যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ঝোঁক মাইক্রো এ্যাপার্টমেন্ট
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৩, ২০:০৪
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি। বর্তমান বিশ্বে তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম, বিনোদন, হাল-ফ্যাশনের প্রভাব এখনো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেই যুক্তরাষ্ট্রেই দিন দিন মানুষের জীবন-যাপনের ধরনে আসছে বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে তরুণ ও অবসর নেয়া লোকদের জীবন-যাপনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এরন ম্যাককোনেল একটি ছোট এপার্টমেন্টের বাসিন্দা। এটাকে আসলে ঠিক এপার্টমেন্ট বলা যায় না। এক রুমের বাসাও বলা যেতে পারে। আরো সাতজন প্রতিবেশীর সঙ্গে তিনি একটি মাত্র রান্নাঘর শেয়ার করে থাকেন তিনি। এক জোড়া খাট বসানো যায় এমন একটি ছোট এ্যাপার্টমেন্টে স্বাচ্ছন্দ্যেই বসবাস করছেন ম্যাককোনেল। রুমে আছে একটি ছোট ডেস্ক, কাপড় অন্যান্য জিনিস রাখার জন্য আছে তাক এবং হুক। আসলে ম্যাককোনেলের এই রকম ছোট এ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করার কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার নতুন ধারা। ম্যাককোনেলের মতে, তিনি সামাজিকভাবে বসবাস করছেন। এছাড়া আরেকটি বড় বিষয় হলো খরচ। ২৮ বছর বয়সী ম্যাককোনেলের জন্য এই ছোট এ্যাপার্টমেন্টের ভাড়াও সাধ্যের মধ্যে। সিয়াটলের এই ছোট এ্যাপার্টমেন্টের জন্য তাকে প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হয় ৭৩৭ ডলার। আসলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ছোট এ্যাপার্টমেন্ট তৈরির কারণ হলো যাদের অর্থ কম অথচ একটু একান্তভাবে ভালো জায়গায় থাকতে চান তাদের চাহিদা পূরণ করা।
এ ধরনের ছোট এ্যাপার্টমেন্টগুলোকে বলা হচ্ছে ‘মাইক্রোস’। এটাকে হোস্টেল স্টাইল বললেও চলে। সাধারণত ২০০ বর্গফুটের কম জায়গায় নিজস্ব বাথরুম, একটু সচেতনভাবে সজ্জিত আসবাবপত্র রাখা হয়েছে। বেডটা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে জায়গা একটু থাকে। বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায় ৮ ইউনিটের বাসিন্দারা একটি যৌথ রান্নাঘর ব্যবহার করছে। যদিও ম্যাককোনেলের ছোট এ্যাপার্টমেন্টটি সাজানো হয়েছে ছোট একটি ফ্রিজ আর মাইক্রোওভেন দিয়ে। তাদের ঐ ভাড়ার মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ এবং পানি, গ্যাস, বিদ্যুত্ও সরবরাহ করা হয়। তবে তাদের জন্য লিফটের ব্যবস্থা নেই। কারো কারো গাড়ি পার্কিংয়ের সুযোগ থাকলেও ম্যাককোনেলের তা নেই। বরং রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করার একটি অনুমতিপত্র আছে তার। যেটা সিয়াটল বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বড় কয়েকটি হাসপাতালের কাছে।
