আলোকিত পাকিস্তান গড়তে চান নওয়াজ শরীফ

‘শের কা নিশান, রোশান পাকিস্তান’— মুসলিম লীগের এই শ্লোগানের মানে ‘সিংহের প্রতীক, আলোকিত পাকিস্তান’। এখানে ‘আলো’কে বাস্তবিক অর্থেই ব্যবহার করা হয়েছে; প্রতীকী অর্থে নয়। মূলত ভয়াবহ বিদ্যুত্ সংকট থেকেই এই শ্লে¬াগানের উদ্ভব। গত দুই বছর ধরে পাকিস্তানে লোডশেডিং চলছে দিনে ১২ থেকে ২১ ঘন্টা পর্যন্ত। এর ফলে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে শিল্প-কল-কারখানা। স্বাভাবিকভাবেই শহরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। ভেঙ্গে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। দুর্বিষহ দুর্ভোগে অতিষ্ঠ জনজীবন। আর এ থেকে পরিত্রাণ পেতেই মুসলিম লীগের সরকার গঠন। নির্বাচনে বিজয়ের ইঙ্গিত পেয়ে মুসলিম লীগ নেতা নওয়াজ শরীফ নিজ বাসভবনের বেলকনিতে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে তিনি বলেছিলেন, তার সরকারের প্রথম কাজ হবে বিদ্যুত্ সংকট মোকাবিলা। এমন আরো যত প্রতিশ্রুতি নওয়াজ শরীফ নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই দিয়ে আসছিলেন, তার মধ্যে বিশ্ববাসীর সবচে বেশি নজর কেড়েছে পাকিস্তানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি। গত শুক্রবার শপথ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ২৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা। তাতে দেখা গেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কাউকেই ছাড়েননি নওয়াজ। বরং আপাতত নিজেই ঐ দায়িত্বভার কাঁধে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু শপথ নেবার পরদিনই পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে ড্রোন হামলা চালিয়ে জঙ্গি সন্দেহে অন্তত নয় জনকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। সরকার গঠনের পর তাই নওয়াজ সরকারের প্রথম যে কাজ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র কূটনীতিক রিচার্ড হগল্যান্ডকে ডেকে কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছে ইসলামাবাদ। তাতে বলা হয়েছে, ড্রোন হামলা চালিয়ে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লংঘন করছে ওয়াশিংটন। তবে এই কড়া কথার জবাব বা ফলাফল হিসেবে নওয়াজ শরীফ বা পাকিস্তানের ভাগ্যে কী আছে, তা এখনই বোঝা মুশকিল। উল্লেখ্য, এর দশদিন আগে আরেকটি ড্রোন হামলায় পাকিস্তান তালেবানের সেকেন্ড ইন কমান্ডসহ ছয় জন নিহত হয়। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক নিজের উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী সারতাজ আজিজকে জায়গা দিয়েছেন। পরিবর্তীত প্রেক্ষাপটে নতুন আঙ্গিকে নওয়াজকে সঠিকভাবে দিক-নির্দেশনা দিতে ৮৪ বছর বয়সী আজিজ কতটুকু পারদর্শিতা দেখাতে পারবেন, তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্ক কেমন হবে, সে ব্যাপারে নতুন নীতি-নির্ধারণের দায়িত্ব সারতাজের উপর। একই সাথে আগামী বছর আফগানিস্তান থেকে ন্যাটোর বাকি সৈন্যদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা রয়েছে; বিভিন্ন গণমাধ্যম যাকে বলছে ‘এন্ডগেম’। তাই ২০১৪ সাল বা এর পরের বছরগুলো পাকিস্তানিদের কেমন যাবে, তা পুরোটাই নির্ভর করছে নওয়াজ সরকারের কারিশমার উপর। বিশ্লে¬ষকরা বলছেন, এক্ষেত্রে সাফল্য-ব্যর্থতার অনেকাংশেই জড়িয়ে থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত চৌধুরী নিসার আলী। কারণ জঙ্গি তত্পরতাসহ আইন-শৃঙ্খলার পুরোটাই সামাল দিতে হবে তাকে। প্রয়োজনে আফগানিস্তানের মতো তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনার বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে নিসার আলীকে। তবে মুসলিম লীগ সরকারের সামনে সবচে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যুত্ সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত খাজা আসিফ শুরু থেকেই তত্পরতা না দেখালে অচিরেই অস্থির হয়ে উঠতে পারে পাকিস্তানের রাজনীতি। বিদ্যুত্ উত্পাদন ও এর সরবরাহ বৃদ্ধি ছাড়াও নওয়াজ সরকারের সামনে আরো অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। যেমন-নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা, পর্বত সমান ঋণের বোঝা, বেকারত্ব, চরমপন্থা বা জঙ্গিবাদ ও অস্থিতিশীল পরিবেশ, দারিদ্র্য, দুর্বল শাসন ব্যবস্থা, ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। কিন্তু এ সব সংকট অনেকটাই দুষ্টচক্রের মতো, যেখান থেকে বের হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অধিকাংশ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাকিস্তানে আরো বেশি বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থ সাহায্য প্রয়োজন। ইসলামাবাদ পর্যাপ্তভাবে তা দাতা দেশগুলোর কাছ থেকে আদায় করতে পারবে কি-না, তা নিয়ে আছে যথেষ্ট সংশয়। বিনিয়োগ বা অর্থ সাহায্য পেলেও দেশটি যেমন আরো বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বে, তেমনি দুর্নীতিপরায়ণ দুর্বল প্রশাসন তার উপযুক্ত সদ্ব্যবহার আদৌ করতে পারবে কি-না সন্দেহ আছে। এছাড়াও ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের নায়ক সাবেক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে নওয়াজ শরীফকে। তবে বিশ্লে¬ষকরা বলছেন, শিল্পপতি ও তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব লাভকারী প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ এখন আরো বেশি প্রাজ্ঞ। সাধারণ পাকিস্তানিদেরও বিশ্বাস, নওয়াজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের পরিপক্বতা দেশের চলমান সংকট থেকে পরিত্রাণের একটি উপায় হবে।