পাদুকার নকশাকার
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৩, ১৯:৫৯
স্কুলে পড়ে এক ছেলে, বঙ্গবাজার থেকে কিনে আনা লাল রঙের স্যান্ডেল তার ভালো লাগে না। বাবার জুতার ফ্যাক্টরি, স্যান্ডেল নিয়ে চলে যায় সে সেখানে। বাবার ডিজাইন করা জুতা থেকে খুঁজে নেয় একটা। সেটাও আবার নিজের মনের মতো করে ঠিকঠাক করে নেওয়া চাই। সেইদিনের সেই ছোট্ট ছেলেটার ডিজাইন করা জুতাই আজ ঢাকা শহরের বড় বড় ফ্যাশন হাউসগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে, তাদের পছন্দের তালিকায় তার নাম শীর্ষে। তিনি জুয়েল জুবিন, ‘জুবিন জিরো পারসেন্ট’-এর স্বত্বাধিকারী। নান্দনিক আর সময়োপযোগী জুতা আর স্যান্ডেলের ডিজাইন করে হয়েছেন সময়ের আলোচিত একজন। প্রজন্মকে শুনিয়েছেন তার পথচলার গল্প, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার নানান দিক। তাকে নিয়ে লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
পেশা মানেই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, বিশ্বায়নের যুগে সেই ধারণাটা আর নেই। ব্যতিক্রমী সবকিছুতেই জুয়েল জুবিনের আগ্রহ ছিল তাই। সেটা যে সু-ডিজাইনার হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করবে—এই নিয়েও সুনিশ্চিত ছিলেন না তিনি। সময়, সুযোগ সবকিছু মিলিয়েই তিনি আজকের সময়ে একজন মেধাবী ডিজাইনার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। বস্তুত সু-ডিজাইনার হিসেবে খুব প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাও তার নেই, তবুও যে নিজের ইচ্ছা আর আগ্রহেই অনেক কিছু সম্ভব সেটার দৃষ্টান্ত তিনি নিজেই। দেশ-বিদেশের ফ্যাশনের খোঁজখবর, তরুণদের চাহিদা আর নিজের ফ্যাক্টরিতে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তাকে সু-ডিজাইনার করেছে বলে জানালেন।
সূচনাতেই বলেছি, জুবিনের সবকিছুতে আগ্রহ শৈশব থেকেই। নিত্যনতুন ফ্যাশনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা চাই, নিজেকে আপ-টু-ডেট রাখা চাই। সেই প্রণোদনাতেই প্রথমে নিজের জন্য জুতার নকশা শুরু করেন, তারপর বাবার ফ্যাক্টরিতে যেগুলো তৈরি হয় সেগুলোরও। আর জুবিন আগ্রহ ভরে খেয়াল করেন, মানুষ যখন দেশেই ভালো মানের পণ্য পাচ্ছে, তখন সেটাতেই মার্কেটিং তথা নিজের ব্র্যান্ডকে পরিচিত করার সুযোগ রয়েছে। এই ভাবনাতেই জুবিন জিরো পারসেন্ট নামে তার ডিজাইন বাজারজাত শুরু করেন। তার সৌভাগ্য, এই আন্তরিকতা বৃথা যায়নি। তরুণ প্রজন্ম সানন্দে গ্রহণ করেছে তার কাজ। প্রাথমিকভাবে শহরের নামীদামি ফ্যাশন হাউসগুলোতে তার ডিজাইন করা সু-গুলো বিক্রি হয়ে আসছে। জুবিন পরিকল্পনা করছেন অদূর ভবিষ্যতেই নিজের আউটলেট দিয়ে বিপণনের পথে যাত্রা শুরু করবেন।
জুবিনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এই যে নতুন নতুন ভাবনার আশ্রয়ে কাজ শুরু করলেন, প্রতিবন্ধকতাগুলো কীভাবে সামাল দিলেন? জুবিনের কথায় স্পষ্টতই প্রমাণিত যে, তিনি নিজেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার মতো যোগ্যতা রাখেন। যখন পড়াশোনার পাশাপাশি এগুলো করেছেন তখনও এবং এখনও কর্মজগতে এসে এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন থেকে শুরু করে বিপণন, নকশা সবই তার করতে হয়েছে। ওপার বাংলার শিল্পী নচিকেতার গানে একই সাথে চলচ্চিত্রের প্রডিউসার, ডিরেক্টর, অভিনেতা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুধুই গানের মতো নন, বাস্তবের জুবিন একাধারে একজন ডিজাইনার, ব্যবস্থাপক, বিক্রয় সমন্বয়ক, ফ্যাক্টরির প্রকৌশলীও বলা চলে। বাবার অভিজ্ঞতা আর তার তারুণ্য—এ দুইকে কাজে লাগিয়েই এই সাফল্য লাভ। বাবা এখনও তাদের প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমাদানির বিষয়টা দেখছেন, সেটা তার জন্য সহায়কই বটে।
প্রজন্মের মেধাবী এই ডিজাইনারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এই ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ কেমন আমাদের দেশে? তিনি জানান, দেশে এখন এই বিষয় নিয়ে কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে। সময়ের সাথে সাথেই ফ্যাশন সম্পর্কিত সব কিছুরই পরিবর্তন ঘটবে। তাই জুতার ফ্যাশন নিয়েও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সময়ের সাথে চলনসই অর্থাত্ যখন যে ট্রেন্ড চলে সেই অনুযায়ী আমরা স্যান্ডেলের ডিজাইন করি। প্রতিমাসে আমরা এই ডিজাইন নিয়ে ডিজাইনারদের সাথে কথা বলি এবং প্রতিটি ডিজাইনে ভিন্নতা আনার চেষ্টা করি।’
বাবা-মা আর দুই বোন নিয়ে জুবিনের পরিবার। তার শৈশব কেটেছে পুরান ঢাকায়। সেখানেই হাম্মাদিয়া স্কুল থেকে এসএসসি, এরপর ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি দিয়ে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ শেষ করেন তিনি। এখন শুধুই নিজের ক্যারিয়ার আর ব্যক্তিজীবনটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। জুবিনের এই যে উদ্যোগ আর সম্ভাবনার হাতছানি, সেটা পূর্ণতা পাক, এই আমাদের প্রত্যাশা।
জুয়েল জুবিন
জন্মতারিখ ও স্থান :৪ অক্টোবর, ঢাকা
মায়ের নাম :হাবিবা খাতুন
বাবার নাম :নূরুল হক
প্রথম স্কুল :হাম্মাদিয়া হাই স্কুল
প্রিয় মানুষ :বাবা-মা
প্রিয় উক্তি :চেষ্টা করে যাও, প্রতিভাকে অতিক্রম করতে পারবে।
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :বন্ধুদের সাথে আড্ডায়
সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম, আত্মত্যাগ আর কাজের প্রতি অনুরাগ।