এসব ছোট ছোট এ্যাপার্টমেন্টে জায়গা কম থাকলেও এগুলোর অবস্থান হলো গুরুত্বপূর্ণ। সিয়াটলের লাইভলি পাইক-পাইন করিডোরের কাছাকাছি ম্যাককোনেলের মাইক্রো এ্যাপার্টমেন্টটি। এ এলাকায় রেস্টুরেন্ট, বার এবং দোকানপাট অনেক। সিয়াটলে এসব মাইক্রো এ্যাপার্টমেন্টের মাসিক ভাড়া প্রায় ৫০০ থেকে ১০০০ ডলার। আর এক বেডরুমের একুট বড় এ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া গড়ে ১ হাজার ২২৩ ডলার। তবে এ ধরনের মাইক্রো এ্যাপার্টমেন্টগুলো যে সবার কাছে পছন্দের তা কিন্তু নয়। ম্যাককোনেলের আশেপাশে যারা নিজস্ব বাড়িতে থাকে তাদের অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের বাসার কারণে জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়বে। যার কারণে যানজট বাড়বে, পার্কিংয়ের জন্য জায়গা পাওয়া কঠিন হবে। রিজন্যাবল ডেনসিটি সিয়াটল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা কার্ল উইন্টার বলেন, এগুলোর অবস্থা বোর্ডিং হাউসের মতো। এসব দেখে মনে হয়, আমি দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছি। বর্তমানে এক বর্গ কিলোমিটারের এই জায়গায় ১৯টি মাইকো এ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। আমাদের বক্তব্য হলো, এলাকার অন্যান্য বাসিন্দা যেমন বিধি-বিধান মেনে চলে এ মাইক্রো এ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দারা তেমন মেনে চলে না। তবে সিয়াটলের মেয়রের এ ধরনের এ্যাপার্টমেন্টের বিষয়ে সমর্থন রয়েছে।
ম্যাককোনেলের এলাকার সিটি কাউন্সিল মেম্বার রিচার্ড কলিন রয়টার্সকে বলেন, সীমিত আয়ের তরুণ যারা নতুন কাজ শুরু করেছে বা যারা অবসরে যাচ্ছেন তাদের সাধ্যের মধ্যে থাকার জন্য এ ধরনের বাসার দরকার রয়েছে।
২০০৬ সালের পর থেকে সিয়াটলে ৪১টি মাইক্রো এ্যাপার্টমেন্ট ভবন বানানোর জন্য অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ ২৮টির জন্য অনুমোদন দিয়েছেন। বাকি ১৩টির বিষয়ে এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। শুধু সিয়াটলে নয়, সানফ্রান্সিকোতেও মাইক্রো এ্যাপার্টমেন্টের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখানে প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। এখানে শুধু শ্রমিকরা বা অল্প আয়ের লোকরা নন বরং অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরাও থাকতে চাইছেন। এর কারণ তারা বিশেষ অনুষ্ঠান বা দিনগুলো একটু একাকী নিরিবিলি কাটাতে চান। তবে এখানে সমস্যাও আছে। সানফ্রান্সিকো টেনান্টস ইউনিয়নের পরিচালক টেড গুলিকসেন বলেন, এখানে হাইটেকের কর্মকর্তারা ভাড়া নিলে তা অনেক বেশি চাকচিক্য করতে হবে এবং ভাড়াও বাড়বে। তবে এমনটা না হলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তার মতে মাইক্রো এ্যাপার্টমেন্টগুলো কলেজ ছাত্রদের জন্য আদর্শ বাসা হতে পারে। কারণ ভালো শহরে কম খরচে থাকার সুযোগ হতে পারে এর মাধ্যমে। নিউইয়র্কেও এ ধরনের এ্যাপার্টমেন্ট এখন দেখা যায়। নিউইয়র্কের মেয়র মাইক ব্লুমবার্গেরও সমর্থন আছে তাতে।
সিয়াটলের অর্থনীতিবিদ ম্যাথু গার্ডনার বলেন, গত কয়েক বছরে এ ধরনের এ্যাপার্টমেন্ট হতে দেখে তিনি বিস্মত নন। শহরের শ্রমিকরা কী করবে? তারা চায় কর্মক্ষেত্রের আশেপাশে থাকতে। এ ধরনের এ্যাপার্টমেন্ট তাদের অতৃপ্ত চাহিদা পূরণ করতে পারে। সিয়াটলে ম্যাককোনালের বাসার বিনিয়োগকারী জিম পটার বলেন, এক রুমের মধ্যে সব ধরনের সুবিধা পাচ্ছে ভাড়াটিয়ারা। এটা একদম খারাপ নয়। তার মাইক্রো এ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারীদের গড় বয়স ৩৩। যাদের বাত্সরিক আয় ৩৫ হাজারের ডলারের কম। এদের অনেকেরই নিজের গাড়ি নেই। তাই এ ধরনের এ্যাপার্টমেন্টে থাকতে সমস্যাও নেই। এরন ম্যাককোনাল তার বিয়ের আগ পর্যন্ত এ এ্যাপার্টমেন্টেই থাকতে চান। এরপর জীবন তাকে যেখানে নেবে সেখানেই যাবেন তিনি।