেওয়ার প্রেরণা হিসেবে কাজ করে বা জিতে নেওয়ার ইচ্ছা বাড়াতে সহায়তা করে। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক লুক ক্লার্ক জানিয়েছেন, ‘কোনো বিশেষ কারণে জুয়া বা বাজিতে হেরে যাওয়া আরও বেশি করে বাজি ধরতে উস্কানি দেয় এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকেই এর জন্ম।’ অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আত্মবিশ্বাস ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য আছে। আত্মবিশ্বাসী হওয়া খুবই ভালো, কিন্তু মানুষ অনেকসময় বুঝতে পারে না তাদের আত্মবিশ্বাসটা কখন আকাশ ছুুঁয়ে যাচ্ছে এবং একসময় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে রূপ নিচ্ছে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ফলে মানুষের চোখে একটি পর্দা পড়ে যায় তখন তিনি মনে করতে থাকেন যেকোনো কিছু করার ক্ষমতা তার রয়েছে। এই ধরনের চিন্তা মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস মানুষকে তার জ্ঞান সম্পর্কে ভুল ধারণা দেয়, ঝুঁকিকে ছোট করে দেখার ভুল করেন এবং একটি সমস্যা সমাধানে তাদের ক্ষমতার পরিসর কতটুকু তা তারা ভুলে যান। তাই এ ধরনের অতি আত্মবিশ্বাসী মনোভাব থেকে বের হওয়ার কিছু সাধারণ কৌশল হলো—  নিজের দক্ষতা জানার সাথে সাথে নিজের অদক্ষতা সম্পর্কেও ধারণা রাখা।  নিজেকে কখনও অন্যদের সাথে তুলনা না করা।  অন্যের কাছ থেকে সমালোচনা শুনলে রেগে না গিয়ে তা স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করা এবং যেহেতু মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে তাই নিজেও এর বাইরে নই—এটা বোঝা।  কাউকে কোনো কাজ করে দেওয়ার কথা দেওয়ার আগে চিন্তা করে নেওয়া উচিত—ঠিক সময়মতো তা শেষ করতে পারব কি না বা কাজটা করার মতো নিজের দক্ষতা কতটুকু আছে।  নিজের ভুলগুলো সময় নিয়ে বিচার করা ও শুধরে নেওয়াটা জরুরি। এতে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়, মানসিকে শক্তি এবং অন্যান্য গুণাবলি বৃদ্ধিতেও সহায়ক হয়।  আশাবাদী হওয়া অবশ্যই একটি ইতিবাচক মনোভাব কিন্তু কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কেও জানতে হবে এবং সেইভাবে কাজ করতে হবে, কল্পনাবিলাসী হওয়া যাবে না। মনে রাখবেন, আপনি আপনার জায়গায় সবার থেকে আলাদা। আপনার যতটুকু দক্ষতা, জ্ঞান, কার্যক্ষমতা তা কিন্তু আপনারই। কিন্তু এই ভাব থেকে যদি আপনার ভেতর হুটহাট বাজি ধরার প্রবণতা ঢুকে পড়ে তাহলে সেটা হয়ে উঠবে বড় ধরনের অন্যায়। আপনার মধ্যে এমন কিছু গুনাবলি রয়েছে যা অন্যের মধ্যে নেই। একইভাবে অন্যের অনেককিছু হয়তো আপনার মধ্যে নাও থাকতে পারে। আপনি অনেকের মধ্যে ভালো হতে পারেন কিন্তু কেউ আপনার থেকেও সেরা হতে পারে এটা ভুললে চলবে না। মডেল ন্যাস ও আসাদ